বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ কি আছে, প্রশ্ন রানা দাশগুপ্তের

অনলাইন ডেস্কঃ
আওয়ামী লীগের শাসনকালে দেশে সাম্প্রদায়িক হামলা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত। তিনি বলেছেন, “আমরা সরকারি দলের নেতাদের আত্মশুদ্ধি চাই। এ আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ কি না, আমরা জানি না।

“আমাদের কাছে মনে হচ্ছে, আওয়ামী লীগ ক্রমশ ১৯৪৮ সালের আওয়ামী মুসলিম লীগের দিকে চলে যাচ্ছে। ওই আওয়ামী মুসলিম লীগ দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয় নাই।”

সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদ এবং সম্প্রীতির আহ্বানে বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটি আয়োজিত সমাবেশে একথা বলেন তিনি।

রানা দাশগুপ্ত বলেন, “আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় এল আমরা আশা করেছিলাম, সাম্প্রদায়িক হামলার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না। কিন্তু আমাদের সমস্ত আশায় ছাই দিয়ে সাম্প্রদায়িক হামলা শুধু অব্যাহত নয়, বরং বেড়েছে।”

আওয়ামী লীগের মধ্যে ‘সাম্প্রদায়িক অপশক্তি’ ঢুকে সাম্প্রদায়িক হামলা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

রানা দাশগুপ্ত বলেন, “আমরা যখনই কথাগুলো বলতে থাকলাম, সরকারি দল থেকে বলা হল- দলের ভেতরে ‘কাউয়া’ ঢুকেছে। আমরা জানতে চাই, এ কাক কারা? ওই কাকদের বিরুদ্ধে সরকারি দল কী ভূমিকা গ্রহণ করেছে?

“আপনারা ক্ষমতায় এসেছিলেন, আমরা শান্তি-স্বস্তি পেয়েছিলাম। ১৩ বছর পর এসে আমাদের গিনিপিগ হিসেবে ভাববেন না। এদেশের নাগরিক হিসেবে, মুক্তিপ্রেমী হিসেবে সর্ব নাগরিক হিসেবে আপনারা আমাদেরকে মর্যাদা দিন।”

প্রবীণ এই আইনজীবী বলেন, “রাজনৈতিক দলের নেতারা একটি কথা বলতে অভ্যস্ত- বাংলাদেশে যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আছে তা পৃথিবীর কোনো জায়গায় নাই।

“আমি বলব রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ ভাবে সংবিধানকে ‘সাম্প্রদায়িকরণ’ করে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানে ভাগ করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি বিনষ্ট করেছে।”

প্রধানমন্ত্রী ছাড়া আর কোনো রাজনীতিবিদের উপর আস্থা নেই বলে মন্তব্য করেন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক।

আগামী সংসদ নির্বাচনের আগে সংখ্যালঘু কমিশন গঠন এবং সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইনসহ বিভিন্ন সময়ের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে রাজপথে থাকার আহ্বান জানান তিনি।

ইসকন বাংলাদেশের সম্পাদক চারু চন্দ্র দাশ ব্রহ্মচারীর সভাপতিত্বে সমাবেশে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য অধ্যাপক অনুপম সেন, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাংসদ মোসলেম উদ্দিন আহমেদ, মহানগর কমিটির সভাপতি মাহাতাব উদ্দিন চৌধুরী, উত্তর জেলার সভাপতি ও চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এমএ সালাম, চট্টগ্রাম মহানগরের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন, দক্ষিণ জেলার সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান ও চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহবায়ক শাহাদাত হোসেন।

সমাজবিজ্ঞানী অনুপম সেন বলেন, “কুমিল্লায় হিন্দুদের উপর যে ঘটনা ঘটানো হলে, আপনারা দেখেছেন সেটি একটি চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র। আপনারা যদি ভাবেন এ ধরনের ষড়যন্ত্র এখন শেষ হয়ে যাবে.. তা শেষ হবে না। এ ষড়যন্ত্র চলতেই থাকবে।

“নিজেদের রক্ষার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। আমরা বারবার নিজেদের রক্ষার জন্য প্রস্তুত থাকিনি। ২০০১ সালে বিএনপি যখন ক্ষমতায় এসেছিল, তখন সারা বাংলাদেশজুড়ে যে অত্যাচার হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে আমরা প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম। কিন্তু রাস্তায় দাঁড়াতে পারিনি। রাস্তায় কোনো লোককে পাইনি।”

আওয়ামী লীগ নেতা সালাম বলেন, “আপনাদের বুঝতে হবে সরকারকে বিব্রত এবং হটানোর জন্য এসব করা হচ্ছে। দেশে সংখ্যালঘু বলতে কিছু নেই। আমরা সবাই বাঙালি। সংখ্যালঘু স্বাধীনতার চেতনার পরিপন্থি।”

বিএনপি নেতা শাহাদাত সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করে বলেন, “যারা আগে থেকেই জেলে আছে, তাদের আসামি চাই না। আমরা চাই, যারা ঘটনার সাথে জড়িত তাদের আটক করে বিচারের আওতায় এনে সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনা হোক।”

ইসকন সম্পাদক চারু চন্দ্র দাশ ব্রহ্মচারী বলেন, “১৯৭১ এর পর থেকে দেশে যতগুলো সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটেছে, তার একটিরও বিচার হয়নি। যদি একজনও শাস্তি পেত তাহলে সবাই ভয় পেত। এ ধরনের ঘটনা আর ঘটত না।”

নোয়াখালীর চৌমুহনিতে হামলার সময় পুলিশকে ফোন করেও পাওয়া যায়নি অভিযোগ করে তিনি বলেন, প্রশাসনের মধ্যেও সাম্প্রদায়িক শক্তি ঘাঁপটি মেরে বসে আছে বলে তার সন্দেহ।

“হামলার পর প্রশাসনের লোকজন এসে বলছে, এটা বিএনপি-জামাত করেছে। আমরা বলতে চাই, যেই করুক, শনাক্ত করে তাদের বিচারের আওতায় আনুন।”

প্রধানমন্ত্রীকে ‘মা’ সম্বোধন করে চারু ব্রহ্মচারী বলেন, “প্রধানমন্ত্রী আমাদের ডাকুক। আমাদের দাবিগুলো প্রধানমন্ত্রীকে জানাতে চাই। আমরা আশা রাখি, তিনি আমাদের ফিরিয়ে দেবেন না।”

সমাবেশে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রাচ্য ভাষা বিভাগের অধ্যাপক ড. জিনবোধী ভিক্ষু, চট্টগ্রাম ইসকনের সম্পাদক চিন্ময় কৃষ্ণ দাশ ব্রহ্মচারী, প্রবর্তক ইসকনের সম্পাদক লীলারাজ গৌর বহ্মচারী, শংকর মঠের অধ্যক্ষ তপনানন্দ ব্রহ্মচারী, জাসদ নেতা ইন্দু নন্দন দত্ত, কেন্দ্রীয় জন্মষ্ঠামী উদযাপন পরিষদের সম্পাদক ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী প্রবীর সেন, সাবেক সভাপতি দেবাশীষ পালিত, চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি আশীষ ভট্টাচার্য্য, চন্দন কুমার তালুকদার, ওয়ার্ড কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমন, যুবলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবরসহ বিভিন্ন সনাতনী সংগঠনের নেতারা।

সমাবেশ শেষে একটি শোভাযাত্রা নন্দনকানন থেকে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব গিয়ে শেষ হয়।

সূত্রঃ বিডিনিউজ