মন্তব্য প্রতিবেদন: ফেসবুক যখন সামাজিক সমস্যা

হাফিজুল ইসলাম চৌধুরী :
‘ফেসবুক’ বর্তমানে বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বের অন্যতম একটি সামাজিক যোগাযোগ রক্ষার জনপ্রিয় মাধ্যম। হাতে এখন যার একটি স্মার্ট ফোন আছে কিংবা বাসায় ইন্টারনেট সংযোগ আছে এমন ব্যক্তি ফেসবুক ব্যবহার করেন না তা ভাবাই যায় না। কিন্তু এই জনপ্রিয় যোগাযোগ মাধ্যম এখন সামাজিক অবক্ষয়ের কারণ হিসেবেও মূল্যায়িত হচ্ছে। যে উদ্দেশ্য নিয়ে ফেসবুক ব্যবহার হওয়ার কথা তা থেকে এখন সরে এসে নেতিবাচক উদ্দেশ্যে এটি ব্যবহার হচ্ছে বলে বলছেন সমাজবিজ্ঞানী।

এখন অনেকের অশান্তি, দুর্ভোগ ও যন্ত্রণার অন্যমত কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ফেসবুক। সামাজিক এ যোগাযোগ মাধ্যমটির কারণে অনেক ঘরে অশান্তি দেখা দিয়েছে। ফেসবুকে বন্ধু হতে গিয়ে অনেকের মধ্যে গড়ে উঠছে পরকীয়ার সম্পর্ক। আর এতে ভাঙছে অনেকের সাজানো সংসার। অনেকে সংসারের চেয়ে ফেসবুকে বেশি সময় দিচ্ছে। এতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সন্দেহের দানা বাঁধছে।

তরুণ-তরুণীরা প্রতারণামূলক সম্পর্কে জড়িয়ে সর্বশান্ত হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে প্রেমের ফাঁদে পড়ে মেয়েদের যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ দিতে হচ্ছে। শিশু-কিশোরদের মাত্রাতিরিক্ত ফেসবুক আসক্তি থেকে পড়ালেখায় ব্যাঘাত ঘটছে।

সমাজের উচ্চপদস্থ ও প্রতিষ্ঠিতদের নামে এ যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার ও কুৎসা রটিয়ে কখনোবা দেওয়া হচ্ছে প্রাণনাশের হুমকি। এমনকি তারকা ও শিল্পীদের ভুয়া অশ্লীল ভিডিও এবং ছবি তৈরি করে তা ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়ে তাদের মানহানি করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে সামাজিক যোগাযোগ রক্ষাকারী এ মাধ্যমটি এখন সামাজিক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে দুই কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী আছে। আর এর মধ্যে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ। আর তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার যত বাড়ছে এর মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধের মাত্রাও তত বাড়ছে। আর বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরির (বিটিআরসি) এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, সাইবার অপরাধের সঙ্গে জড়িত যে অভিযোগগুলো তাদের কাছে আসছে তার অধিকাংশই ফেসবুককেন্দ্রিক। আর এ সংক্রান্ত অপরাধ প্রতিরোধে বিটিআরসি গঠিত কমিটি গত এক বছরে দেড় হাজারের মতো অভিযোগ পেয়েছে। যা তার আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণ।

ফেসবুকের মাধ্যমে বর্তমানে যেসব নেতিবাচক কর্মকান্ড সংঘটিত হচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে- মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও এমপিদের নিয়ে বেশ কয়েক দফায় ফেসবুকে কটূক্তি করা। পরিচিত ও জনপ্রিয় ব্যক্তিদের অনেকের ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট না থাকলেও তাদের নাম ও ছবি ব্যবহার করে হর-হামেশা অসাধু কিছু ব্যবহারকারী ও চক্র অসৎ উদ্দেশ্যে খুলছে ভুয়া ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট। একই সঙ্গে এই ভুয়া অ্যাকাউন্টগুলোতে ব্যবহৃত হচ্ছে আপত্তিজনক ছবি ও ভাষা। থাকছে উস্কানিমূলক, অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য। ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায়ও ফেসবুক ব্যবহৃত হচ্ছে।

কক্সবাজারের রামুর বৌদ্ধমন্দির ও বৌদ্ধ বসতিতে ২০১২ সালের এ মাসেই সন্ত্রাসী হামলা হয়েছিল ফেসবুকের কারণে। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৫ বছর পরও রামুর গর্জনিয়া ইউনিয়নে বিদ্যুৎ পৌঁছেনি। কিন্তু ফেসবুক অ্যাকাউন্ট আছে আধিকহারে। গর্জনিয়ার ক্রাইম রিপোর্ট থ্রি, আলোকিত গর্জনীয়া, দৈনিক গর্জনিয়া বার্তাসহ অসংখ্য ভূয়া ফেসবুকে অপপ্রচার ও উস্কানিমূলক কথা প্রচারের ফলে নানাভাবে সংঘাত তৈরী হচ্ছে। বিষিয়ে তুলছে গর্জনিয়ার পরিবেশ। বিষন্ন করছে প্রত্যেকের মনকে।

এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতা যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীকে চাঁদে দেখা গেছে- এমন বিভ্রান্তি জনমনে ছড়িয়ে দেওয়া হয় ফেসবুকে। বিগত বেশ কয়েকটি পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফেসবুকে ফাঁস করার ঘটনাও ঘটেছে। প্রেমের ফাঁদে ফেলে ভুক্তভোগীদের আপত্তিকর ছবি মোবাইলে ধারণ করে তা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে অনেকেই অপমান সইতে না পেরে আত্মাহুতিও দিচ্ছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশেষ করে ফেসবুকের মাধ্যমে যৌন নির্যাতনের ঘটনা আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ফেসবুকে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে ছেলেরা মেয়ে সেজে অন্যদের সঙ্গে প্রতারণা করছে। কেউ কেউ আবার ফেসবুকে অন্যের বন্ধু তালিকায় থাকা মেয়ে বন্ধুদের আপত্তিকর খুদে বার্তা দিচ্ছেন কিংবা তাদের ছবির অপব্যবহার করছেন।

বিশেষজ্ঞরা জানান, বহির্বিশ্বে ফেসবুকে কোনো কারণে কারও মানহানির ঘটনা ঘটলে বা অপপ্রচার চালানো হলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, মানহানি বা অন্য বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করা হলেও তার কোনো ফলাফল পাওয়া যায় না।

বিটিআরসি সূত্রে জানা যায়, বিচারে সাইবার ক্রাইম প্রমাণিত হলে অপরাধীকে দুই থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদন্ড এবং পাঁচ লাখ থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা করার বিধান আছে। তবে এ আইনের কোনো প্রয়োগ হতে দেখা যাচ্ছে না।

অন্যদিকে সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে ‘বাংলাদেশ কম্পিউটার সিকিউরিটি ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিম বা বিডি-সিএসআইআরটি’ নামের একটি সেল করেছে। কিন্তু ভূয়া ফেসবুক এ্যাকাউন্টের কারণে দোষীদের শনাক্ত করতে কষ্ট হচ্ছে।