শহীদজায়া মুশতারী শফীর জীবনাবসান

অনলাইন ডেস্কঃ
মুক্তিযুদ্ধের শব্দসৈনিক, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবির আন্দোলনের অন্যতম নেতা শহীদজায়া বেগম মুশতারী শফী আর নেই। ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার বিকালে তার মৃত্যু হয়।

মুশতারী শফীর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। তিনি সাত ছেলে-মেয়ে রেখে গেছেন।

তার স্বামী ডা. মোহাম্মদ শফীকে একাত্তরে বাসা থেকে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।

মুশতারী শফী বেশ কিছুদিন ধরে ঢাকা সিএমএইচে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন জানিয়ে ছেলে মেহরাজ তাহসীন শফী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন,“আজ বিকাল ৪টা ৫০ মিনিটের দিকে চিকিৎসকরা তার লাইফ সাপোর্ট খুলে নেন।”

মুশতারী শফী দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসকষ্টসহ বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন।

তাকে অসুস্থ অবস্থায় গত ২ ডিসেম্বর ঢাকার বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে ঢাকার বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। তবে আবার অসুস্থ হয়ে পড়লে গত ১৪ ডিসেম্বর সিএমএইচে ভর্তি করে আইসিইউতে রাখা হয়েছিল তাকে।

মুশতারী শফীর লাশ মঙ্গলবার চট্টগ্রামে নিয়ে সেখানেই দাফন করা হবে বলে তাহসীন শফী জানিয়েছেন।

মুশতারী শফীর মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোক জানিয়েছেন।

১৯৩৮ সালের ১৫ জানুয়ারি জন্ম নেওয়া মুশতারী শফী ছিলেন চট্টগ্রামসহ সারাদেশের প্রগতিশীল ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। চট্টগ্রামের প্রায় সব নাগরিক আন্দোলনে তিনি ছিলেন সক্রিয়।

১৯৬৩ সালে তিনি চট্টগ্রাম থেকে নারীদের জন্য মাসিক ‘বান্ধবী’ সাময়িকীর প্রকাশনা শুরু করেন এবং ‘বান্ধবী সংঘ’র প্রতিষ্ঠা করেন।

মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে চট্টগ্রাম মহানগরীর এনায়েত বাজারে মুশতারী শফীর বাড়িতেই কালুরঘাটে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক আলোচনা হয়েছিল। শব্দসৈনিক বেলাল মোহাম্মদের সঙ্গে বেতারকেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন ডা. মোহাম্মদ শফী ও তার স্ত্রী মুশতারী।

একাত্তরের শুরুর সময় থেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়, সেবা ও অর্থায়নসহ নানা কাজে যুক্ত ছিলেন তারা।

মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র বাসায় রাখায় ১৯৭১ সালের ৭ এপ্রিল ডা. মোহাম্মদ শফী এবং মুশতারীর ভাই এহসানুল হক আনসারীকে স্থানীয় রাজাকাররা ধরে নিয়ে যার। পরে তাদের হত্যা করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী।

এরপর ভারতে গিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে শব্দ সৈনিক হিসেবে কাজ করেন মুশতারী শফী। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি তিনি দেশে ফেরেন।

মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকার জন্য ২০১৬ সালে মুশতারী শফীকে ফেলোশিপ দেয় বাংলা একাডেমি। ২০২০ সালে তিনি বেগম রোকেয়া পদক পান।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গত শতকের ৯০ এর দশকে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠন করলে তাতে সক্রিয় হন মুশতারী শফী। জাহানারা ইমামের মৃত্যুর পরও আন্দোলন এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখেন তিনি।

যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে প্রায় এক দশক আগে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনেও অনুপ্রেরণাদানকারী হিসেবে ছিলেন মুশতারী শফী।

মুশতারী শফী মহিলা পরিষদে যুক্ত ছিলেন এবং সর্বশেষ উদীচী চট্টগ্রামের সভাপতি ছিলেন।

মুশতারী শফী লেখালেখিতেও ছিলেন সমান সক্রিয়। ‘স্বাধীনতা আমার রক্তঝরা দিন’, ‘মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রামের নারী’, ‘চিঠি জাহানারা ইমামকে’, ‘একুশের গল্প’, ‘দুটি নারী ও একটি যুদ্ধ’, একদিন এবং অনেকগুলো দিন’, ‘আমি সুদূরের পিয়াসি’সহ বেশ কিছু কয়েকটি গ্রন্থের রচয়িতা তিনি।

মুশতারী শফীর মৃত্যুতে শোক জানিয়ে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এক বার্তায় বলেছেন, “তার মৃত্যুতে আমরা একজন প্রকৃত অসাম্প্রদায়িক চেতনার এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষকে হারিয়েছি।”

নাগরিক সমাজ চট্টগ্রামের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. অনুপম সেন ও সদস্য সচিব ইব্রাহীম হোসেন চৌধুরী বাবুল, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরী, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন, সিপিবি চট্টগ্রাম জেলার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবদুল নবী ও সাধারণ সম্পাদক অশোক সাহা, ওয়ার্কার্স পার্টির জেলা সভাপতি আবু হানিফ ও সাধারণ সম্পাদক শরিফ চৌহান, ছাত্র ইউনিয়নের জেলা সভাপতি অ্যানি সেন ও সাধারণ সম্পাদক ইমরান চৌধুরী শোক প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন।

সূত্রঃ বিডিনিউজ