মৈত্রী ভাবনা ও ইহার ফল

ড. বরসম্বোধি ভিক্ষুঃ
সাধারণত: বিদর্শন ভাবনাকারী সাধক-সাধিকাগণের অন্তর অহরহ মঙ্গল-মৈত্রীতে ভরপুর থাকে। বিদর্শন ভাবনা শিবিরের শেষের দিন পুণ্য বিতরণ সাধনাও করা হয়ে থাকে। যখন কোন সাধক-সাধিকা ধর্ম মার্গে সামনে অগ্রসর হয়ে থাকে, তখন তাঁরা কয়েকটি বিষয় তো অনুভূতির মাধ্যমে স্পষ্ট জানতে পারেন। প্রথমত: ইহা জানেন যে, যখন যখন মনে বিকার জাগ্রত হয়, তখন তখন মন ব্যাকুল হয়ে উঠে। এ ব্যাকুলতা নিজের মধ্যে পর্যন্ত সীমিত থাকেনা। সে ব্যাকুলতা অন্যদের মধ্যেও ছড়াতে থাকে। যারা তাঁর সম্পর্কে আসেন তাঁদেরও ব্যাকুল করে তুলেন। এভাবে পরিবেশকে ব্যাকুল করে তোলেন। জীবনভর স্বয়ংও দু:খী হয়ে থাকেন এবং অন্যদেরকেও দু:খী করে তোলেন। ইহার প্রমুখ কারণ হল ‘আমি’ ও ‘আমার’ প্রতি আসক্তি।

বিদর্শন ভাবনা করতে থাকলে অহঙ্কার ক্রমে ক্রমে কমতে থাকে। চিত্তে সামান্যও নির্মলতা এসে থাকলে তখন অন্যদের প্রতি ভালবাসা বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। স্বীয় অহঙ্কারও চুর্ণ হতে থাকে। ভিতরে অল্প পরিমাণ হলেও সুখ-শান্তি অনুভব হয়ে থাকে। তখন সাধক-সাধিকা ইচ্ছা করেন যে, স্বীয় অনুভূত সুখ-শান্তি অন্যদেরকেও বন্টন করব। আমার সুখ শান্তিতে সকলেই ভাগীদার হোক। যে পুণ্য অর্জন করেছি, সেগুলির অংশীদার অন্যদেরকেও করব। অন্যদের প্রতি এরকম মঙ্গল-ভাব জাগ্রত হতে হতে তাতে মৈত্রী ও করুণা জাগ্রত হয়।

প্রাণী জগতের সর্বোচ্চ লোকের প্রাণী হল ব্রহ্মা। ব্রহ্মা সমসময় অনন্ত মৈত্রীতে বিহার করে থাকেন, অনন্ত করুণায় বিহার করে থাকেন, অনন্ত মুদিতায় বিহার করে থাকেন এবং অনন্ত উপেক্ষা বা সমতাভাবে বিহার করে থাকেন। ইহা হল তাঁর স্বভাব। এজন্য মৈত্রী-করুণা- মুদিতা-উপেক্ষা এ চারি ভাবনাকে ব্রহ্মবিহার বলা হয়।

সকল মনুষ্যদের মধ্যেও এ চার গুণ সমাহিত রয়েছে। কিন্তু বীজরূপে থাকে, বিকশিত দেখা যায়না। এ জন্য সেগুলি বিকশিত হতে দেখা যায়না যে, লোকের চিত্ত ময়লার আবরণ দ্বারা আবৃত রয়েছে। বিদর্শন ভাবনা করলে চিত্ত মলের আবরণ অনাবৃত হয়ে যায়। ময়লা পরিস্কার হতে হতে এক সময় এরকমও আসবে যে, গভীরে গিয়ে মোটা মোটা পাথরের মত শক্ত হয়ে থাকা ময়লাও সরতে থাকবে, তখন অভ্যন্তর হতে মৈত্রী ভালবাসার ঝর্ণা প্রবাহিত হতে থাকবে। সে স্ফুরণ হতে প্রতিক্ষণ কেবল ‘মৈত্রীই মৈত্রী’ ‘করুণাই করুণা’ জাগ্রত হবে। এরকম স্ফুরণ, এরকম তরঙ্গ, পুলক রোমাঞ্চ মৈত্রীভাবনায়, মঙ্গল ভাবনায় ভরে উঠবে।তখন সকলের প্রতি কেবল মৈত্রী, কেবল কল্যাণ ভাবনাই থাকবে।

সকল প্রাণী সুখী হোক, বিকার হতে মুক্ত হোক, দৃশ্য হোক বা অদৃশ্য হোক, মনুষ্য হোক বা মনুষ্যেতর হোক, সকল প্রাণীর মঙ্গল হোক, কল্যাণ হোক-এরকম ভাবনায়, এরকম তরঙ্গে স্বীয় মনকে ভরে তুলবেন। সাধক-সাধিকা দেখবেন যে, সমস্ত শরীর তরঙ্গের দ্বারা পুলক রোমাঞ্চ দ্বারা ভরে যাচ্ছে এবং শীঘ্রই এরকম স্থিতিও এসে থাকবে যে, এ তরঙ্গ শরীরের সীমা পর্যন্ত কেবল সীমিত থাকবেনা, শরীরের লোমকুপে লোমকুপে তরঙ্গ বিচ্ছুরিত হবে এবং আশে-পাশের পরিবেশে তা ব্যাপ্ত হয়ে যাবে। এরকম পরিবেশে ব্যাকুল ব্যক্তিও শান্তি অনুভব করবে।

অধ্যানীদের দ্বারা মৈত্রীর অনুশীলন
মৈত্রী ভাবনার সময় অপ্রিয়, অতিপ্রিয়, বৈরী, অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি প্রথমে মৈত্রী না দিয়ে সর্ব প্রথমে নিজের প্রতি মৈত্রী রাখুন, অত:পর স্বীয় পিতা-মাতা, আচার্য-উপাধ্যায়, প্রিয় বন্ধু-বান্ধব, অপরিচিত জন এবং অন্তিমে বৈরীজন…. এভাবে ক্রমানুসারে মৈত্রী পোষণ করতে হয়।

শত্রুর প্রতি যদি মৈত্রী জাগ্রত করতে মন না চায়, তাহলে-
১)অবশিষ্ট অন্যদের প্রতি বার বার মৈত্রী দিতে থাকুন।
২) বুদ্ধের করণীয় মৈত্রী সুত্রকে স্মরণ করুন। বুদ্ধ ককচোপমাবাদ সুত্রে বলেছেন যে-‘কেহ এসে যদি আমার সামনের কোন অঙ্গ কাটতে থাকে, তারপরেও তার প্রতি আমার মনে মৈত্রীই থাকবে।
৩) ভাবুন যে, সে তো আমাকে একবার দু:খী করতে চাচ্ছে, আমি নিজেকে বার বার কেন দু:খী করতে যাব?
৪) তার কৃত উপকারকে স্মরণ করুন।
৫) ভাবুন যে, হায় বেচারা! আমার প্রতি বৈরী বা শত্রুতা পোষণ করে অনন্ত ভবচক্রে ফাঁসবে।
৬) ভাবুন যে, সে আমাকে দু:খী করেছে ইহা হল তার ক্ষেত্র। আমার চিত্ত তো আমারই ক্ষেত্র। আমার ক্ষেত্রে আমি মৈত্রীই জাগ্রত করব।
৭) কর্মের সিদ্ধান্ত হল তার শত্রুতার ফল সে লাভ করবে এবং আমি মৈত্রী জাগ্রত না করলে আমাকেও তো সে ফল ভোগ করতে হবে।
৮) ভাবুন যে, এরকম পরিস্থিতিতে ভগবান বুদ্ধ এবং অরহতেরা কি করতেন?
৯) ভাবুন যে, আমার অনন্ত জন্মচক্রে কখনও না কখনও সে আমার ভাই, বোন, মা, বাবা, পতি, পত্নী, ছেলে, মেয়ে ইত্যাদি কিছু না কিছু অবশ্যই ছিল।
১০) মৈত্রীর ফল স্মরণ করুন।
১১) তার নাম-রূপকে পৃথকীকরণ করে দেখতে থাকুন। সেও তো উদয়-ব্যয়েরই পুঞ্জ। তাহলে আমি কার সাথে ক্রোধ করছি? তার পৃথিবী ধাতুর উপর? তার অগ্নি ধাতুর উপর, তার জল ধাতুর উপর? তার বায়ু ধাতুর উপর? অথবা কি তার বেদনার উপর? না সংজ্ঞার উপর? না সংস্কারের উপর? না বিজ্ঞানের উপর?
১২) তারপরেও শত্রুর প্রতি মৈত্রী জাগ্রত না হলে তাকে কোন উপহার দিন। যদি সেও কিছু দিতে চায়, সে যদি সম্যক আজীবিকা সম্পন্ন হয়ে থাকে, তাহলে গ্রহণ করুন।

ভগবান বুদ্ধ মৈত্রী ভাবনার এগারটি ফলের কথা বর্ণনা করেছেন। সেগুলি হল নিম্ন প্রকার-
১) সুখে নিদ্রা যায় ২) সতেজ হয়ে নিদ্রা হতে জাগ্রত হয় ৩) কখনও দু:স্বপ্ন দেখেনা ৪) মনুষ্যদের প্রিয় হয় ৫) অমনুষ্যদেরও প্রিয় হয় ৬) তাঁকে দেবতা রক্ষা করে ৭) অগ্নি, বিষ, শস্ত্র তাঁকে মারতে পারেনা ৮) সহজে সমাধিস্থ হতে পারেন ৯) মুখাকৃতি শান্ত হয়ে থাকে ১০) মৃত্যু শয্যায় মুর্চ্ছা প্রাপ্ত হননা এবং ১১) মৃত্যুর পর ব্রহ্মলোক প্রাপ্ত হন।