আমাদের বিপদ বাড়াচ্ছে বড় দেশগুলো: প্রধানমন্ত্রী

অনলাইন ডেস্কঃ
বিশ্বে যে দেশগুলো কার্বন নির্গমন বেশি করছে, ক্ষতি প্রশমনে তারা প্রতিশ্রুতি না রাখায় ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো যে বিপদে পড়েছে, তা তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

গ্লাসগোয় কপ-২৬ সম্মেলনের পাশাপাশি ফোরামের সভাপতি হিসেবে মঙ্গলবার ৪৮ জাতি সিভিএফ নেতাদের সংলাপে তিনি একথা বলেন বলে রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা বাসস জানিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কার্বন নিঃসরণকারী গুরুত্বপূর্ণ উন্নত দেশগুলো তাদের প্রতিশ্রুত তহবিল না দেওয়ায় জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দরিদ্র দেশগুলোকে আরও অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। “এটা দুর্ভাগ্যজনক। এর ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের ধ্বংসাত্মক পরিণতি মোকাবেলায় আমাদেরকে নিজেদের মতো করে পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে।”

ছয় বছর আগে প্যারিস জলবায়ু সম্মেলেন উন্নত দেশগুলো জলবায়ু ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য বছরে ১০০ কোটি ডলারের তহবিল গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে এখনও তা পুরোপুরি সফল হয়নি।

এই পরিস্থিতিকে ‘দুঃখজনক এবং হতাশাব্যঞ্জক’ বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “পর্যাপ্ত, টেকসই ও সহজলভ্য জলবায়ু অর্থায়ন ছাড়া কার্যকর কর্মপরিকল্পনা সম্ভব নয়। তাই এটা দুঃখজনক এবং হতাশাজনক যে এখন পর্যন্ত প্রধান গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী দেশগুলো তাদের প্রতিশ্রুত বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলার সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়েছে।

“সেই কারণেই অস্তিত্ব সঙ্কটের মুখোমুখি হয়ে আমরা, সিভিএফ সদস্যরা, এই কপ-এ ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই ৫ বছরের অভিযোজন ও প্রশমনের ৫০:৫০ আনুপাতিক হারে প্রতিবছর মোট ৫০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিতরণ পরিকল্পনা মাফিক অর্থায়ন উন্নত দেশগুলোর কাছে দাবি করি।”

‘ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম লিডার্স ডায়ালগ : ফোর্জিং এ সিভিএফ-কপ-২৬ ক্লাইমেট ইমার্জেন্সি প্যাক্ট’ শীর্ষক এই সংলাপে সভাপতিত্ব করেন শেখ হাসিনা। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এবং জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এতে বক্তব্য রাখেন।

ভাষণে প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় বাংলাদেশের নেওয়া নানা পদক্ষেপ তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, “জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সম্মানে বাংলাদেশ ‘মুজিব জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনা’ চালু করেছে। ‘কম কার্বন কৌশল’ অবলম্বনের মাধ্যমে আমাদের উন্নয়নের পথ নির্দেশনা দিতেই এই পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।”

৩৭ সিভিএফ সদস্য রাষ্ট্রগুলোকেও একই নিজ নিজ দেশের জন্য পরিকল্পনা তৈরি করে এগোনোর আহ্বান জানান শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, সিভিএফ একটি ‘জলবায়ু জরুরি চুক্তি’ নিয়ে এসেছে। এই চুক্তিটি জলবায়ু অর্থ সরবরাহ পরিকল্পনাকে সমর্থন করে।

‘নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে’

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় নারীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়াতে বললেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেছেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান ভুক্তভোগী হিসেবে নারীরা এই ঝুঁকি মোকাবেলায় বর্ধিত অংশীদারিত্বের দাবিদার এবং তাদের ক্ষমতায়নের জন্য বিশেষ করে সহনশীল উন্নয়নে আরও সাহসী পদক্ষেপের প্রয়োজন।”

কপ২৬ সম্মেলনের ফাঁকে মঙ্গলবার নারী এবং জলবায়ু পরিবর্তনের উপর একটি উচ্চ পর্যায়ের প্যানেল আলোচনায় তিনি একথা বলেন বলে বাসস জানায়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বেশ কিছু আর্থ-সামজিক এবং সাংস্কৃতিক কারণে বিশ্বের বেশিরভাগ ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। তাদের বেশিরভাগই নারী এবং মেয়ে শিশু।

“জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট তাদের (নারী) দুর্বলতা মোকাবেলায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় মহিলাদের জন্য অবস্থান তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।”

নারীদের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, “অনেক সমাজে তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই এবং তারা প্রায়ই স্বল্প বেতনের এবং অবৈতনিক চাকরি ও কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত থাকে।

“এ সব কারণে নারীদের ওপর পুরুষদের তুলনায় জলবায়ু পরিবর্তনের বিররূপ প্রভাব বেশি পড়ে।”

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়ায় নারীদের ‘চরম বিপন্নতা’ স্বীকার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিপরীতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কঠিন পরিস্থিতিতে নারীরাই যে প্রথম তাদের পরিবার পরিজনের যত্ন নিতে ঘুরে দাঁড়ায়, তাও বলেন শেখ হাসিনা।

অনুষ্ঠানে প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদ পর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করেছে।

জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত নীতি, কৌশল ও পদক্ষেপে লিঙ্গ সমতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারের ‘ন্যাশনাল ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড জেন্ডার অ্যাকশন প্ল্যান তৈরির কথাও বলেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার ‘জেন্ডার রেসপন্সিভ বাজেটিং (জিআরবি)’ চালু করেছে, এতে সকল নীতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় মূলধারায় নারীর উন্নয়নে নারীদের জন্য প্রায় ৩০ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে যোগ দিতে ৩১ অক্টোবর গ্লাসগোতে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। আগামী ৩ নভেম্বর তিনি লন্ডনে যাবেন। এরপর ৯ নভেম্বর যাবেন প্যারিস সফরে। দুই সপ্তাহের সফর শেষে আগামী ১৪ নভেম্বর তার দেশে ফেরার কথা রয়েছে।

সূত্রঃ বিডিনিউজ