সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস: রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলের ভূমিকা

শিরীন আখতারঃ
অতিসম্প্রতি সার্বজনীন শারদীয় উৎসব দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে দুর্গাপূজা মণ্ডপ, মন্দির, হিন্দুদের ঘর-বাড়িতে হামলা, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, নির্যাতন, হত্যা, প্রাণহানির ঘটনায় অত্যন্ত ব্যথিত ও ক্ষুদ্ধ হৃদয় নিয়ে নিহত-আহত-ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছি। আমাদের দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ন্যাক্কারজনক সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে নিয়ে- তাৎক্ষণিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার মধ্যেই থেমে যাওয়া, আটকে থাকা এবং পরবর্তী ঘটনার জন্য অপেক্ষা করাকে সঠিক বিবেচনা করে না। বরং সবার সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এ ধরনের সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস যাতে না ঘটে, সেদিকে মনোযোগ দেওয়া এবং স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে কাজ করে যাওয়ার ব্যাপারেই আমরা বেশি আগ্রহী। এ নিবন্ধটি সে উদ্দেশ্যেই লেখা।

এবারের ঘটনা কি বিচ্ছিন্ন?

বৈশ্বিক মহামারী কোভিডের প্রকোপ কিছুটা কমে আসার ফলে দুই বছর পর এবার ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে বত্রিশ হাজারের বেশি মণ্ডপে সার্বজনীন শারদীয় উৎসব দুর্গা পূজা শুরু হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে পূজা শুরুর আগে কয়েকটি স্থানে প্রতিমা ভাংচুরের ঘটনা ঘটলেও শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমূখর পরিবেশেই পূজা চলছিল। শারদীয় দুর্গাপূজার অষ্টমীর দিনে কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ে একটি পূজামণ্ডপে সবার অগোচরে কোরান শরীফ রেখে তা ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করে হামলা করা হয়। কুমিল্লার ঘটনার পর দেশের বেশ কয়েকটি জেলা-উপজেলায় পূজামণ্ডপ-মন্দির-ঘরবাড়িতে হামলা, ভাংচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, নির্যাতন ও হত্যা ঘটে। নিমিষেই আনন্দ উৎসব বিষণ্ণতায় ছেয়ে যায়। সংখ্যার বিচারে আক্রান্ত মণ্ডপ-মন্দিরের সংখ্যা কম হলেও এটাকে কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা যায়? কুমিল্লার ঘটনা ঘটানোর পর এতোগুলো জেলা-উপজেলায় ঘটনা ঘটলো কিভাবে? এসব হামলা কি কিছু মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া? না কি উছিলা তৈরি করে আক্রমণের জন্য ওঁৎ পেতে থাকা গোষ্ঠীর সুপরিকল্পিত হামলা?

আমাদের দল মনে করে, এ হামলা কিছু মুসলিমের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ওঁৎ পেতে থাকা গোষ্ঠী সুপরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। কারণ ‘কোরান অবমাননা, নবীর অবমাননা’ ইত্যাদি বলে ধারাবাহিকভাবে একের পর এক ঘটনা ঘটেই চলছে। প্রতিবার ঘটনার পর প্রতিবাদ, মামলা হয় কিন্তু পুনরাবৃত্তি বন্ধ হয়না। এবারও সরকার ও প্রশাসন কঠোর অবস্থান নিয়েছে। মামলা হয়েছে, সন্দেহভাজন অপরাধীরা গ্রেপ্তার হয়েছে। সমগ্র দেশেই প্রতিবাদ হয়েছে। কিন্তু ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধ করা হচ্ছে না।

আমাদের দল মনে করে, হিন্দু সম্প্রদায়সহ সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার পেছনে রাষ্ট্রীয়-রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক এবং আন্তর্জাতিক-আঞ্চলিক সীমানাপার কারণ বিদ্যমান রয়েছে।

রাষ্ট্রের দুর্বলতা

মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দ্বি-জাতি তত্ত্বের কবর দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে অত্যন্ত দ্রুত সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি সংবিধান উপহার দেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সংবিধান অনুযায়ী সদ্য স্বাধীন দেশ-রাষ্ট্র-সমাজ বিনির্মাণ ও লালনে দুর্বলতা এবং ঘাটতি ছিল। ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা-অনুশীলন-লালন, রাষ্ট্র-রাজনৈতিক আচারে দুর্বলতা ও ত্রুটি ছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর জিয়া-এরশাদ সামরিক শাসনামলে কবর থেকে দ্বি-জাতি তত্ত্বের পচা-গলা লাশ তুলে এনে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাস্প ছড়ানো হয়েছে। সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ্’, রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলাম-কে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। দ্বি-জাতি তত্ত্বের ধারক-বাহকদের রাষ্ট্র-রাজনীতি-সমাজে পুনর্প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। সাম্প্রদায়িকতার সে-ই বিষবৃক্ষ বিষফল দিয়েছে। বিষফলের বীজ থেকে নতুন করে বিষবৃক্ষ জন্ম নিয়ে রাষ্ট্র-সমাজকে বিষাক্ত করেই চলেছে।

রাজনৈতিক দলের দুর্বলতা

ষাট দশকে জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম-স্বাধীনতা সংগ্রাম, ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ এমনকি ৭০-৮০ দশকে সামরিক শাসন কবলিত বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক-অসাম্প্রদায়িক-প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি অসাম্প্রদায়িকতার আদর্শ ও নীতিতে যতটা অটল, শক্তিশালী, আপসহীন ছিল- আজ তা অনেক দুর্বল হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতর থেকে অসাম্প্রদায়িক আদর্শের শক্তি অনেক কমে গিয়েছে। রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা নিজেরাই অসাম্প্রদায়িক আদর্শ ভুলে গিয়েছে, পরিত্যাগ করেছে। ‘ধর্মপ্রাণ’ হতে গিয়ে ধর্মান্ধ ও সাম্প্রদায়িক হচ্ছে। রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে নিজেদের ‘ধর্মপ্রাণ’, ‘ভাল মুসলমান’, ‘ভাল হিন্দু’ ইত্যাদি প্রমাণ করতে গিয়ে ধর্মপরায়ণতা ও ধর্মান্ধতার পার্থক্য মুছে ফেলা হচ্ছে।

সাম্প্রদায়িক ও ধর্মনির্ভর রাজনীতির উত্থান

দুর্ভাগ্যজনকভাবে সামরিক শাসকদের তৈরি দল বিএনপি ও জাতীয় পার্টি এবং তাদের মদদে পুনর্প্রতিষ্ঠিত জামাতসহ স্বাধীনতা বিরোধী, দেশবিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তি, ধর্মনির্ভর রাজনৈতিক শক্তি নতুনভাবে নানা নামে গড়ে ওঠা সাম্প্রদায়িক, ধর্মান্ধ, ধর্মান্তরিত রাজনৈতিক শক্তিসমূহ সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়েই চলেছে। এ সকল ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলের সাথে অংশীদারিত্বের রাজনীতি চলছে। এ অংশীদারিত্বের রাজনীতির পথেই যুদ্ধাপরাধীদের সাথে নিয়ে সরকার গঠিত হয়েছে। চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক বিচার ও সাজার রায় হওয়ার পরও মানবতাবিরোধীদের বিচারকে ‘আলেম ওলামাদের বিচার’, ‘ইসলামবিরোধী বিচার’ হিসেবে চিহ্নিত করে সহিংসতার রাজনীতি হয়েছে।

রাষ্ট্র-প্রশাসনে সাম্প্রদায়িকতার ভূতের আছর

রাষ্ট্র-প্রশাসনে বিদ্যমান সমাজ ও রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন অংশ না। সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধ রাজনীতির প্রভাবে রাষ্ট্র-প্রশাসন-প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের মধ্যে এমনকি আইন-শৃংখলা রক্ষাবাহিনীর সদস্যের আচরণ ও কর্মকাণ্ডও প্রতিফলিত হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট যুদ্ধপরাধের অভিযোগে দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর বিচার চলাকালে তাকে দেশ-জাতি-মানবতার বিরুদ্ধে ঘোরতর অপরাধী হিসেবে না দেখে তাকে একজন ‘আলেম’ হিসেবে দেখে ‘হুজুরে’র সান্নিধ্য লাভের জন্য পুলিশ সদস্যদের নির্লজ্জ প্রতিযোগিতার ছবি পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। একই ঘটনা ভাস্কর্য ভাঙাসহ মামুনুল হক গ্রেপ্তার হওয়ার পর একজন পুলিশ সদস্য তার পক্ষে ফেইসবুক লাইভে বক্তব্য দেওয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাতেও সরকার, প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট নির্দেশ থাকার পরও আইনশৃংখলা রক্ষা বাহিনীর প্রস্তুতিহীনতা, দায়িত্ব পালনে গাফিলতি, ধীরে চলার ঘটনার অভিযোগ উঠেছে।

শিক্ষা ও শিক্ষাঙ্গন সাম্প্রদায়িকীকরণ

পরিবারের পর শিশুদের মানস গঠনে শিক্ষা ও শিক্ষাঙ্গনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের শিক্ষা ও শিক্ষাঙ্গন সাম্প্রদায়িকীকরণের কবলে পতিত। স্কুল পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নে চরম সাম্প্রদায়িক নীতির বহির্প্রকাশ ঘটেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের একটি বড় অংশ সুপরিকল্পিতভাবে শিশু মনেই সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করছে।

আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দুনিয়ার ‘দ্বৈত নীতি’ ও ‘ইসলামভীতি’ থেকে ‘মুসলিম বিদ্বেষ’, ফিলিস্তিন-ইসরায়েল নীতি, ইরাক-সিরিয়া-আফগানিস্তান নীতির প্রতিক্রিয়া হিসেবে রাজনৈতিক ইসলামের উত্থান হয়েছে। আবার খোদ যুক্তরাষ্ট্রই এ রাজনৈতিক ইসলামের ধারক। আলকায়েদা-আইএস-তালেবান তৈরির পেছনেও তাদের হাত ও পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক এ পরিস্থিতির প্রভাব আমাদের দেশেও পড়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার এক দেশে যারা ধর্মীয় বা জাতিগতভাবে সংখ্যাগুরু আরেক দেশে তারা সংখ্যালঘু। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার যে কোন দেশে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর বৈষম্য বা নির্যাতনের সীমাহীন প্রভাব রয়েছে। বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলা করতে হচ্ছে।

আক্রমণ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে

ধর্মের অজুহাত তুলে শুধু হিন্দু বা সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা আক্রমণ হচ্ছে না; বরং আক্রমণ হচ্ছে বাংলাদেশ রাষ্ট্র, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অস্তিত্বের ভিত্তি-রাষ্ট্রের প্রতীকের ওপর। অপশক্তি ধর্মের দোহাই দিয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের বিরোধিতা করেই ক্ষান্ত হয়নি, দেশের বিভিন্ন স্থানে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙ্গে ফেলেছে। ভাস্কর্যের বিরোধিতা করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রামে নজিরবিহীন সন্ত্রাস ও সহিংসতার রাজত্ব কায়েম করেছিল এরা। এদের পছন্দের ধর্মীয় মতকেই সকল মুসলিমের ওপর চাপিয়ে দিতে গিয়ে ইসলাম ধর্মের শান্তিবাদী ধারা, সুফিবাদ ও মরমীবাদের ওপর হামলা করছে দুর্বৃত্তরা। পীর-দরবেশের মাজারে হামলা করছে। এরা ঈদে মিলাদুন্নবী, শবেবরাত পালন, ঈদে কোলাকুলি, করমর্দন, নফল নামাজ পড়া, জিকির-আসকারে পর্যন্ত বিরোধিতা করছে। পয়লা বৈশাখ, নববর্ষ পালনসহ বাঙালির ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি, উৎসব, মেলার বিরোধিতা করছে। এরা ধর্মকে মানুষের বিরুদ্ধে, স্বাধীনতার বিরুদ্ধে, বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে, স্বাধীনতার বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে দাঁড় করাচ্ছে।

সহ্য করা, নাকি প্রতিরোধ

ধর্মের দোহাই দিয়ে সংখ্যালঘুদের ধারাবাহিক নির্যাতন, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তি ধ্বংস করে বাংলাদেশকে পাকিস্তানি ভাবাদর্শের একটি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র বানানোর চলমান রাজনীতির দাপট সহ্য করতে শুরু করবো, নাকি প্রতিরোধ গড়ে তুলবো? বাঙালি জাতিসহ এ ভূখণ্ডের জনগণের ইতিহাস হচ্ছে অন্যায়-অত্যাচার-বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করা। সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধ রাজনীতির দাপট মেনে নেওয়া মানে মুক্তিযুদ্ধের অসম্মান, শহীদদের অসম্মান, বাংলাদেশের অসম্মান মেনে নেওয়া।

আমরা জাসদ মনে করি, পরিস্থিতি যতই বিরূপ হোক, দেশবিরোধীরা যতই শক্তি সঞ্চয় করুক, সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতার অন্ধকার যতই আচ্ছন্ন করুক- প্রতিরোধের সূচনা করতে হবে। প্রতিরোধের পথেই বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, মুক্তিযুদ্ধসহ অতীতের সকল গণতান্ত্রিক সংগ্রামের চেতনায় জাতীয় ঐকমত্য ও জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলে জাতীয় ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের সূচনা এবং ধারাবাহিক মাটি কামড়ে লেগে থাকলে জাতীয় পুনর্জাগরণ সম্ভব এবং বাংলাদেশের শত্রুদের পরাজিত করা সম্ভব।

হিন্দুদের নির্যাতন প্রতিরোধের লড়াইটা হিন্দুদের ওপরই ছেড়ে দেওয়া এবং এটা হিন্দুদের একার লড়াই হিসেবে নেওয়াটা ভুল হবে। সকল ধর্মের শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষকে একসাথে লড়াই করতে হবে। সকল ধর্মের মানুষদের মধ্যে বিশ্বাস, আস্থা, সংযোগ, যোগাযোগ, সম্প্রীতি, বন্ধুত্ব ও ঐক্যের পথেই অগ্রসর হতে হবে। লড়াইয়ের ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নতা আত্মঘাতী হবে, সাম্প্রদায়িক শক্তির পাতা ফাঁদেই পা দেওয়া হবে।

প্রতিরোধ লড়াই শুরু হবে কোথা থেকে?

রাজনীতিই সমাজকে নেতৃত্ব দেয়। রাজনৈতিক অঙ্গন থেকেই লড়াইয়ের সূচনাটা করতে হবে। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নিজেদের দুর্বলতা, দ্বৈততা, মাঝামাঝি পথে চলা বন্ধ করতে হবে। ‘আপনি আচরি ধর্ম পরকে শিখাইয়ো’ এর মতই অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তির ক্ষয়ে যাওয়া, দুর্বল হয়ে যাওয়া অসাম্প্রদায়িক আদর্শ পুনরুদ্ধারের কাজটা দিয়ে শুরু করতে হবে। অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তিকে সব ধরনের ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা, প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়াতে হবে। কৌশলের নামে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। মীমাংসিত বিষয় ও ঐতিহাসিক সত্যকে আড়াল করার রাজনীতি বন্ধ করতে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। ধর্মান্ধ, সাম্প্রদায়িক ও ধর্মনির্ভর রাজনৈতিক দলের সাথে অংশীদারিত্বের রাজনীতি পরিহার করতে হবে।

ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির পুনর্জাগরণে সাংস্কৃতিক আন্দোলন জোরদার করতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষাঙ্গনকে সাম্প্রদায়িকীকরণ রুখে দিতে হবে। অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ও প্রশাসন গড়ে তোলার জন্য প্রশাসনের স্তরে স্তরে লুকিয়ে থাকা বর্ণচোরা সাম্প্রদায়িক ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। অসাম্প্রদায়িক প্রশাসন গড়ে তুলতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান করতে হবে।

প্রতিবার হামলার পর মামলা হয়, তদন্ত হয়, গ্রেপ্তার হয়। কিন্তু মামলা পরিচালনার ত্রুটি ও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে অপরাধীরা ছাড়া পেয়ে যায়। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে হিন্দু বা সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা করা হলে তার বিচার করার কেউ নাই। সাম্প্রদায়িক হামলা-হত্যার সকল ঘটনার বিচার করে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীদের রাজনৈতিক দলে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ করতে হবে।

সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি পুনরুত্থানে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক দল, নেতৃত্ব ও সরকারগুলোকে এক জায়গায় দাঁড় করানোর জন্য উদ্যোগ নিতে হবে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের বছরেই সংবিধান পর্যালোচনার বিশেষ সংসদীয় উদ্যোগ গ্রহণ করে মুক্তিযুদ্ধসহ অতীতের সকল গণতান্ত্রিক ও জাতীয় সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মীমাংসিত বিষয়সমূহ এবং ৭২ সালের মূল চেতনা ও বৈশিষ্ট্যের সাথে রাষ্ট্রধর্মসহ সকল সাংঘর্ষিক-অসঙ্গতিপূর্ণ আইন বা অধ্যাদেশ দূর এবং সংবিধানের অন্যান্য সকল নির্দেশ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করতে হবে।

(জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটি আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনা হয় ২৫ অক্টোবর। ‘সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস: রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলের ভূমিকা’ শীর্ষক ওই আলোচনায় এ নিবন্ধটি পাঠ করেন সংসদ সদস্য ও দলটির সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার।)

সূত্রঃ বিডিনিউজ