রামু সীমা মহাবিহারে কঠিন চীবর দানোৎসবে পূণ্যার্থীদের ঢল

খালেদ শহীদ, রামুঃ
রামুতে চীবর উৎসর্গ ও দেশ, জাতি ও জগতের সব প্রাণীর সুখ, সমৃদ্ধি কামনা করে কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারে বস্ত্রাধিরাজ দানোত্তম শুভ কঠিন চীবর দান উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। দু’দিন ব্যাপী এ উৎসবে জড়ো হয়েছিলেন শত শত পূণ্যার্থী। রাঙ্গামাটির তাঁতশিল্পীদের চীবর বুনন ও চট্টগ্রামের কীর্তনীয়াদের বুদ্ধকীর্তনের মধ্যদিয়ে বৃহস্পতিবার রাতে রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারে শুরু হয় বস্ত্রাধিরাজ দানোত্তম শুভ কঠিন চীবর দান উৎসব।

 

তিনমাস বর্ষাব্রতের পর প্রবারণা পূর্ণিমা উদযাপনের মধ্যদিয়েই বৌদ্ধরা বিহার থেকে বিহারে চীবর দানোৎসবের পূণ্যযাত্রা করে। এই পূণ্যযাত্রায় জাগে শূচিতা, চারিদিকে অনুরণিত হয় অহিংসার মর্মবাণী। শুক্রবার (৫ নভেম্বর) ভোরে বুদ্ধপূজা, সকালে সংঘদান, অষ্টপরিষ্কার দান, দুপুরে চীবর ও কল্পতরু শোভাযাত্রা, বিকেলে ধর্মসভা এবং সন্ধ্যায় বিশ্বশান্তি কামনায় সমবেত প্রার্থনার মধ্যদিয়ে সম্পন্ন হয় এই উৎসব। শুধু এ বিহারে নয়, প্রবারণা পূর্ণিমার পরদিন থেকে রামু উপজেলার ১৪টিসহ কক্সবাজার জেলার শতাধিক বৌদ্ধ বিহারে শুরু হয়েছে মাসব্যাপী কঠিন চীবর দান উৎসব।

কারও মাথায় চীবরের থালা আর কারও হাতে কল্পতরু। লাইন ধরে অসংখ্য নারী-পুরুষ ও শিশু ছুটছে বিহারের দিকে। বাঁশ-গাছের ব্যবহারে কাগজের নানা কারুকাজে তৈরি দৃষ্টিনন্দন কল্পতরু বা টাকার গাছে ঝুলছে নতুন টাকার নোট, খাতা, কলম, পেন্সিল ইত্যাদি। পেছনে বাদক দল ঢোল, কাঁসরসহ নানা বাদ্যের তালে তালে নাচছে আর গাইছে বৌদ্ধ কীর্তন ‘বুদ্ধ বল বলরে, বুদ্ধের মতন এমন দয়াল আর নাইরে।’ শুক্রবার সকাল থেকে কক্সবাজারের রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারে আসেন বৌদ্ধ পূণ্যার্থীরা। মেরংলোয়া বড়ুয়াপাড়া যুব সমাজের সার্বিক সহযোগিতায় দানোত্তম শুভ কঠিন চীবর দানোৎসব উদযাপন পরিষদের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ উৎসবে সভাপতিত্ব করেন, প্রবীণ ধর্মাচার্য উ. আছাবা মহাথের।

 

শুক্রবার বিকেলে ধর্মসভায় প্রধান ধর্মদেশকের দেশনা দান করেন, রাঙ্গুনিয়া সোনাইছড়ি রাজবিহারের অধ্যক্ষ অধ্যাপক সুনন্দ মহাথের। ভদন্ত শীলপ্রিয় থের উদ্বোধকের দেশনা করেন। ধর্মদেশনা করেন শরণপ্রিয় থের, সৌরবোধি ভিক্ষু প্রমূখ। বঙ্গবন্ধু গবেষণা পরিষদের সভাপতি ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া বিশেষ আলোচক ও রামু উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নোবেল কুমার বড়ুয়া বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তৃতা করেন, রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তরুণ বড়ুয়া, স্বাগত বক্তৃতা করেন, সাধারণ সম্পাদক রাজু বড়ুয়া। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন, অধ্যাপক নীলোৎপল বড়ুয়া।

ওই দিন সকালে একুশে পদকপ্রাপ্ত রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারের প্রয়াত অধ্যক্ষ উপ-সংঘরাজ সত্যপ্রিয় মহাথের’র নির্বাণ সুখ কামনায় অষ্টপরিস্কার ও সংঘদান অনুষ্ঠিত হয়। সকালের ধর্মসভায় প্রধান ধর্মদেশক ছিলেন, করুণাশ্রী মহাথের। উদ্বোধন করেন, প্রজ্ঞাবোধি মহাথের। ধর্মদেশনা করেন জ্ঞানপ্রিয় থের, শাসনপ্রিয় থের, প্রজ্ঞাতিলোক থের, প্রজ্ঞাবিনয় ভিক্ষু প্রমূখ। পঞ্চশীল প্রার্থনা করেন, নিমাংশু বড়ুয়া।

বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা জানান, বুদ্ধের জন্ম, গৃহত্যাগ, বুদ্ধত্ব লাভ এবং মহাপরিনির্বাণ লাভসহ মহামতি বুদ্ধের জীবনের প্রতিটি ঘটনা পূর্ণিমা কেন্দ্রিক। আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত তিন মাস বর্ষাব্রত পালনের শেষ দিনটি হচ্ছে প্রবারনা পূর্ণিমা। এ তিন মাস ভিক্ষুরা নিরলসভাবে শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞার অনুশীলন করেন। এরমধ্যে বিশেষ কয়েকটি কারণ ছাড়া এক রাতের জন্যও বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বিহারের বাইরে থাকতে পারেন না। যদি কেউ নিয়ম ভঙ্গ করেন তবে ওই ভিক্ষু কঠিন চীবর লাভ করতে পারেন না। মূলত বিহারে অধিষ্ঠানরত বৌদ্ধভিক্ষুকে চীবর দান করার জন্য এ উৎসবের আয়োজন করা হয়।