রামুতে বৌদ্ধদের কল্প জাহাজ ভাসা উৎসবে সাইমুম সরওয়ার কমল এমপি: ধর্ম অবমাননাকারীকে কঠোর শাস্তি দেয়া হবে

নীতিশ বড়ুয়া, রামুঃ
রামুর হাজার বছরের সম্প্রীতির ঐতিহ্য ধরে রাখতে হবে। সম্প্রীতি বিশ্বাসে বাঁকখালী নদীতে কল্প জাহাজ ভাসা উৎসব মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। এই মিলনমেলা শুধু বৌদ্ধদের জন্য নয়, সব ধর্মের অংশগ্রহণে রামু বাঁকখালী নদীর তীরের এই সম্প্রীতির মিলনমেলায় অসা¤প্রদায়িক চেতনা চর্চা হচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে রামুর বৌদ্ধদের কল্প জাহাজ ভাসা উৎসবে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আলহাজ¦ সাইমুম সরওয়ার কমল এমপি এ কথা বলেন।

কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ¦ সাইমুম সরওয়ার কমল বলেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্যবাহী স্থান রামু। যুগে যুগে সম্প্রীতি রক্ষাকারীদেরই বিজয় হয়। আমাদের ঐতিহ্যের ধারাকে ধারণ করেই, এগিয়ে নিতে রামু কল্প জাহাজ ভাসা উৎসব। কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পকে আরো সমৃদ্ধ করবে এ উৎসব। তিনি বলেন, রামুতে উৎসাহ-উদ্দীপনায় কেন্দ্রীয় প্রবারণা ও কল্প জাহাজ ভাসা উদযাপনই বলে দেয়, হাজার বছর ধরে এ অঞ্চলের সম্প্রীতির চর্চায় বেঁচে থাকবে রামু কল্প জাহাজ ভাসা উৎসব।

‘সম্প্রীতির জাহাজে ফানুসের আলোয়, দূর হোক সাম্প্রদায়িক অন্ধকার’ এ শ্লোগানে অনুষ্ঠিত কল্প জাহাজ ভাসা উৎসবে প্রধান অতিথি সাইমুম সরওয়ার কমল এমপি বলেন, জাহাজ ভাসা উৎসব শুধু বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাই। এই উৎসব সকল ধর্মের মানুষের উৎসব, বাঙ্গালীর উৎসব। ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। ধর্ম অবমাননাকারীকে কঠোর শাস্তি দেয়া হবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার (২১ অক্টোবর) বিকালে রামুর বাঁকখালী নদীতে অনুষ্ঠিত কল্প জাহাজ ভাসা উৎসবে বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন, কক্সবাজার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রফিকুল ইসলাম, জেলা আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক মুসরাত জাহান মুন্নী, ফতেখাঁরকুল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ফরিদুল আলম, রাজারকুল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মুফিজুর রহমান, রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারের সাধারণ সম্পাদক রাজু বড়ুয়া, জেলা যুবলীগের সাবেক শ্রম ও কর্মসংস্থান বিষয়ক সহ-সম্পাদক পলক বড়ুয়া আপ্পু, রামু উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নুরুল হক চৌধুরী, রামু উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক নীতিশ বড়ুয়া, বাংলাদেশ ওয়ার্ল্ড বুড্ডিস্ট এসোসিয়েশন কক্সবাজার জেলার সাধারণ সম্পাদক রজত বড়ুয়া রিকু, রাজারকুল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি সরওয়ার কামাল সোহেল, সাবেক চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম ভূট্টো, সাংবাদিক অর্পন বড়ুয়া, রামু কেন্দ্রীয় প্রবারণা পুর্ণিমা ও জাহাজ ভাসা উৎসব উদযাপন পরিষদের সভাপতি স্বপন বড়ুয়া, সাবেক ছাত্র নেতা রতন বড়ুয়া প্রমুখ।

রামু কেন্দ্রীয় প্রবারণা ও কল্প জাহাজ ভাসা উদযাপন পরিষদের সভাপতি ডালিম বড়ুয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কল্প জাহাজ ভাসা উৎসব মঞ্চে বিশেষ অতিথির আসন অলংকৃত করেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) পংকজ বড়ুয়া, কক্সবাজার সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জাহেদ সরওয়ার সোহেল, রামু থানার ওসি (তদন্ত) অরূপ কুমার চৌধুরী, রামু প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি খালেদ শহীদ, উপজেলা স্বেচ্ছা সেবক লীগ সাধারণ সম্পাদক তপন মল্লীক, যুগ্ম-সম্পাদক আবু বক্কর ছিদ্দিক, জেলা তাঁতী লীগের সহ-সভাপতি আনছারুল হক ভূট্টো, স্বেচ্ছা সেবক লীগ নেতা আরিফ খাঁন জয়, বঙ্গবন্ধু ছাত্র পরিষদ রামু উপজেলার সভাপতি একরামুল হাসান ইয়াসিন প্রমুখ। কল্প জাহাজ ভাসা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক দীপ্ত বড়ুয়ার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন, কল্প জাহাজ ভাসা উৎসবের প্রধান সমন্বয়ক জ্যোতির্ম্ময় বড়ুয়া রিগ্যান।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিশ্বাসে রামু কেন্দ্রীয় প্রবারণা ও কল্প জাহাজ ভাসা উৎসব উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় রামু বাঁকখালী নদীতে কল্প জাহাজ ভাসা উৎসব। জেলা-উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের হাজারো বৌদ্ধ নরনারী ছাড়াও বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর উপস্থিতিতে এটি অসা¤প্রদায়িক চেতনার উৎসবে পরিণত হয়। কল্প জাহাজ ভাসানো উৎসবের মূল আনন্দায়োজনে রামুর বিভিন্ন বৌদ্ধ গ্রামের ৫টি কল্প-জাহাজ অংশ নেয়। সন্ধ্যায় নদীতে প্রদীপ ভাসানো ও আকাশে ফানুস উড়ানোর মাধ্যমে পুণ্যার্পন করা হয়।

বৌদ্ধরা জানান, সম্প্রীতির স্বারক হিসেবে প্রচলিত রামু উপজেলার জাহাজ ভাসা উৎসব, দুইশত বছর পূর্বে মিয়ানমারে প্রচলিত জাহাজ ভাসা উৎসবের আদলে রামুর রাখাইনরা বাঁকখালী নদীতে আয়োজন শুরু করে। এরপর থেকে রামুতে বৌদ্ধরা প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে বাঁকখালী নদীতে জাহাজ ভাসা উৎসবের আয়োজন করে আসছে। তারই ধারাবাহিকতায় গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এ উৎসবকে ঘিরে রামুর বাঁকখালী নদীর দু’পাড়ে নেমেছিল হাজার হাজার নর-নারীর অসাম্প্রদায়িক সম্মিলন। তাঁরা নানা বাদ্য বাজিয়ে সেখানে নাচছে। গাইছে বুদ্ধ কীর্তন ‘বুদ্ধং শরণং গচ্ছামী, ধম্মং শরণং গচ্ছামী, সংঘং শরণং গচ্ছামী’। ‘বুদ্ধ, ধর্ম সংঘের নাম সবাই বলো রে’ বুদ্ধের মতো এমন দয়াল আর নাইরে’। জাহাজ ভাসা উৎসবে সকল স¤প্রদায়ের মানুষের উপস্থিতিকে আস্তার সংকট উত্তরণের পথ হিসেবে দেখছেন বৌদ্ধ নেতৃবৃন্দরা।

বৃহস্পতিবার বিকালে রামু উপজেলার ফকিরা বাজারের পূর্ব পাশে বাঁকখালী নদীতে সাত-আটটি নৌকার উপর বসানো হয়েছে এক একটি কল্প-জাহাজ। বাঁশ, কাঠ, বেত, রঙ্গিন কাগজ দিয়ে রেঙ্গুনী কারুকাজে তৈরী দৃষ্টি নন্দন বৌদ্ধধর্মীয় ঐহিত্যময় প্রতিকৃতি ফুটিয়ে তোলা এসব জাহাজ খুব সহজেই দৃষ্টি কাড়ে মানুষের। প্রতিটি জাহাজেই ছিলো একাধিক মাইক। ক্যাসেট প্লেয়ার, ঢোল, কাঁসর, মন্দিরাসহ নানা বাদ্যের তালে তালে শিশু কিশোর ও যুবকরা নেচে গেয়ে মেতেছে অন্যরকম বাঁধভাঙা আনন্দে। জাহাজ নিয়ে ভাসতে ভাসতে এপার থেকে ওপারে যেতে যেতে মাইকে চলে বৌদ্ধ কীর্তন, নাচ, গানসহ নানা আনন্দায়োজন। শুধু বৌদ্ধ ধর্মালম্বীরা নয়, এ আনন্দে মেতে উঠেছে অন্যান্য স¤প্রদায়ের লোকজনও। প্রায় শতবছর ধরে, রামুর বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে প্রতি বছর জাহাজ ভাসা উৎসবের আয়োজন করে আসছে।