হিন্দু-মুসলিম বৈরিতা ও বাংলাদেশি বাঙালির আত্মপরিচয়ের সঙ্কট

শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন :
ইতিহাসের উপাত্ত বলছে, ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ছিল (এবং আছে) ঘৃণা, ও বিদ্বেষের সম্পর্ক। তাই বলে কোথাও কোথাও সীমিত আকারে হলেও, বা কোন সময়ে বৃহত্তর পরিসরে সৌহার্দ্য ছিল না, এমনটি বলা যাবে না। তাহলে প্রাচীন কালের পুঁথি, কবিতা, ও বাউল গানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা এলো কোত্থেকে? তাছাড়া মুঘল সম্রাট আকবর বা অন্য কারো কারো সময়েও আমরা হিন্দু-মুসলিম ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নজির পাই। এতদসত্ত্বেও ইতিহাসের নিষ্ঠুর সত্য হচ্ছে- চতুর্দশ শতক বা তারও আগে থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলিম বৈরিতা ছিল। উত্তর আফ্রিকার বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা হিন্দু-মুসলিম বৈরিতা, ও ঘৃণার যে বর্ণনা দিয়েছেন, সেটি তো রীতিমত ভয়াবহ!

ক্ষমতার পত্তন, সেটি সংহত, ও বিস্তৃত করার পরে ব্রিটিশ শাসকেরা প্রথমে হিন্দু, পরবর্তীতে মুসলিমদের সহযোগিতা নিয়েছে। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত উচ্চ কোটির হিন্দু, ও আশরাফ মুসলমানদের নেতৃত্বে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন যেমন হয়েছে, তেমনি তাদের একটি অংশের নেতৃত্বে হিন্দুত্ববাদের পুনর্জাগরণ, এবং ইসলামী পুনর্জাগরণের পালেও জোর হাওয়া লেগেছিল। সাধারণ মানুষের মধ্যে মুসলিম ও হিন্দু আইডেনটিটির ভিত্তিটি শক্ত হলেও, ভারতীয় উপমহাদেশে বৈরিতা, ঘৃণা, ও সহিষ্ণুতা পাশাপাশি অবস্থান করেছে, যদিও বৈরিতা এবং ঘৃণাটিই ছিল ঢের বেশি শক্তিশালী। তবে ইংরেজি শিক্ষার প্রভাব, ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনে হিন্দু-মুসলিমের সম্মিলন, এবং কমিউনিস্টদের সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের কারণে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক থেকে শিক্ষিত সম্প্রদায়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের মধ্যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা শক্ত ভিত্তি পায়। তারই প্রতিফলন হচ্ছে ভারতের সংবিধান, এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের সংবিধানে ‘সেক্যুলারিজম’ বা ধর্ম নিরপেক্ষ নীতির অন্তর্ভূক্তি।

নমস্য নেতা পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু, এবং বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের যুগান্তকারী কীর্তি হচ্ছে সংবিধানে ‘সেক্যুলারিজম’কে অন্তর্ভূক্ত করা। মনে রাখতে হবে যে, ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভক্ত হয়েছিল ধর্মভিত্তিক দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে। এতে ভারত থেকে বিপুল সংখ্যক মুসলিম পূর্ব, ও পশ্চিম পাকিস্তানে, এবং পাকিস্তান থেকে হিন্দুরা অভিবাসন করেন ভারতে। হিন্দু, ও মুসলিম সম্প্রদায়ের অভিবাসীদের সংখ্যা ছিল ১৫ মিলিয়ন বা দেড় কোটির বেশি। দেশ বিভাগের ট্রানজিশন, নৈরাজ্য, ও দাঙ্গায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন ১ থেকে ২ মিলিয়ন, অর্থাৎ ১০ থেকে ২০ লাখ মানুষ।

ধর্মভিত্তিক বিভাজন, নৈরাজ্য, বিভীষিকা, ও নরহত্যার পরে উপমহাদেশে যে দুইটি স্বাধীন ডমিনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হলো, তার বড়টি, অর্থাৎ ভারতের সংবিধানে ধর্ম নিরপেক্ষতার নীতি অন্তর্ভূক্ত করা চ্যালেঞ্জিং ছিল বৈ কি। কিন্তু জওহরলাল নেহেরু ও মাওলানা আবুল কালাম আজাদরা বুঝেছিলেন যে, ভারতের মতো বহু ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী, রাজপুত ও আদিবাসীদের দেশে ধর্ম নিরপেক্ষতাই হচ্ছে রাষ্ট্রীয় ঐক্যের মূল চাবিকাঠি।

একই প্রেক্ষাপট, একই নৈরাজ্য, একই বিভীষিকা, একই রাজনৈতিক বাস্তবতা। অথচ ভারত হাঁটলো গণতন্ত্রের পথে, আর পাকিস্তানে শুরু হল প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, এবং সামরিক-বেসামরিক আমলাদের যোগসাজশে ক্ষমতা দখল ও পাল্টা দখল। কী লজ্জার কথা! পাকিস্তানের ৭৫ বছরের ইতিহাসে কোন প্রধানমন্ত্রী তার পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। এই তো কয়েকদিন আগে সেনাবাহিনী, ও সুপ্রিম কোর্টের যোগসাজশে ক্ষমতাচ্যুত হলেন ক্যারিশম্যাটিক ও জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান, যদিও বহিরঙ্গের দৃশ্যপটে ছিল বিরোধী দলগুলো। একটি দেশ কতটা ভঙ্গুর হলে বলা যায় যে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি রাষ্ট্র আছে। অথচ হওয়া উচিত, বা বলা উচিত, পাকিস্তান রাষ্ট্রের একটি সেনাবাহিনী আছে। ইমরান খান তো সেদিন বলেই ফেললেন, সেনাবাহিনী না থাকলে পাকিস্তান ৩ টুকরা হয়ে যেত।

এবার বাংলাদেশের প্রসঙ্গে আসা যাক। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ বিকাশের শক্ত ভিত্তি গড়ে দেয়। ১৯৫০, ও ৬০- এর দশকে যে আন্দোলনগুলো হয়েছিল, যেমন– ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবার্ষীকি পালন, ছয় দফাভিত্তিক স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ঊনসত্তুরের গণঅভ্যুত্থান- এসব আন্দোলনে রাজনীতি, শিক্ষা, ও সংস্কৃতি হাত ধরাধরি করে চলেছে।

উল্লেখিত আন্দোলনগুলোতে যারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে শিক্ষা, সংস্কৃতি, জাতীয়তাবাদ, ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল। বঙ্গবন্ধু ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে পূর্ব পাকিস্তানের সকল মানুষকে স্বাধীনতার আন্দোলনে যুক্ত করেছিলেন। পাকিস্তানের শাসকেরা বার বার এ আন্দোলনকে ধর্ম বিরোধী, এবং ভারতের উস্কানিতে চলা বলে এটিকে দিকভ্রান্ত, বিচ্যুত, ও নস্যাতের চেষ্টা করলেও, সে প্রচেষ্টা সফল হয়নি। ৫০, ৬০, ও ৭০- এর দশকের অন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মানসপট ছিল অসাম্প্রদায়িক, যদিও নিম্নকোটির অনেক মানুষ ‘সেক্যুলারিজমে’র সারবস্তু ঠিকঠাক বুঝতে পারেননি, এখনও বোঝেন না। আওয়ামী লীগের মধ্যে যারা ধর্মপন্থি (ধর্মান্ধ নন), তাদের দিক থেকেও বাঁধা এসেছিল । কিন্তু বঙ্গবন্ধু কোন বাঁধা মানেননি। তিনি তার দূরদর্শিতা ও পরিপক্কতা দিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন যে, বহু ধর্ম,বর্ণ, ও গোত্রের মানুষের রাষ্ট্রের মূল নীতি হতে হবে ধর্ম নিরপেক্ষতা।

মুসলিমদের মহানবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফাও (সা.) মদিনা নগর রাষ্ট্রে ধর্ম নিরপেক্ষ নীতি প্রয়োগ করেছিলেন । রাসুসুল্লাহ (সা.) রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে তার নীতি নির্ধারণ করতেন। নানা ঘটনায় আমরা তার বিচক্ষণতা, অর্ন্তদৃষ্টি, ও বাস্তবতা বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিপক্কতার নজীর পাই। মদিনা নগর রাষ্ট্রে বসবাসরত ইহুদি, খ্রিস্টান, মুসলিম, ও পৌত্তলিকদের পারস্পারিক অবস্থানের কথা বিবেচনা করে মহানবী (সা.) ধর্ম নিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ করেছিলেন।

সমগ্র পাকিস্তান আমলের সকল আন্দোলনে অনুসৃত অসাম্প্রদায়িক নীতিটি ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রীয় চার নীতির একটি হয়ে সংবিধানে অন্তর্ভূক্ত হওয়া ছিল অনন্য একটি ঘটনা। বুঝতে হবে যে, চরিত্রগতভাবে পাকিস্তান বিরোধী সকল আন্দোলন, ও মুক্তিযুদ্ধ ছিল অসাম্প্রদায়িক। বাংলাদেশটি স্বাধীন হয়েছে সকল ধর্ম, বর্ণ, ও লিঙ্গের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। ফলে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মূলনীতি যদি অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্ম নিপেক্ষতা না হয়, তাহলে এ রাষ্ট্র দাঁড়াতেই পারে না। যদিও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর বয়ান হচ্ছে, ধর্ম নিরপেক্ষতা হচ্ছে ধর্মহীনতা; কিন্তু ধর্ম নিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা তো নয়ই, বরঞ্চ এ নীতি ধর্ম পালনের অধিকারকে কোনভাবে সঙ্কুচিত করে না। ধর্মনিরপেক্ষতার সারবস্তু হচ্ছে, ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। ধর্ম ব্যক্তিগত বা সামষ্টিকভাবে যে যার মতো পালন করবেন, কিন্তু রাষ্ট্র কোন ধর্মকে পৃষ্ঠপোষকতা দেবে না। গত কয়েক দশক ধরে উন্নয়ন, মাথাপিছু আয় ইত্যাদি বাড়লেও এই সমান্তরালে শিক্ষা অগ্রসর হয়নি, এবং সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা সঙ্কুচিত হয়েছে। মূল্যবোধের ব্যাপক অবক্ষয় হয়েছে, দুর্নীতি হয়ে গেছে সামাজিক নর্ম। এমন বাস্তবতায় ধর্মান্ধতা, ও ধর্মভিত্তিক ঘৃণা, ও বিদ্বেষ সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে- আমরা কি হিন্দু না মুসলিম, না বাঙালি, না মানুষ? আমরা মানুষ হওয়ার পরিবর্তে বেশি বেশি করে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান হয়ে যাচ্ছি। ফলে সমাজটা হয়ে উঠছে সাম্প্রদায়িক। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার ৫০ বছর পরে বাংলাদেশের নাগরিকেরা যদি আত্মপরিচয়ের সংকটে পতিত হন, সেটি তো ছোটখাটো সংকট নয়। অথচ ৭২ সালেই তো বঙ্গবন্ধু এর ফায়সালা করে দিয়েছেন।

মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশে ফিরে এলেন। লাখো মানুষের মাঝে আবেগআপ্লুত কণ্ঠে বঙ্গবন্ধু বললেন, “মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও আমি বলবো, আমি মোছলমান, আমি বাঙালি, আমি মানুষ।” এটিই হওয়া উচিত বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। বাংলাদেশের হিন্দু বলবে, আমি হিন্দু, আমি বাঙালি, আমি মানুষ। বাংলাদেশের বৌদ্ধরা বলবে, আমি বৌদ্ধ, আমি বাঙালি, আমি মানুষ।

আমার সার কথা হচ্ছে, বাংলাদেশের প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যে রয়েছে তার মনুষ্য সত্তা ও ধর্মীয় সত্তা, আর এর সাথে একাকার হয়ে গেছে তার ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। কিন্তু আমরা যদি আমাদের আত্মপরিচয়ের মানবিক, আধ্যাত্মিক ও পরামার্থিক সারসত্তা বুঝতে না পেরে শুধু ধর্মীয় পরিচয়কে বড় করে তুলি এবং ধর্মভিত্তিক ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়াতে থাকি- তাহলে তো যে অন্ধকারকে আমরা একবার অতিক্রম করে এসেছি, আবারো ফিরে যেতে হবে সেই অন্ধকারের কাছে এবং সেটি হবে মর্মান্তিকভাবে দুর্ভাগ্যজনক।

শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক। তিনি পুলিশ স্টাফ কলেজ, আনসার একাডেমি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সেন্টার অব জেনোসাইড স্টাডিজসহ বিভিন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে পাঠদান করেন। এছাড়া তিনি কলাম ও প্রবন্ধ লেখেন এবং পরিবেশ ও মানবাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত।

সূত্র : বিডিনিউজ