রামুর দূর্গম ‘ডাকভাঙ্গা গ্রামে’ করোনা সচেতনতায় ‘লিটল ডক্টর’

খালেদ শহীদ, রামুঃ
রামু উপজেলার দূর্গম ‘ডাকভাঙ্গা গ্রামে’ মহামারী করোনা সচেতনতায় এগিয়ে এসেছে দশজন ‘লিটল ডক্টর’। তারা ‘ডাকভাঙ্গা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের’ চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। যোগাযোগ সুবিধা বঞ্চিত দূর্গম জনপদ কক্সবাজারের রামু উপজেলার কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের ‘ডাকভাঙ্গা গ্রাম’। এ গ্রামে নেই সরকারি প্রতিষ্ঠান, নেই কোন পাকা সড়ক ও বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা। অবহেলিত ডাকভাঙ্গা গ্রামে মহামারী করোনা ভাইরাস ও ম্যালেরিয়া থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করার জন্যে, বাড়ি বাড়ি উঠোন বৈঠক করে যাচ্ছে ওই ‘লিটল ডক্টর’রা। মাসে দুইবার এই উঠোক বৈঠকের মাধ্যমে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে, লিটল ডক্টররা।

ওই গ্রামের বাতিঘর ‘ডাকভাঙ্গা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। সরকারি হাসপাতালের এমবিবিএস চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে, প্রতিবছর বিদ্যালয়ের চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষিত করে ‘লিটল ডক্টর’ দল গঠন করা হয়। ১৫ বছর ধরে গ্রামের বাসিন্দাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা বিষয়ক সচেতনতামূলক প্রচারনা কার্যক্রম চালিয়ে আসছে ওই ‘লিটল ডক্টর’রা। প্রতিবছর বিদ্যালয়ের চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির দশ জন শিক্ষার্থী নিয়ে গঠন করা হয় লিটল ডক্টর টিম। দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও চলমান করোনা পরিস্থিতিতে লিটল ডক্টর দলটি, বৃহস্পতিবার (১৫ জুলাই) দুপুরে ডাকভাঙ্গা গ্রামের পাড়ায়-পাড়ায় উঠোন বৈঠক করে করোনা ভাইরাস সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করে এবং করোনা থেকে বাঁচতে দিকনির্দেশনা দিয়ে, গ্রামবাসীদের মাঝে মাক্স বিতরণ করে।

বৃহস্পতিবার সরেজমিন দেখা গেছে, ডাকভাঙ্গা গ্রামের একটি উঠানে বিছানো ত্রিপলে বসে আছেন পাড়ার নারীরা। সামনে দাঁড়িয়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা সহ করোনা ভাইরাস সম্পর্কে সচেতনতামূলক বক্তব্য উপস্থাপন করে, ডাকভাঙ্গা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লিটল ডক্টর নিশরাত জাহান তামান্না, নুশরাত ফারজানা মিম, আরকান হোসেন, সাজ্জাদুল করিম, সাইফুল হক, সাহামনি আক্তার, রিফা আকতার, জন্নাতুল ফেরদৌস ও মিফতাহুল জান্নাত মিম। এ সময় তারা উপস্থিত গ্রামবাসীকে বিনামূল্যে মাস্ক ও স্যানিটাইজার বিতরণ করে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, ডাকভাঙ্গা বাংলাদেশ এর প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর মো. জুয়েল তালুকদার, সাংবাদিক সোয়েব সাঈদ, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সলিম উল্লাহ, এসএমসি সদস্য সেলিনা আক্তার, সহকারি শিক্ষক মো. আলমগীর আলম, মার্জিয়া বেগম, সালেহা আক্তার এবং মৈষকুম ওসমান সরওয়ার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক মো. আবদুল হামিদ প্রমূখ।

রামু উপজেলার কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের সুবিধা বঞ্চিত দূর্গম ডাকভাঙ্গা গ্রামে ‘ডাকভাঙ্গা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ এবং কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের মৈইশকুম গ্রামে ‘মৈষকুম ওসমান সরওয়ার প্রাথমিক বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করে, আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘ডাকভাঙ্গা বাংলাদেশ’। এর ফলে ওই দুই গ্রামের শিশুরা মানসম্মত শিক্ষা অর্জনের সুযোগ পায়।
ডাকভাঙ্গা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সলিম উল্লাহ জানান, গ্রামবাসীকে রোগ-ব্যাধি সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের লিটল ডক্টররা। চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির দশজন শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠন করা হয় লিটল ডক্টর দলটি।

ডাকভাঙ্গা বাংলাদেশ এর প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর মো. জুয়েল তালুকদার জানান, ডাকভাঙ্গা এলাকায় প্রশিক্ষিত দক্ষ লিটল ডক্টরস টিম দ্বারা প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা বিষয়ক সচেতনতামলূক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, বিগত ১৫ বছর ধরে। ডাকভাঙ্গা ও মৈশকুম গ্রামের দুইটি গ্রামে প্রতিষ্ঠিত দুই বিদ্যালয়েই এই কার্যক্রম চালানো হয়ে। দুইজন শিক্ষক লিটল ডক্টর দলের সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তিনি বলেন, কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে তৃনমূল পর্যায়ে মাস্ক বিতরন, স্বাস্থ্য-শিক্ষা, স্যানিটেশন, আর্সেনিক ও ম্যালেরিয়া সহ বিভিন্ন বিষয়ের উপর সচেতনতামূলক কার্যক্রম চলমান রয়েছে। প্রতিবছর নিকটতম হাসপাতাল নাইক্ষ্যংছড়ি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার দ্বারা প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করা হয়। শিক্ষার্থীরা লিটল ডক্টর হিসেবে প্রশিক্ষিত হয়ে নিজ গ্রামে বিভিন্ন রোগের প্রাথমিক চিকিৎসা ও বিভিন্ন মহামারী সম্পর্কে সচেতন করেন।

শিক্ষার্থীদের মা বুলবুল আক্তার, খালেদা বেগম ও ছেনুআর বেগম জানান, তারা করোনা ভাইরাস সম্পর্কে তেমন কিছু জানতেন না। এখন লিটল ডক্টররা উঠান বৈঠক করে, তাদেরকে ভাইরাসের বিস্তার সম্পর্কে সচেতন করেছে। করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচার জন্য দিকনির্দেশনা দিয়েছে। আমাদের গ্রামটি দূর্গম এলাকা হওয়ায়, অনেক রোগের চিকিৎসা সম্পর্কে আমাদের জানা ছিলোনা। এখন আমাদের গ্রামের স্কুলের ছেলেমেয়েরা বিভিন্ন রোগ সম্পর্কে আমাদের জানাচ্ছে।

মো. জুয়েল তালুকদার আরো জানান, মৈষকুম ওসমান সরওয়ার প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ডাকভাঙ্গা বেসরকারি প্রাথমি বিদ্যালয়ে ৫০০ জন ছাত্র-ছাত্রী পড়ালেখা করছে। শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম চলমান রাখা ও তাদের খাদ্য, চিকিৎসা ও বস্ত্র নিশ্চিত করে জীবনমান উন্নয়নে এতিম ও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ২০ জনকে শিক্ষা সহায়তা বাবদ ১০০ টাকা করে প্রতি মাসে প্রদান করা হবে। এ টাকা প্রতি মাসের ১ তারিখে তাদের নিজস্ব নগদ/বিকাশ নম্বরে পাঠানো হবে। পরবর্তীতে ফান্ড পাওয়ার সাপেক্ষে তাদের সুযোগ-সুবিধা পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি করা হবে। এছাড়া আসন্ন পবিত্র ঈদুল আযহায় এতিম, প্রতিবন্ধী ও হতদরিদ্র শিক্ষার্থীদের পরিবারকে মাংস বিতরণ করা হবে।

কচ্ছপিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু ইসমাইল মো. নোমান জানান, লিটল ডক্টরদের মাধ্যমে দূর্গম এ এলাকার লোকজনকে করোনা, ম্যালেরিয়া সহ বিভিন্ন মহামারী রোগ-ব্যাধি সম্পর্কে সচেতন করার এ উদ্যোগে প্রশংসনীয়। এর মাধ্যমে এলাকাবাসী নিজেদের সুরক্ষার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ লাভে আরো এগিয়ে যাবে।