দুর্গম থানচিতে মৃত্যু আনছে ডায়রিয়া

অনলাইন ডেস্ক :
বান্দরবানের থানচি উপজেলার রেমাক্রী ইউনিয়নে দুর্গম পাড়ায় ডায়রিয়ায় কয়েকজনের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর স্বাস্থ্য বিভাগ সেখানে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসক দল পাঠিয়েছে।

তবে এলাকাটি মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে থাকায় এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা নাজুক হওয়ায় মৃতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে।

থানচি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ওয়াহিদুজ্জামান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে রোববার বলেন, “থানচি স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে এখন পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যুর খবর এসেছে। তার মধ্যে দুজনের নাম পাওয়া গেছে। এ ছাড়া কয়েকটি পাড়া মিলে ৬০ জনের মতো ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগী রয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

নিহতরা হলেন- মেনথাং পাড়ার বাসিন্দা কারবারি মেনথাং ম্রো (৪৮) ও লংঙান পাড়ার বাসিন্দা লংগ্রি ম্রো (৫০)।

ওয়াহিদুজ্জামান আরও বলেন, “মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকা এবং খুবই দুর্গম এলাকা হওয়ায় ঠিকমতো খবর পাওয়া যাচ্ছে না। তারপরও স্বাস্থ্যবিভাগ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বিজিবি সদস্যরা ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণে সমন্বয় করে কাজ করে যাচ্ছেন। প্রয়োজনীয় ওষুধ দিয়ে শনিবার স্বাস্থ্য বিভাগের একটি দল দুর্গত এলাকায় পাঠানো হয়েছে।”

থানচি উপজেলার সবচেয়ে দুর্গম এলাকা রেমাক্রী ইউনিয়ন। একমাত্র নৌপথেই উপজেলা সদর থেকে সেখানে যাওয়া যায়। ইঞ্জিনচালিত ছোট নৌকায় মিয়ানমার সীমান্তবতী এলাকা বড়মদক বাজারে পৌঁছাতে সময় লাগে চার ঘণ্টা। নৌকায় বড়মদক থেকে আরও এক ঘণ্টার দূরত্বে ডায়রিয়া আক্রান্তদের পাড়া।

রেমাক্রী ইউনিয়ন পরিষদের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মাংচং ম্রো রোববার দুপুরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ইউনিয়নের কয়েকটি পাড়ায় ডায়রিয়া ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে তার ওয়ার্ডের ছয়টি ম্রো জনগোষ্ঠীর পাড়া রয়েছে। পাড়াগুলো হল য়ংনং পাড়া, সিংচং পাড়া, পাকতোয়া পাড়া, নারেশা লংঙান পাড়া, মেনথাং পাড়া ও নেপিউ পাড়া। ডায়রিয়া আক্রান্ত অন্য আরেকটি পাড়া হল নয় নম্বর ওয়ার্ডের ক্রাহ্লাঅং মারমা পাড়া।“

ইউপি সদস্য মাংচং ম্রো দাবি করেন, আক্রান্তদের মধ্যে চারজন মারা গেছেন। তাদের তিনজন হলেন- মেনথাং পাড়ার বাসিন্দা কারবারি মেনথাং ম্রো (৪৮), লংঙান পাড়ার বাসিন্দা লংগ্রি ম্রো (৫০), য়ংনং পাড়ার বাসিন্দা ক্রায়ং ম্রো (৬০)। এ ছাড়া সিংচং পাড়ার ১২ বছরের এক কিশোর মারা গেছে; যার নাম জানা যায়নি।

“আক্রান্তদের কয়েকজনের স্বজন বড়মদক বাজারে গিয়ে ওষুধ কিনে এনেছে, তারা সুস্থ হয়ে ওঠেছে। আর যারা ওষুধ কিনে খেতে পারেনি তাদের অবস্থার অবনতি হচ্ছে। দুর্গম এলাকার বড়মদক বাজারে স্যালাইন ও ওষুধ সংকট পড়েছে।”

ইউপি সদস্য আরও বলেন, শনিবার থানচি উপজেলা সদরের বাজার থেকে ২৬ হাজার টাকার ওষুধ কেনা হয়েছে। তার মধ্যে ১৬ হাজার টাকা নগদ দিয়ে ১০ হাজার টাকা বকেয়া রাখা হয়েছে। ওষুধগুলো শনিবারই দুর্গত এলাকায় পাঠানো হয়েছে।

জেলা সিভিল সার্জন নীহার রঞ্জন নন্দী সাংবাদিকদের বলেন, “আক্রান্তদের মধ্যে দুইজন মারা গেছে। যেহেতু আমরা দুইজনের নাম পেয়েছি।“

“পর্যাপ্ত ওষুধপত্র, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ও খাবার স্যালইন নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের তিন-চারটি দল দুর্গত এলাকায় পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া সেখানকার বিজিবির সদস্যরাও কাজ করে যাচ্ছেন। এসব এলাকায় মূলত দুর্গমতার কারণে কাজ করতে একটু কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।”

সিভিল সার্জন আরও বলেন, ডায়রিয়া আক্রান্ত পাড়াগুলো এমন দুর্গম এলাকায় যে সেখানকার খবর পেতেও অনেক দেরি হয়। কোনো কোনো পাড়ায় খুব বেশি পরিবারও থাকে না। এক পাড়া থেকে আরেক পাড়ায় গিয়ে সেবা দিতেও অনেক সময় চলে যায়। তারপরও জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।”

থানচি উপজেলার বড়মদকের সাঙ্গু সংরক্ষিত বন এলাকায় স্থানীয়দের বাঁশের ভেলায় যাতায়াত। ফাইল ছবি

থানচি উপজেলার বড়মদকের সাঙ্গু সংরক্ষিত বন এলাকায় স্থানীয়দের বাঁশের ভেলায় যাতায়াত। ফাইল ছবি
ডায়রিয়ায় আক্রান্তদের এলাকা থেকে ফিরে রেমাক্রী ইউপি চেয়ারম্যান মুইশৈথুই মারমা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সেখানকার বাসিন্দারা ডায়রিয়ার পাশপাশি ম্যালেরিয়ায়ও ভুগছেন। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগকে অবহিত করা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগেও ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণে আনতে সাধ্যমতো চেষ্টা করা হচ্ছে।“

একটি পাড়া নিয়ন্ত্রণে আসার পর অন্য আরেকটি পাড়ার মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে বলেও জানান চেয়ারম্যান।

দুর্গম এলাকার বাসিন্দারা মূলত খাবার পানির সংকটে ভুগেন এবং ময়লা পানি পান করায় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে বলে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ওয়াহিদুজ্জামান জানান।

সূত্র : বিডিনিউজ