রামুতে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর মানববন্ধন: সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বন্ধ ও দোষীদের বিচারের দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক, রামুঃ
আমরা ধর্ম ভীরু হবো, ধর্মান্ধ হবো না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আমরা এদেশে বসবাস করি। আমরা এদেশের নাগরিক। সংখ্যালুঘু বলতে কিছুই নেই। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বন্ধ ও দোষীদের বিচারের দাবিতে রামুতে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে বিশিষ্টজনরা এ কথা বলেন। মঙ্গলবার (২৬ অক্টোবর) সকাল ১০টায় কক্সবাজারের রামু উপজেলার চৌমুহনী ষ্টেশনের কলম চত্ত্বরে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) উপজেলার সভাপতি মাষ্টার মোহাম্মদ আলমের সভাপতিত্বে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বিরোধী এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

সাম্প্রদায়িক সহিংসতা অবিলম্বে বন্ধ ও দোষীদের বিচারের দাবি জানিয়ে বক্তারা বলেন, সহিংসতার ঘটনাগুলোয় জড়িতদের চিহ্নিত করতে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে এবং দোষীদের চিহ্নিত করে বিচারিক প্রক্রিয়ায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে হবে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলতে হবে। আমার সবধর্মের মানুষ সামাজিক সম্প্রীতিতে বসবাস করতে চাই। পরস্পপরকে দোষারোপের রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিহার করে, বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে পারস্পরিক সম্প্রীতির বার্তা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। বিচারহীনতা, পরস্পরের ওপর দোষারোপ ও পক্ষপাতমূলক আচরণের সংস্কৃতির কারণে দেশে বারবার সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনায় এটাই স্পষ্ট হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) নেতৃবৃন্দ।

মানববন্ধনে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রামু উপজেলার পক্ষে উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বক্তৃতায় অধ্যাপক নীলোৎপল বড়ুয়া বলেন, সম্প্রীতিধর্মী সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড জোরদার করে, পরমত সহিষ্ণুতার বার্তা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। ঐক্যের চেতনাকে ধারণ করে, মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে উদার, সহিষ্ণু ও বহুত্ববাদী সমাজ গঠনে উদ্যোগী হতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে সম্প্রীতি ও পরমত সহিষ্ণুতার বিষয়গুলোকে সন্নিবেশিত করতে হবে। ফেসবুকে গুজব ও বিদ্বেষ ছড়ানো বন্ধ করতে হবে। অসত্য গুজবে অবমাননাবোধের ঠুনকো মানসিকতা পরিহার করতে হবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রামু উপজেলার সাধারণ সম্পাদক মো. আবদুল হাশেম বলেন, গত ১৩ অক্টোবর কুমিল্লার একটি পূজামন্ডপে পবিত্র কোরআন অবমাননার অভিযোগ এনে মন্দির ও প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়। পরবর্তীতে এই ঘটনার সূত্র ধরে সারাদেশের বিভিন্ন জেলায় মন্দির, বাড়ি-ঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং হিন্দু ধর্মাবলম্বী অনেকের ওপর শারীরিক হামলা চালানো হয়। ফেসবুকে ধর্ম অবমাননা করা হয়েছে, এমন অভিযোগ তুলে রংপুরের পীরগঞ্জে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে দেওয়া, ভাঙচুর করা এবং লুটপাট চালানো হয়। দেশের কোথাও কোথাও হামলা ও পুলিশের সাথে সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন নিহতও হন। এ সকল ঘটনার প্রতিবাদ, সহিংসতা বন্ধ ও দোষীদের বিচারের দাবিতে রামুতে আমাদের এই মানববন্ধন।

সমাপনী বক্তব্যে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রামু উপজেলার সভাপতি মাষ্টার মোহাম্মদ আলম বলেন, আমরা ধর্ম ভীরু হবো, ধর্মান্ধ হবো না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আমরা এদেশে বসবাস করি। আমরা এদেশের নাগরিক। সংখ্যালঘু বলতে কিছুই নেই। আমরা ইসলামী ধর্মীয় চেতনা চর্চা করবো। এই চেতনায় অন্য ধর্মের মানুষের নিরাপত্তা দেয়ার কথা কঠোর ভাবে বলা আছে। সম্প্রতি হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলা করা হয়েছে। এ হামলা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আঘাত করা হয়েছে। অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে আঘাত করা হয়েছে। তিনি বলেন, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় রামুতে শত বছর ধরে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড পরিচালিত হয়ে আসছে। রামুর মানুষ বিশ্বাস করে ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক হামলা প্রতিরোধে প্রশাসনকে আরও কঠোর অবস্থান নিতে হবে। সম্প্রতি হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর যে হামলা করা হয়েছে, এ মানববন্ধন থেকে তার সুস্থ তদন্ত সহ দ্রুত বিচারের দাবি জানান তিনি।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রামু উপজেলার সাধারণ সম্পাদক মো. আবদুল হাশেমের সঞ্চালনায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বন্ধ ও দোষীদের বিচারের দাবিতে আয়োজিত মানববন্ধন সমাবেশে বক্তৃতা করেন, মুক্তিযোদ্ধা গোলাম কবীর, রামু কেন্দ্রীয় কালী মন্দিরের পুরোহিত সুবীর ব্রাহ্মণ চৌধুরী বাদল, রামু পাবলিক লাইব্রেরীর সাধারণ সম্পাদক মো. মুজিবুল হক, রামু বাঁকখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের নির্বাহী পরিচালক কিশোর বড়ুয়া, রামু খিজারী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শহীদুল্লাহ, রামু ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক সুবীর বড়ুয়া বুলু, শিক্ষক হোসনে আরা বেগম, রাজনীতিক শামীম আহসান ভুলু, সমাজকর্মী ননী গোপাল দে, ডা. দুলাল পাল, বাংলাদেশ বেতার সংগীত প্রযোজক বশিরুল ইসলাম, সংগীত শিল্পী মানসী বড়ুয়া, সংস্কৃতি কর্মী পুলক বড়ুয়া, ‘বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খৃষ্টান ঐক্য পরিষদ’ রামু উপজেলার আহ্বায়ক রতন মল্লিক, সদস্য সচিব অধ্যাপক নীলোৎপল বড়ুয়া, রামু প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি খালেদ শহীদ, রামু রিপোর্টাস ইউনিটির সাবেক সভাপতি সোয়েব সাঈদ, সাংবাদিক আল মাহমুদ ভূট্টো প্রমুখ।

সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বন্ধ ও দোষীদের বিচারের দাবিতে রামুতে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এ মানববন্ধন ও সমাবেশে অংশ নেন।