হিজরি সন মুসলিম ঐক্য ও স্বতন্ত্রের প্রতিক

আবদুল মালেকঃ
আহলান সাহলান শুভ হিজরি নববর্ষ। সময়ের বিবর্তনে আমাদের মাঝে থেকে আরো একটি হিজরি সন ১৪৪২ বিদায় নিয়েছে। নতুন হিজরি ১৪৪৩ সন আগমন করছে। আহলান সাহলান শুভ হিজরি নববর্ষ ১৪৪৩। মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের ও নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয়ে পরিচিতির ক্ষেত্রে হিজরি সন খুবই তাৎপর্য বহন করে।

মুসলমানদের ইবাদাত বন্দেগী চন্দ্র তারিখের উপর নির্ভরশীল। ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভের দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ যেমন- রোজা ও হজ পালন করতে হয় হিজরি তারিখ তথা চাঁদের হিসেবের উপর। তাছাড়াও দুই ঈদ, মিলাদুন্নবী সাল্লাললাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম, লাইলাতুল কদর, লাইলাতুল বরাত বা নিছফ মিন শাবান, লাইলাতুল মিরাজ, আশুরাসহ ইসলামের বিভিন্ন বিধি-বিধান হিজরি সনের উপর নির্ভরশীল। তাই ইসলামে এ দিনটি সমগ্র মুসলিম জাতির জন্য এক বিশেষ স্মারক।

চাঁদের হিসেবে সমস্ত ইবাদত বন্দেগির প্রচলন হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম এর সময় থেকে প্রচলিত ছিল। কিন্তু হিজরি বর্ষ বা সন গণনার প্রবর্তন হয় ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ফারুক (রাঃ) এর খেলাফতের চতুর্থ বছর (৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে। তখন তিনি অর্ধ পৃথিবীর শাসনকর্তা ছিলেন। রাষ্ট্রীয় কাজে চিঠি-পত্র ও বিভিন্ন দলিলাদি আদান-প্রদানে সনের উল্লেখ না থাকায় সমস্যা দেখা দিলে তৎকালীন ইরাক ও কুফার গভর্নর হযরত আবু মুছা আশআরি (রাঃ) অর্ধ পৃথিবীর শাসনকর্তা হযরত উমর ফারুক (রাঃ) এর খেদমতে বিষয়টি নিবেদন করেন। তিনি হযরত উসমান জিন্নুরাইন (রাঃ) ও হযরত আলী (রাঃ) সহ বিশিষ্ট সাহাবি বর্গদের নিয়ে পরামর্শ সাপেক্ষে হিজরি সন প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন এবং প্রিয় নবী সাল্লাললাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম ও তাঁর প্রিয় সাহাবায়ে কেরামগণের হিজরতের মাস মহররমকে হিজরি সনের প্রথম মাস নির্ধারণ করে হিজরি সন গণনা শুরু করেন। এই মহররম একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ মাস। এই মাসকে ‘শাহরুল্লাহ’ বা আল্লাহর মাস হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। পবিত্র কোরানে যে চারটি বিশেষ মাসের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো মর্হরম মাস। (সূরা তওবাহ-৩৬ নং আয়াত দ্রষ্টব্য)। মুসলিম ইতিহাসের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ও ঘটনাবহুল মাস হলো এই মর্হরম মাস। অথচ মুসলিম জাতি আজ এই মাসের শিক্ষা থেকে অনেক দূরে। এমনকি হিজরি সনের কথা আমরা খেয়ালও রাখি না বা রাখার প্রয়োজন অনুভব করি না। বিশ্বের অন্যান্য দেশের কথা বাদ দিয়ে যদি বাংলাদেশের কথা বলি তাহলে দেখা যায় এই বিশেষ দিনটিকে ঘিরে দেশে তেমন কোনো কর্মসূচি থাকে না। দেশের দৈনিক পত্রিকাগুলো বিশেষ সম্পাদকীয় প্রকাশ করে না। অনলাইন মিডিয়া কিংবা ইলেকট্রনিক্স মিডিয়াগুলোতেও এ-সংক্রান্ত কোনো উদ্যোগ থাকে না। অথচ এই বাংলাদেশে তথা ভারতীয় উপমহাদেশে ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে সর্বক্ষেত্রে হিজরি সনের প্রচলন শুরু হয় যা প্রায় ৫৫০ বছর পর্যন্ত রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত ছিল। পরে ১৭৯০ সাল হতে এ উপমহাদেশে খ্রিষ্টীয় সালের প্রচলন হয় যা আমরা এখনো অন্ধের মতো পালন করছি। আমরা আমাদের অতীত ঐতিহ্যের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে ইসলামের সংস্কৃতি ও গৌরবগাথাকে দূরে ঠেলে বিজাতীয় সংস্কৃতিকে লালন করছি যুগের পর যুগ। খ্রিষ্টীয় সালকে নিজেদের সংস্কৃতির অনুসঙ্গ বানিয়ে ’থার্টিফার্স্ট নাইট’ নামক এক বেলাল্লাপনার আসর জমে যায় বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীজুড়ে। অমুসলিম দেশগুলোতে তারা তাদের নিজস্ব ধাঁচে বা ঢংয়ে যেকোনো উৎসব পালন করুক কিন্তু মুসলমান হয়ে কীভাবে আমরা তা অন্ধ অনুকরণ করে যুগ-যুগান্তর লালন করি! একদিকে খ্রিষ্টীয় নববর্ষ আবার অন্যদিকে বাংলা নববর্ষের নামেও আমাদের দেশে ১ বৈশাখে আল্পনা আঁকা, নগ্নপদে নৃত্যোল্লাস, বিভিন্ন জীবজন্তুর মুখোশ পরাসহ বিজাতীয় সংস্কৃতির এক মহড়া হয়ে যায় যা মোটেও মুসলিম সংস্কৃতি কিংবা বাঙালি সংস্কৃতির অংশ নয়। বাংলাদেশে প্রচলিত তিনটি সনের মধ্যে হিজরি সনই হচ্ছে সর্ব প্রাচীন সন অথচ তা পালনে আমাদের কোনো আয়োজন নেই। আমাদের চেতনায় হিজরি সনের গুরুত্বের লেশমাত্র নেই, এটি বড় দুঃখজনক। বাংলা সনকে বাংলাদেশের মুসলমানরা বিজাতীয় সংস্কৃতির রূপে এবং ঢংয়ে পালন করেন কেননা আমরা অনেকেই জানি না বাংলা সনের ইতিহাস। বাংলা সনের উৎপত্তির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে এটি উৎপত্তিগত দিক থেকে ইসলামের উত্তরাধিকারপ্রাপ্ত। বাদশা আকবরের আমলে মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানী আমীর ফতেহুল্লাহ সিরাজী হিজরি সনকে গবেষণা করে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। সেদিক থেকে বিবেচনা করলেও বাংলা সন উদযাপনে বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুকরণ করার কোনো সুযোগ নেই। অথচ আমরা সকলে আমাদের দ্বীনি ও দেশীয় সংস্কৃতি ভুলে বিজাতীয় সংস্কৃতির উদ্দামতায় গা ভাসিয়ে দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছি। অপরদিকে যারা মুসলমানদের এই সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে লালন করে দেশে সুস্থ ধারার সংস্কৃতি চালু করতঃ বিজাতীয় সংস্কৃতির নগ্ন থাবা থেকে দেশ ও জাতিকে বাঁচানোর প্রচেষ্টা চালায় তাদের কথা আমাদের প্রিন্ট মিডিয়া বলেন আর ইলেকট্রনিক মিডিয়া বলেন কেউ প্রচার করে না অথচ ‘থার্টিফার্স্ট নাইট’ এবং ‘বাংলা নববর্ষ’ উদযাপনে মিডিয়াগুলো থাকে ব্যতিব্যস্ত।

ইসলাম সর্বক্ষেত্রে মুসলিম উম্মাহকে সর্বোচ্চ আদর্শ, সভ্যতা এবং সংস্কৃতি শিক্ষা দিয়েছে। নববর্ষ কিভাবে উদযাপন করবে তার সর্বোত্তম শিক্ষাও ইসলাম দিয়েছে। নতুন বছর বা নতুন মাস শুরু করার ইসলামী নীতি এবং সুন্নত পদ্ধতি হলো। নতুন মাসের চাঁদ দেখার বিশেষ গুরুত্ব দেয়া। এটা বিশ্ব নবী (সা.) এর সুন্নাত। আর যখন চাঁদ দেখবে তখন নতুন চাঁদ দেখার দোয়া পড়বে। এই সুন্নত পদ্ধতিতে বরকত এবং সাওয়াব রয়েছে। আর সমস্ত কুসংস্কার এবং অশ্লীলতা থেকে বেঁচে থাকার নসিহা রয়েছে। দোয়া টি হলো ‘আল্লাহুম্মা আহিল্লাহু আলাইনা বিল-য়ুমনি ওয়াল ঈমানি, ওয়াসসালামাতি ওয়াল ইসলামি- রাব্বি ওয়া রাব্বুকাল্লাহ। (জামে তিরমিজি, হাদিস : ৩৪৫১) ।’

আসুন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাললাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামের হিজরতের প্রেক্ষাপটকে স্মরণার্থে হিজরি নববর্ষ পালন করে আগামী প্রজন্মের কাছে ইসলামের ইতিহাস তথা সংস্কৃতিকে তুলে ধরি। মহান আল্লাহর দ্বীনের প্রচারে প্রিয় নবী সাল্লাললাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর প্রিয় সহচরবৃন্দ কীভাবে মাতৃভূমির মায়া ত্যাগ করে তৎকালীন ইয়াসরীবে (বর্তমান মদিনা শরিফ) হিজরত করেন তার মহান শিক্ষা ও তাৎপর্য নিহিত রয়েছে এই হিজরি নববর্ষ পালনের মধ্যে। হিজরি সন আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় প্রিয় নবী সাল্লাললাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামের সেই সাহাবি সুহায়ব (রাঃ) এর ত্যাগের কথা- যিনি কাফেরদের হাতে বন্দি হয়ে অনেক নির্যাতন সহ্য করার পর নিজের সর্বস্ব কাফেরদেরকে দিয়ে আপন মাতৃভূমির মায়াকে তুচ্ছ করে প্রিয়নবীর নির্দেশকে শিরোধার্য করে মদিনায় হিজরত করেন। মনে করিয়ে দেয় উম্মে সালমা ও তাঁর স্বামীর কথা- যার সন্তান কাফিররা ছিনিয়ে নেয়ার পরও তাঁর স্বামী একাকী মদিনায় হিজরত করেন। ইসলামের তরে জাগতিক সকল মায়াকে তুচ্ছ করার এক প্রকৃষ্ট ও জ্বলন্ত উদাহরণ এই হিজরি নববর্ষ। তাই সময় এসেছে সম্মিলিতভাবে হিজরি নববর্ষ পালন করে বিজাতীয় সংস্কৃতির আগ্রাসন থেকে দেশ ও জাতিকে মুক্ত করা এবং ইসলামি সংস্কৃতির বলয়ে নিজেদেরকে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। বিদায় হোক পুরাতন বছরের জীর্ণতা, অপূর্ণতা আর অসঙ্গতি। নতুন প্রত্যাশার ভেলায় চড়ে আসুক নতুন বছর, জেগে উঠুক সবাই নতুন উদ্দীপনায়। সত্য আর সুন্দরে ভাস্বর হয়ে উঠুক মানবতার ক্যানভাস।

এই প্রত্যাশায় সকলের প্রতি হিজরি নববর্ষের অকৃত্রিম শুভেচ্ছা।

লেখকঃ মহাসচিব, হিজরি নববর্ষ উদযাপন পরিষদ রামু,কক্সবাজার।