প্রাগৈতিহাসিক যুগাকীর্ণ রম্যভূমি রামু

এম সুলতান আহমদ মনিরী :

রামুর ঐতিহাসিক বর্ণনা সম্বলিত একটি প্রবন্ধ লেখার জন্য শ্রী প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছেন জানিনা এর কতটুকু আমি পালন করতে পেরেছি। কিন্তু আমি চেষ্টা করেছি পাঠকদের মনের খোরাক যোগানোর।

প্রাচীন কৃষ্টি-সংস্কৃতি পূরাকীর্তি নৃ-তাত্তিক নিদর্শন সমৃদ্ধ হাজার বছরের ঐতিহ্য লালিত, অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলা নিকেতন, চিরায়ত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চারণক্ষেত্র রম্যভূমি রামু।

সামাজিক সংহতি সুভ্রাতৃত্ত্ববোধ নির্বিরোধ শান্তিপূর্ণ সহাবস্বানের সমাহিত সৌন্দর্যের সৌম্য মূর্তি, এই চিন্ময় জনপদের অনন্য বৈশিষ্ট্য। কাব্য করে বলা যায়-

হিন্দু-মুসলীম, বড়ুয়া, রাখাইন, নির্বিবাদী লোক
কৃষ্টি- সংস্কৃতি, জাতি-সম্প্রীতি, ওদের পুণ্যশ্লোক।

উল্লেখ্য, সন্নিহিত বৃহত্তর চট্টলা সমনিতে যুগে যুগে রামু ঐতিহাসিক সিদ্ধ পুরুষ, রাজা- রাজড়া, ওলি -সূফি, শ্রামণ-ব্রাক্ষণ, জাতি-গোষ্টি, পরিব্রাজক ও নৃপতির আগমণ ধন্যা। ফলশ্রতিতে এতদাঞ্চলের জনগণ ঐতিহ্যগত উদার সংস্কৃতির বন্ধনাবদ্ধ। এর মধ্যেও আবার বৃহত্তর চট্টলার অংশ হিসেবে দেশের পর্যটন রাজধানী, প্রাচ্য সৌন্দর্যের রাণী খ্যাত, স্বাস্থ্য-পান্থ-নিবাস কক্সবাজার এর অদূরবর্তী, উদ্ভিন্ন যৌবনা, হিরন্ময়ী রামু যেন কোন উঠতি সুন্দরীর শুন্দ্র কপালে উজ্বল রক্তটিপ।

বুদ্ধমূর্তি

বস্তুত ঐতিহাসিক জনপদ এই রামুতে যেমন মুসলীম-হিন্দু-বৌদ্ধ ধর্মাবলন্বী বাসিন্দাগণ ঐতিহ্য ধারায় পাশাপাশি বসতি গড়ে আসছে, তেমনি অঙ্গে জড়াজড়ি তাদের পল্লীমহল্লা সমূহ। সেহেতু উক্ত সম্প্রদায় সমূহের মসজিদ, মাদ্রাসা, ক্যাং-প্যাগোডা, বিহার, আশ্রমের অবস্থিতি ও তত দূরবর্তী নয়, বরং কখনো অতি সন্নিকটবর্তী।

কিন্তু মাত্র সাম্প্রতিক কালের একটি সহিংস উন্মত্ত হামলা ছাড়া অনন্য পর্যটন নিদর্শন শান্তির সরোবর এই রামুতে, কোন কালে, কোন অজুহাতেই, কোন প্রকার আন্তঃধর্ম সংঘাত বা সাম্প্রদায়িক শান্তি ভঙ্গের মত ঘটনা ঘটেনি বা ঘটেছে বলে এতদাঞ্চলের ইতিহাসে লিপিবদ্ধ নেই।

images

নান্দনিক রামুতে উর্বর সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী জনগণ অত্যন্ত উৎসবপ্রিয়। এর সঙ্গে আবার হিন্দু-বৌদ্ধদের জাকজমক পূর্ণ ধর্মাচার বৈশিষ্ট্য নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলা চলে। প্রাচীন লোক ঐতিহ্,য কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সংব্যসরের ব্যাপক তৎপরতার কারণে অনেকে এই রম্য রামুকে কক্সবাজরের সাংস্কৃতিক রাজধানী বলে অভিহিত করতে ও কুণ্ঠিত হননা।

বাঁকে বাঁকে বয়ে চলা চিরায়ত বাঁকখালীর গাঙ্গেয় উপত্যকায় পর্যটন নিদর্শন ও উদোম নিসর্গ সৌন্দর্যের প্রাচুর্য রামুকে অন্যতম পর্যটন উপকেন্দ্রের অপার সম্ভাবনার দ্বার প্রান্তে নিয়ে এসেছে। নানা কারণে অধুনা রামু বিষয়ে দেশ ব্যাপী মানুষের জানার আগ্রহ উত্তোরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে বৈ কমছে না।

অতপর কোন স্থানকে জানা মানে তো, প্রথমেই তার শেঁকড়ের সন্ধান, তথা ইতিকথার পাঠোদ্ধার। ইতিহাসের ধুসর সোপান ছাড়া কোন কিছুর অতীত হাতড়ানো কখনো সম্ভব নয়। কোন এলাকার ভূগোল, কবি-সাহিত্যিক, রাজা রাজন্য শাসক বর্গ, ধর্ম প্রচারক, প্রাচীন জনগোষ্টির আগমণ-নির্গমন, যুদ্ধ-বিগ্রহ, পরিব্রাজকগণের ডাইরী, প্রাচীন লিপি, রহস্য গুহা, মৃত্তিকা খনন, গুনীজনদের জীবনী গ্রন্থ ইত্যাদি ইতিহাসের সোপন বা উপাদান। ইতিহাস কখনো মূল পাঠ্য হবে, এমন কথাও নেই। কেননা ইতিহাস উপন্যাস নয়। এ এক কঠিন সত্যের মুখোমুখি হওয়া। তাই পারত পক্ষে বিষয়টা অনেকে এড়িয়ে চলতে ভালবাসেন এতে কিন্তু সমস্যার সমাধান নেই।

দেখা গেছে রামুর বিদর্ভ অতীত উম্মুচনে প্রচেষ্টারত অনেকে সরল রৈখিক তথ্য উপাত্তের স্বল্পতায় যেন সিদ্ধান্তে পৌছার মত সপষ্ট অবস্থানে পৌছতে পারেননি। রামু কোন অতীত সভ্যতার কেন্দ্রস্থল বা শক্তি কেন্দ্র না হওয়ায়, বিচ্ছিন্ন ভাবে উপরোক্ত ব্যাপক ঐতিহাসিক উপাদান ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সত্বেও উক্তরূপ ঘাটতি মূল কারণ হয়ে রয়েছে।

কোন এলাকার নামকরণ অনেক সময় যেন উক্ত এলাকার ঐতিহাসিক রহস্যের জট খোলার চাবিকাটি। রামু নামের উপর যে অতীত পলেস্তরা জমেছে তা ঘসেমেজে দেখা যেতে পারে কি ছিল রামু, কোন দিকে গন্তব্য।

কবিগুরু

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর একটি কালজয়ী উপন্যাস ‘রাজর্সী’ ও বিখ্যাত নাটক ‘বিসর্জনে’ রামুকে রম্যভূমি নামে ভূষিত করে বিশ্ব খ্যাতি এনে দিয়েছেন। অবশ্য কবি কখনো রামুতে পদার্পন করেছিলেন বলে এতিহাসিক প্রমাণ নেই। কিন্তু তার জীবনীতে দেখা যায় তিনি একাধিকবার বঙ্গোপসাগর দিয়ে বার্মা বা অন্যত্র সমুদ্র ভ্রমণ করেছেন।

উল্লেখ্য, সেকালে বঙ্গোপসাগরের অন্তত দুইটি বড় খাড়ি বা চোছা রামুর অতীত সমুদ্র বন্দর রামুকোট ও উত্তর মিঠাছড়ির নৌঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। পুর্ব দিকে বাঁকখালীর অনেক অভ্যন্তর পর্যন্ত জোয়ার – ভাটার প্রভাব ছিল। রবীন্দ্রনাথ সমুদ্র যাত্রায় রামুর উপকূল ঘেঁষে যেতে যেতে বা প্রাকৃতিক পোতাশ্রয় রামকোট বন্দরে অবস্থান করা কোন অকল্পনীয় ঘটনা নয়। সেই সময়েই তিনি রামুর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিমোহিত হয়ে রামুকে রম্যভূমি উপাধি দিতে পারেন।

রামুতে বর্তমানে উক্ত খাড়িগুলো নাই বটে, কিন্তু কাশ্মীরকে যেমন পৃথিবীর ভূ-স্বর্গ বলা হয়, তেমনি কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের রামুর নয়নাভিরাম অংশ পেঁচার দ্বীপ; সোনার পাড়া, তথা হিমছড়িকে অকণ্ঠ চিত্তে বাংলাদেশের ভূ-স্বর্গ বলে অভিহিত করেন পর্যটন বিলাসী গণ।

গবেষকদের মতে, খৃষ্টপূর্ব দু’শ সালের দিকে, গ্রীস ভূগোলবিধ টলেমির মানচিত্রে রামু নামের উল্লেখ আছে। এতে বুঝা যায় অতীতে বাংলার সাথে বহির্বিশ্বের বাণিজ্য সম্পর্কে রামু যুক্ত ছিল এবং এ অঞ্চল তখনো রামু নামে অভিহিত হত।

মানচ্রিত্র

বৈদিক যুগের ধর্মীয় মিথের সঙ্গে ও রামু সংযুক্ত। কথিত আছে, রামুর রামকোট সীতার বনবাসের পঞ্চ বটি বন এলাকা। এখানে একটি প্রাচীন রাম মন্দির রয়েছে। বাল্যকালে সেখানে বেড়াতে গিয়ে ঐ মন্দিরে আমরা সীতার কথিত ওতা-পাটা-তৈজসপত্র ও রাম, সীতা, লক্ষনের এক সারীতে চলমান মূর্তি দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম সেখানে এখনো ৫ টি বা অধিক সারিবদ্ধ বট বা অশ্বখ বৃক্ষ দেখা যায়। সনাতন ধর্মানুসারীরা এগুলিকে সে যুগের পঞ্চবটের নব প্রজম্ম বলে মনে করে থাকেন। সেই সূত্রে দেবতা রামের নামানুসারে রামু নামের উৎপত্তি বলে সনাতন পস্থীরা দাবী করেন। সত্য-মিথ্যা যাইহোক, এতে অন্তত রামুর প্রাচীনত্ব প্রমাণিত হয়।

এর পর রয়েছে বৌদ্ধ মিথ। বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্ত্তক মহামতি গৌতম বুদ্ধ আরাকানের রাজদরবার ধন্যাবর্তী এসেছিলেন এবং রামুতে তাঁর বক্ষাস্থি নিয়ে পরবর্তীতে রামুকোটে চৈত্য স্থাপিত হবে এমন ভবিষ্যত বাণী করেছিলেন বলে উল্লেখ আছে। বর্মী শব্দ রাংউ (বক্ষাস্থি) থেকে রামু নামের উৎপত্তি বলে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অন্যতম দাবী।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, সপ্তদশ শতাব্দীতে এক বিতাড়িত ত্রিপুরা রাজপুত্র উন্নত মানের নিরাপদ আশ্রয় স্থল বিবেচনায় রামুতে এসে আশ্রয় নেন। এতেও বুঝা যায় রামুর সেকালের সামাজিক, রাজনৈতিক অবস্থান, পৌর আবহের ছিল।

অন্য এক জনশ্রুতি মতে রামু একদা এক প্রতাপশালী চাকমা রাজা রামু খাঁ কর্তৃক শাসিত হত। কালে তাঁর নামেই রামু নাম প্রসিদ্ধি লাভ করে। এই মত কিন্তু ধুপে ঠিকে না। কারণ প্রাচীন ভূগোলবিদের মানচিত্রেই রামু নামের উল্লেখ পাওয়া গেছে।

ইতিহাসে উল্লেখ আছে, ১৬৩০ খৃষ্টাব্দে ইংরেজ পাদ্রী ম্যানরিক বার্মা যাওয়ার পথে চট্টগ্রামের দেয়াং ও আনোয়ারা চকরিয়া হয়ে রামু আসেন। তিনি বাঁকখালী নদী পেরিয়ে পূর্ব রাজারকুল মনিরঝিলের মইষকুম গলাছিরা দিয়ে গর্জনিয়া যান। সেখান থেকে তিনি আশার তলী কমবনিয়া হয়ে বর্ডমানের সূজারোড দিয়ে আরাকান পদার্পন করেন। এ থেকে বুঝা যায় রামু এলাকা সেকালে পূর্ব দিকেই জনবসতি পূর্ণ ও আবাদি ছিল।

রামুর পুর্ব দিক দিয়ে ডুলাহাজারা হতে ঈদগাঁ, ঈদগড়, বাইশারী, কচ্ছপিয়া হয়ে উপরোক্ত বার্মা সীমান্ত দিয়ে যে ঐতিহাসিক মোঘল স্মৃতিবাহী সূজা রোড চলে গেছে, সেটি এদিক দিয়ে যাওয়ার অর্থ, বৃটিশ যুগের আগ পর্যন্ত আরাকান রোড পথের চেয়ে অধিক সুগম ও জন গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অবশ্য বৃটিশ আরাকান রোড মজারোড দিয়ে না নেওয়ার কারণ দুইটি বিশ্বযুদ্ধের কৌশলগত ব্যবস্থা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বৃটিশ প্রতিপক্ষ ছিল জাপান। নাফ নদীর বাধাকে কাজে লাগিয়ে শত্রু মোকাবেলা, বৃটিশ রণ কৌশলের অংশ ছিল বলে মনে হয়। এই সময় রামুর রামকোট বৃটিশ সেনানিবাস এ পরিণত হয়।

মোঘল যুগে ১৫৬০ সালে ফতেখাঁ নামে এক মোঘল সেনাপতির সঙ্গে ফতেখাঁরকুলের (যার নামে বর্তমান ফঁতেখারকুল) বাঁকখালী নদীর তীরে পূর্ব রাজারকুল সহ রাজারকালের আরাকানের অধীন এক স্থানীয় রাজার প্রচন্ড যুদ্ধ বাঁধে। যুদ্ধে ফতেখাঁ জয়ী হলে রামুর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক বৃদ্ধি পায়।

১৭৮৪ সালে আবার বার্মা রাজার হাতে স্বাধীন আরাকান রাজ্যের পতন ঘটলে আরাকানের স্বাধীন স্বত্তাকে চিরতরে মুছে দেয়ার জন্য মগ কাটাকাটি বা নৃশংস রাখাইন গণহত্যা সংঘটিত হয়। হাজারে হাজারে স্থানীয় বাখাইন জনগোষ্টি রামু-কক্সবাজার সহ বৃহত্তর চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় চলে আসে।

ইংরেজ ক্যাপ্টেন কক্স এসব শরণার্থী পুনর্বাসনের দায়িত্ব পেলে তিনি প্রায় অনাবাদি অঞ্চল কক্সবাজার সহ রামুর পাহাড়ী অঞ্চলে রাখাইন বা মগ বসতি প্রতিষ্ঠা করেন।

সেকালে এতদাঞ্চলে ব্যাপক সরষে ক্ষেতের আবাদ ছিল। সরষে ক্ষেতে ব্যাপক হলুদ দেখে, বিস্মিত হয়ে, তারা রামু কক্সবাজার কে প্যানোয়া বা হলুদ ফুলের দেশ বলে নামকরণ করে।

ক্যাপ্টেন কক্স এর নামানুসারে কক্সবাজার নামকরণ করে পর্যটন শহরের পত্তন করা হয়। তাঁর প্রশাসনিক অফিস তাঁর অন্তিম সময় পর্যন্ত রামুতে ছিল। এমন কি তাঁকে রামুতেই মগ খাটা বড় ক্যাং এর পূর্ব পাশে সমাধিস্থ করা হয় বলে জানা যায়। এটি বর্তমানে বাঁকখালী নদী গর্ভে বিলীন।

বাঁকথালী

১৭৫৭ সালে বৃটিশ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর ১৭৯৯ সালে নোয়াখালী থেকে কক্সবাজার অঞ্চল পর্যন্ত মশলা (স্পাইসেস) চাষের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী তাদের কর্মচারী ফ্রান্সিস বুকাননকে জরিপ কাজে পাঠান। তিনি প্রথমে নোয়াখালী হতে চট্টগ্রাম, সেখানে কর্নফুলী পার হয়ে দোহাজারী শঙ্গ নদী পার হয়ে বাঁকখালী, মাতামূহুুরী নদী পার হয়ে চকরিয়া খুরুস্কুলে বাঁকখালী নদী পার হলে কক্সবাজার সমুদ্র উপকূল ধরে দক্ষিণে এগিয়ে ইনানী দিয়ে বারো পালং খ্যাত উখিয়ায় পৌঁছান। সেখান থেকে তিনি পালং এর ঢালা (গিরিপথ) দিয়ে রামু রামকোটে কিছু দিন অবস্থান করেন অতপর তিনি চট্টগ্রাম ফেরার পথে তৎকালীন সহজপথ পূর্ব রাজারকুল হয়ে সেকালের সমৃদ্ধ রাজ্যপাট মনিমং নামক এক সামন্ত রাজার অঞ্চল, মনিরঝিলের পূর্ব সীমান্ত মইষকুম পাহাড়ের পাদদেশ দিয়ে বাঁকখালী নদী অতিক্রম পূর্বক উখিয়ারঘোনা নামক আর এক রাজা বা জমিদারের স্থান অতিক্রমের পর জোয়ারিয়ানালা হয়ে ডুলাজারা, সাতকানিয়া, বাজালীয়ায় শঙ্খ ও কর্ণফুলী নদী পার হয়ে প্রথমে চট্টগ্রাম, পরে পুনরায় নোয়াখালী চলে যান বলে তার মূল্যবান ডাইরীতে উল্লেখ আছে।

মনিরঝিলের ভৌগলিক সীমায় পশ্চিমে পূর্ব রাজারকুল মনিরঝিল রাস্তার গলাছিরার দক্ষিণ পাহাড়ে ত্ব-ক্যাং নামে একটি প্যাগোডা ছিল। ষাটের দশকে রামু হাই স্কুলে পড়তে যাওয়ার পথে কৌতুহল বশত: আমরা ঐ পাহাড়ে বনের ভেতর অনেকটা গুপ্ত স্থানের মত একটি ক্যাং দেখেছি। সেই ক্যাং থেকে টকটকে ঘেরোয়া রজ কাপড় পরিহিত এক ভিক্ষু ভেতর বাহির আসা যাওয়া করতেন। এটির প্রতিষ্ঠাকাল ১২৮০ মঘাব্দ বা ১৯১৯ খৃ: বলে জানা গেছে। এখন সেখানে অল্প কিছু ভগ্নাংশ ছাড়া কিছু নেই। সেখানে যাওয়ার ভাল রাস্তা ও এ পর্যন্ত নেই।

মনিরঝিলে মনি মং এর রাজ্য ও মগ বসতির অস্থিত্ব পাওয়া যায় রাখাইন ধারায় ধাতব অলংকার মাটির তৈজসপত্র, বিশেষত: গ্রামের প্রধান রাস্তা নির্মাণ কালে ভিক্ষুদের প্রায় অক্ষত একটি ভিক্ষা পাত্র বা ছ্যাবাইক প্রাপ্তি থেকে। সময়কাল বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকেই।

কোন এলাকার সাংস্কৃতিক ও স্থাপত্য কলার ইতিহাসই প্রধানত: জনগণের ইতিহাস। রামুতে বৌদ্ধ লোক সাহিত্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতির প্রভাব ঐতিহ্যগত প্রবল। পাশাপাশি সনাতন ও মুসলীম প্রভাবের মিশ্র ফলে এখানে বিশেষ এক ধরণের উন্নতমান নাগরিক সংস্কৃতি (কসমোপলিটন) গড়ে উঠেছে।

লামারপাড়া

রামুর স্মৃতি নিদর্শনে ভিন্ন বৈশিষ্টের মন্দির স্থাপনায় চৈনিক রীতি এখানকার পর্যটন আকর্ষণ। মনে করা হয়, শরণার্থী রাখইনরা আরাকানে প্রতিষ্টিত রাজার উন্নত প্রজার মর্যদায় শিক্ষা সংস্কৃতিতে উন্নত ছিল। তারা নতুন স্থানে ধর্ম পালনের জন্য রামু কেন্দ্রে অসংখ্য মন্দির স্থাপন করে। অনেকগুলির অবস্থান খুব কাছাকাছি। বিহার কেন্দ্রিক অত্যন্ত জাকজমকপূর্ণ তাদের উৎসব প্রবণ ধর্মাচরণ। প্রধান ভিক্ষুর শবদাহ অনুষ্ঠানের মত বড় অনুষ্ঠান অন্য কোন বড় যাগ জজ্ঞে ও দেখা যায় না।

তাছাড়া ক্যাং প্যাগোডা গুলো জ্ঞানচর্চা কেন্দ্র। লম্বা সময় ধরে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মন্দিরে অবস্থানের সুয়োগ রয়েছে বলে তাদের অখন্ড অবসর। এটা একটা সুযোগ। মন্দির গুলোতে কাগজ বিহিন যুগের তালপাতার প্রাচীন পালি ভাষার অনেক হস্তলিপি রক্ষিত দেখেছি। যেগুলো আছে সেগুলোর উপর গবেষণা ও পাঠোদ্বার প্রয়োজন বলে ইতিহাস অনুসন্ধিৎসরা মনে করেন।

রামুতে বিত্তবান রাখাইনদের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেমন-রামু খিজারী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, রামু বার্মিজ প্রাথমিক বিদ্যালয় (এখন সরকারিকরণ হয়েছে), পান্থনিবাস (চেরাং ঘর), বড় দীঘি, স্থানে স্থানে জলছত্র স্থাপনের অসংখ্য কৃতিত্ব ছিল।

রামুর প্রাচীন জনবসতির পূর্ণ পরিচয় ও বসতি সম্বন্ধে ধারণা এখনো গবেষণা সাপেক্ষ মনে করা হয়। বৌদ্ধ ধর্মের বিকাশ ভারতের মগধ রাজ্যে হলেও হিন্দুদের অত্যাচারে বৌদ্ধরা জেতবন বিহার থেকে পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়ে। মনে করা হয় সে সময় প্রচুর সংখ্যায় বড়ুয়া বৌদ্ধ রামুতে বসতি স্থাপন করে। পরবর্তীতে সুলতানী আমলে মুসলমানরা এদিকে আগামণ করলে তাদের সংস্পর্শে এসে প্রচুর সংখ্যক বড়ুয়া ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়। রামুর বর্তমান সংখ্যাধিক্ষের মুসলাম সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম ইত্যাদি স্থান থেকে আগত। তাদের পূর্ব পুরুষ ৫/৬ প্রজন্মের অধিক পূর্ববর্তী নয়। পরবর্তীতে রাখাইনদের সংস্পর্শে বড়ুয়ারা স্থিতিশীল সমাজ ব্যবস্থায় উপনীত হয় বলে অনেকে মনে করেন।

এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিছু হিন্দু বসতি তখনো ছিল। ওদের থেকেও অনেকে ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হয়। ক্রমে অন্যান্য স্থানের মত রামু কক্সবাজারে মুসলমান সংখ্যাধিকা হলে নতুন স্থাপত্য কলায় মুসলীম রীতির মসজিদ, দরগাহ, খানকাহ বাড়ীঘর, কাছারী, মাদ্রাসা, স্কুল গড়ে উঠতে থাকে।

উল্লেখ্য, এতদাঞ্চল আরাকান রাজ্যভূক্ত থাকায় আরাকান রাজসভায় বাংলাভাষী প্রতিতযশা সাহিত্যিকদের দৃপ্ত পদচারণা রামু পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। স্থানীয়ভাবে অনেক হিন্দু ও মুসলমান সাহিত্যিক ও লোক কবির উদ্ভব ঘটে। ওদিকে কলিকাতা কেন্দ্রিক শিক্ষা দীক্ষার প্রভাবের বিকাশমান ধারায় রম্য নিকেতন রামুর উভয় দিকের যেমন দোলাচলে ছিল তেমনি ছিল অধিক কার্যকরী সংযোগ স্থল।

বর্তমান মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক সরকার পরিচালনার কার্যকরী প্রভাবে রামুতে নতুন উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ, বিশেষ করে বর্তমানে বৃহৎ সামরিক স্থাপনা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে রামু আবার দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার নাভিমূলের ভূমিকায় স্থান পাবে বলে মনে করা যায়।

রাবার বাগান

রামুর ফকিরা বাজার ছিল সেকালে চট্টগ্রামের পর শ্রেষ্ট বাণিজ্য ও ব্যবসা কেন্দ্র। বার্মা, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর থেকে দক্ষিণ এশিয়ার বা মধ্য প্রাচ্যের দিকে যাত্রাপথের যাত্রীরা সেকালে রামু চৌমুহনীতে অবস্থান করতেন। রামুতে মধ্যযুগের অনেক কবি-সাহিত্যিক-রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্বগণের বা গুণীজনদের স্বাক্ষাত পাওয়া যায় রামুর স্থানীয় ইতিহাসে।

রামুর প্রাচীন কবি আবদুল মজিদ সিকদার ছিলেন ক্ষনজন্মা কবি প্রতিভা। তাঁর কবিতায় রামুর সমৃদ্ধি ও রামু প্রশস্থির উজ্জ্বল বর্ণনা পাওয়া যায়।

“জন্ম স্থানে নিকেতন জিলা চট্টগ্রাম
অন্তর্গত রম্য স্থান হয় রামু গ্রাম
মৌলভী, মৌলানা, মুফতী হাফেজ মহন্ত
কামেল ফকির দরবেশ গুণবন্ত
নানা দেশী পরবাসী করিত ভ্রমণ
নিত্য আসে নিত্য যায়, শান্ত করি মন
হাট ঘাট অতি ঠাঁট শহরের মত
পশারী, বেপারী সওদাগর শত।”

কবি নছরুল্লাহ খাঁন রামু উপজেলার ফতেখাঁরকুল গ্রামে জন্মেছিলেন। তিনি পঞ্চদশ শতাব্দীর কবি ছিলেন। তাঁর কবিতায় রামু প্রশস্তি এ রকম:

রাম্ভুদেশ নরপতি নামে ফতেখাঁন
যারে মান্য করি বসাইল বিদ্যমান।” ইত্যাদি।

এসব কবিতা রামুর সমৃদ্ধ অতীতের পরিচায়ক। বলা হয়ে থাকে কবি সাহিত্যিকরাই সমাজের অগ্রসর অংশ। কবিরা স্বপ্ন বোনে, সমাজ কর্মীরা সেই স্বপ্নকে বাস্তবরূপ দান করে। মধ্য যুগের কবিগন রামুর অতীত হাট ঘাটের ঠাঁট, তথা উচ্চ মানের কথা বলে গেছেন। কিন্তু সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয়েছে কিনা প্রশ্ন।

টেকনাফ থেকে চকরিয়া যাবার পথে, কক্সবাজার শহর ছাড়া, অন্য কোন ষ্টেশন রামুর অর্ধেক মানেরও ছিল না। এখন রামু ছাড়া অন্যগুলির বেশির ভাগ পৌরসভা, নয়তো উপশহর। রামুতে হয়ত নেতৃত্ব শুন্যতা গ্যাড়ে বসেছিল। মনন চর্চার সৃজনশীল ব্যক্তিরা অদ্যাবধি রামুর সাংস্কৃতিক মানকে উর্ধ্বে তুলে ধরে রাখতে পারলেও অবকাঠামোগত টানা হেঁচড়ায় রামু ক্রমশ বঞ্চিত হয়ে আসছে। প্রকৃতপক্ষে মানুষ না জাগলে দেশ জাগবে কি করে। কেননা মানুষই তো আসলে দেশ। মরুভূমিতে মানুষ থাকে না বলে মরুভূমি উষর মরু হয়েই থাকে। মানুষকে জাগাতে জনপদের শেকড় সন্ধান তথা ছাই ছাপা থেকে ইতিহাস পুনরোদ্ধার অত্যন্ত জরুরী।

আমরা বিজ্ঞ গুণীজনদের এবং সমাজ গবেষকদের নিকট থেকে যখন দিনে দিনে জানতে পারছি রামুর সমৃদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্যের কথা, তখন আমাদের উৎসাহতো আরো বৃদ্ধি পাবার কথা। উন্নতমান রামু এমন কি কক্সবাজার গড়ার এটাই পথ।

অনেক চরাই উতরাই পেরিয়ে রামুতে নতুন প্রতিশ্রুতিশীল, নব প্রজন্মের নেতৃত্বের বিকাশের উন্মেষকালে চারিদিকে যেন উন্নয়ন উদ্দীপনার সিম্ফনী অনুভূত হচ্ছে। দৃশ্যমান হচ্ছে জাগানিয়া তরঙ্গায়িত ফেনিল উচ্ছ্বাস।

পরিশেষে আশা করি, অতীতেও যেমন রামু কক্সবাজারের একটি শ্রেষ্ঠ গুরুত্বের অগ্রগণ্য জনপদ ছিল তেমনি অতীত ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্ঠি-সংস্কৃতি এবং নতুন যুগের উপযোগী নেতৃত্বের দক্ষিণামলয় বাহিত সুঘ্রাণে ভর করে এই প্রিয় ভূমি রামুর বাঁকে বাঁকে বয়ে চলা গিরি নন্দিনী বাঁকখালী বাঁকে আবারো ফিরে আসবে সেই হারিয়ে যাওয়া গৌরবদীপ্ত হিরন্ময় অতীত, এই প্রত্যাশা রাখি।

লেখকঃ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক,কবি, প্রাবন্ধিক, সমাজ গবেষক।
রামু, কক্সবাজার।