বুদ্ধের মস্তকোপরি শামুক ও ডিম্বাকৃতি দেখায় কেন?

ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু :
ভগবান বুদ্ধের ছবি ও মুর্তিতে কোঁকড়ানো কেশ এবং উপরে উঁচু জটা বা ডিম্বাকৃতি কেন দেখা যায়?
বিগত কিছু দিন হতে এ সম্পর্কে মনগড়া কিছু কাহিনী ফেইসবুকে অনেকে লিখেছেন দেখেছি। কেহ কেহ বলেন যে, বুদ্ধ ধ্যান করার সময় মস্তকোপরি শামুক গিয়ে ছেয়ে ফেলে মাথায় শীতলতা দান করেছিল। এজন্য বুদ্ধের মস্তকে শামুকের মত দেখা যায়। এ কাহিনীর কোন ভিত্তি নাই। একেবারেই মনগড়া বানানো কল্প কাহিনী। অবশ্য এ সম্পর্কে আমি পূর্বেও লিখেছি। এখন আবারও সত্য উদ্ঘাটনে লিখার প্রয়াস করছি।

ভিক্ষু-ভিক্ষুণীদের জন্য শির মুণ্ডন করার বিনয় পিটকে কঠোর নিয়ম রয়েছে। প্রতি মাসে বা প্রতি পনের দিন অন্তর সাধারণতঃ ভিক্ষু-ভিক্ষুণীগণ কেশ কর্তন বা শির মুণ্ডন করে থাকেন। সকল দেশে বৌদ্ধ ভিক্ষু-ভিক্ষুণীরা ও অনাগারিকেরা এ নিয়ম পালন করেন। এজন্য বৌদ্ধ ভিক্ষু-ভিক্ষুণীদেরকে সর্বত্র মুণ্ডিত মস্তক দেখা যায়।
কিন্তু ভগবান বুদ্ধের মুর্তিতে বা ছবিতে আমরা দেখতে পাই যে, তাঁর মস্তকোপরি কোঁকড়ানো শামুকের মত কেশ এবং মস্তকের উপর ডিম্বাকৃতি জটার মত দেখা যায়।

অনেকে আবার এ সম্পর্কে বলেন যে, রাজকুমার সিদ্ধার্থ গৃহত্যাগের সময় অনোমা নদীর তীরে এসে তাঁর লম্বা চুল বা কেশরাজি মুষ্টিবদ্ধ অবস্থায় ধরে কেটে ফেলে দিলে অবশিষ্ট কেশ জুটার মত হয়ে সারাজীবন অপরিবর্তিত থেকেছিল। তা আর বাড়েওনি এবং কমেওনি। সেজন্য তাঁর মস্তকোপরি দেখতে জুটার মত দেখায়। এ কথাও সঠিক নয়। ইহাও কল্পিত কথা মাত্র।

বুদ্ধ তথাগত কি মুণ্ডন করতেননা? তিনি কি জটা রাখতেন? তথাগত বুদ্ধের জন্য নিয়ম কি এক রকম এবং ভিক্ষু-ভিক্ষুণীদের জন্য নিয়ম কি অন্য রকম ছিল? বুদ্ধ কি সঙ্ঘের নিয়মের বাইরে ছিলেন? এরকম প্রশ্ন আসা কি স্বাভাবিক নয়? অনেকের মনে এরকম প্রশ্ন এসে থাকে এবং তাঁরা জিজ্ঞাসাও করেন। এজন্য এ দ্বিধা-দ্বন্দ্বের সমাধান হওয়া উচিত মনে করি।

পালি সাহিত্যের সূত্র পিটকের বিভিন্ন সূত্র অধ্যয়ন করলে সেখানে দেখা যায়, অনেক সময় বুদ্ধ বিদ্বেষী জাত্যভিমানী ব্রাহ্মণেরা অবজ্ঞা ও অশ্রদ্ধা প্রদর্শনার্থে বুদ্ধকে ‘মুণ্ডক সমণ’ বা মুণ্ডিত শ্রমণ বলে সম্বোধন করতেন। মুণ্ডক বলার অর্থ হল বুদ্ধ মুণ্ডিত মস্তক ছিলেন। মস্তকে কেশ বা চুল থাকলে তাঁকে ‘মুণ্ডক’ বলে সম্বোধন করতেননা।এখানে ইহা সেভাবে পরিস্কার ধারণা পাওয়া যায়।

তথাগত বুদ্ধের ‘বত্রিশ মহাপুরুষ লক্ষণ’ এবং কোন কর্মফলে কোন লক্ষণ লাভ হয়েছিল সেগুলির বর্ণনা আমরা সূত্র পিটকের দীর্ঘ নিকায়ের ‘লক্ষণ সূত্র’ অধ্যয়ন করলে এ প্রশ্নের সমাধান পেয়ে থাকি।

তথাগত বুদ্ধ কোশলের রাজধানী শ্রাবস্তী নগরে অনাথপিণ্ডিক শ্রেষ্ঠী নির্মিত জেতবন মহাবিহারে অবস্থান কালীন সময়ে ভিক্ষুদেরকে সম্বোধন করে মহাপুরুষের বত্রিশ লক্ষণ সম্পর্কে বর্ণনা করেছিলেন। মহাপুরুষের বত্রিশ লক্ষণের মধ্যে একটি লক্ষণ হয়ে থাকে ‘উষ্ণীষ শীর্ষ।’ উষ্ণীষ শীর্ষের অর্থ হল ডিম্বাকৃতি উঁচু মস্তক।

তথাগত বুদ্ধ বলেছেন-‘ভিক্ষুগণ! যাঁরা মঙ্গল বা বহুজন হিতজনক কাজ সমূহে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন, কায়িক সুচরিত, দান দাতা, শীলাদি পালনকারী, উপোসথ রক্ষাকারী, মাতা-পিতা ও শ্রমণাদিকে সেবাকারী, কুল জেষ্ঠকে সম্মানকারী এবং অন্যান্য ভাল কর্মে প্রধান ভূমিকা পালন করেন, তাঁরা সে সমস্ত কুশল কর্মের প্রভাবে মহাপুরুষ লক্ষণ-‘উষ্ণীষ শীর্ষ’ লাভ করে থাকেন।

এ লক্ষণ তথাগতের মস্তকোপরি ছিল। তথাগতের শরীরে আরও এক লক্ষণ ছিল। তাহল ‘উর্ধাগ্র লোম।’ উর্ধাগ্র লোমের অর্থ হল তাঁর অঞ্জন সমান নীলাভ তথা বাঁ দিক হতে ডানে কোঁকড়ানো কেশ (Curly hair) সমূহ মস্তকোপরি ছিল।

এ সম্পর্কে তথাগত বলেছেন-‘ভিক্ষুগণ! যাঁরা লোকদেরকে অর্থ সম্বন্ধিত ও ধর্ম সম্বন্ধিত কথা বলে থাকেন, নির্দেশ করে থাকেন, প্রাণীদের হিত এবং সুখের জন্য ধর্মযজ্ঞ করে থাকেন, তাঁদের দু’লক্ষণ-‘উৎসর্গ পাদ’ এবং উর্ধাগ্র কেশ’ লাভ হয়ে থাকে।’

তথাগত বুদ্ধের শরীরে এরকম বত্রিশ মহাপুরুষ লক্ষণ ছিল। সেগুলির মধ্যে ১) উষ্ণীষ শীর্ষ এবং ২) উর্ধাগ্র কেশকে বা কোঁকড়ানো চুলকে দেখাতে প্রথম খৃষ্টীয় শতাব্দীতে যখন বুদ্ধমুর্তি গান্ধারা এবং মথুরায় নির্মিত হয়েছিল তখন মহাপুরুষ লক্ষণ দেখানোর জন্য শিল্পকারেরা মুর্তিতে ডিম্বাকৃতি মস্তকে কোঁকডানো চুলের মত দেখিয়েছেন, যাকে শামুক বলা হচ্ছে।

ভিক্ষু-ভিক্ষুণীদের জন্য এবং স্বয়ং তথাগত বুদ্ধের জন্য ছিল একই নিয়ম। ভিক্ষু-ভিক্ষুণীরাও নিয়মিত মস্তক মুণ্ডন করতেন এবং বুদ্ধও নিয়মিত মস্তক মুণ্ডন করতেন। ভগবান বুদ্ধ নিজের জন্য কোন বিশেষ নিয়ম বানাননি। তথাগতের বলা এবং করার মধ্যে কোন ভিন্নতা ছিলনা। তিনি যা বলতেন তা করতেন এবং যা করতেন, তাই বলতেন। এজন্য তিনি ‘তথাগত’ বলে অভিহিত হয়েছেন।