ক্লান্তিতে ঘুম না আসার কারণ

লাইফস্টাইল ডেস্কঃ
সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগা আর ঘুম ঘুম ভাব- এক বিষয় নয়। ক্লান্ত থাকলে ঘুম আসবেই। আর ঘুম থেকে উঠে শরীর হবে ঝরঝরে। তবে অবসাদগ্রস্ত থাকলে ঘুমও আসবে না।

তাই দিনের বেশিরভাগ সময় যদি ক্লান্ত লাগে তবে সেটার কারণ খুঁজে বের করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

ঘুম ঘুম ভাব আর অবসাদ এক নয়

যুক্তরাষ্ট্রের মনোরোগ ও ঘুম বিশেষজ্ঞ ডা. অ্যালেক্স দিমিত্রিউ বলেন, “অবসাদ ভাব আর ঘুম ঘুম ভাব এক নয়। যারা বলেন, ঘুম পায় তারা আসলে দিনের কোনো একটা সময়ে ঘুমিয়ে নিতে পারে, বা ‘ন্যাপ’ নিয়ে আবার চাঙা বোধ করে। তবে অবসাদ বা বেশিরভাগ সময় ক্লান্ত অনুভূত হলে ঘুম হবে না।”

‘মেনলো পার্ক সাইকিয়েট্রি অ্যান্ড স্লিপ মেডিসিন’য়ের এই প্রতিষ্ঠাতা চিকিৎসক রিয়েলসিম্পল ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও বলেন, “ঘুমের মান ও সময়ের ওপরেও নির্ভর করে ঘুম ঘুমভাবের কারণ। তবে যারা অবসাদগ্রস্ত তারা দুর্বল বোধ করবেন বেশি, কাজে প্রেরণা পাবেন না। এমনকি চাইলেও সহজে ঘুমাতে পারবেন না।”

তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, “রাতে বাজে ঘুম হওয়া কিংবা সারা সপ্তাহ কাজের চাপে থাকা কোনো বিষয় নয়। যদি বেশিরভাগ সময় ক্লান্ত অনুভূত হয় তবে আপনি অবসাদে ভুগছেন।”

আর এর কারণ বের করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করাও জরুরি।

অবসাদগ্রস্ত হওয়ার কারণ

একটি দুটি নয়, অবসাদে ভোগার শারীরিক ও মানসিক বহু কারণ থাকতে পারে।

কলোরাডো’র ‘ইউসি হেল্থ’য়ের ‘স্লিপ সেন্টার’য়ের পরিচালক ডা. ক্যাথেরিন গ্রিনের ভাষায়, “বিভিন্ন কারণে অবসাদ লাগতে পারে। আর কারণ ভেদে এর চিকিৎসাও ভিন্ন।”

শারীরিক কারণ

* রক্ত শূন্যতা- খাদ্যাভ্যাস অর্থাৎ খাদ্য তালিকায় লৌহজাতীয় খাবার না থাকা, অথবা রক্ত হারানো সেটা ঋতুস্রাব কিংবা দেহের অভ্যন্তরে কোনো প্রকার আলসার থেকেও হতে পারে।

* হজমের সমস্যা থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি দেহে শোষিত না হওয়া, ‘ইনফ্লামাটরি বাওয়েল ডিজিজ’।

* থাইরয়েড, ডায়াবেটিস, কর্টিসল হরমোনের অতিরিক্ত নিঃসরণ ইত্যাদি অন্তঃস্রাবী সমস্যা।

* রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, লুপাস (রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যখন দেহের সুস্থ কোষকেই শত্রু ভেবে আক্রমণ করে।)

* গর্ভাবস্থা

* ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। যেমন- ডিপ্রেশন কমানোর ওষুধ, পেশি শিথিলের ওষুধ, উচ্চ রক্তচাপের জন্য খাওয়া ট্যাবলেট ইত্যাদি।

* হৃদরোগ, ফুসফুসের সমস্যা (যেমন ফুসফুস থেকে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সারা শরীরে ঠিক মতো সরবরাহ না হওয়া)।

* বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণ যেমন- দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস, কোভিড-১৯, ফ্লু ও অন্যান্য ভাইরাস জনিত রোগ।

* স্থূলতা ও দীর্ঘস্থায়ী কোনো প্রদাহ।

মানসিক কারণ

মানসিক অবস্থার কারণেও মানুষ ক্লান্ত বোধ করতে পারে। এক্ষেত্রে আবার পার্থক্যও রয়েছে।

ডা. দিমিত্রিউ বলেন, “বিষণ্ন আর নিদ্রালু মানুষ একই রকম। তারা ঘুমাতে পারে। অন্যদিকে উদ্বিগ্নতায় ভোগা মানুষ ঘুমাতে পারে না, বেশি মাত্রায় জেগে থাকে।”

“বিষণ্নতার সঙ্গে অবসাদগ্রস্ত হলে কাজ করার উদ্যোম হারায়। অন্যদিকে ক্লান্ত মানুষের অন্তত কাজের প্রতি অনিহা জাগে না। শুধু বিষণ্নতা কারণে প্রাথমিকভাবে কোনো কিছুর প্রতি আগ্রহ হারায় না মানুষ।”

তিনি আরও বলেন, “যদি কোনো কারণে আত্মহত্যার ইচ্ছে জাগে তবে অবশ্যই মনোবিজ্ঞানির পরামর্শ নিতে হবে।

অন্যদিকে যারা দুশ্চিন্তায় ভোগেন তারা অদ্ভূত ধরনের ক্লান্তি অনুভব করেন। অর্থাৎ কাজ করার আগ্রহ জাগে না, ক্লান্ত লাগে ঠিকই তবে ঠিক মতো ঘুমাতে পারে না বা গভীর ঘুম হয় না।” ব্যাখ্যা করেন ডা. দিমিত্রিউ।

সব অবসাদ আবার একরকম নয়। কাজের চাপ, দূর পাল্লার ভ্রমণ, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাস থেকেও অবসাদ কাজ করতে পারে। শান্ত পরিবেশ ঘুমের জন্য প্রয়োজনীয়। উচ্চ শব্দ, অতিরিক্ত আলো বা অস্বস্তিকর পরিবেশের কারণেও ঘুম কম হতে পারে, যেখান থেকে দেখা দেয় অবসাদ।

তাহলে সারাক্ষণ ক্লান্ত অনুভূত হলে যা করতে হবে

উপরের ব্যাখ্যাগুলো অনুসরণ করে যখন অবসাদের আসল কারণ নির্ণয় করা যাবে সেই হিসেবেই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। হতে পারে সেটা মানসিক বা শারীরিক। আর সেই হিসেবেই চিকিৎকের পরামর্শ নিতে হবে।

ডা. গ্রিনের ভাষায়, “থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে ভিটামিন/ হরমোনের অভাব বা রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেলে সেই হিসেবে চিকিৎসা গ্রহণ করা প্রয়োজন।”

একইভাবে বিষণ্নতা, খারাপ লাগা, উদ্বিগ্নতায় ভোগার সমস্যার জন্য প্রয়োজন হবে মনো-চিকিৎসকের আশ্রয় নেওয়া।

অবসাদের শেকড় হতে পারে মানসিক চাপ। আধুনিক সময়ে কাজের পরিবেশের কারণেও মানুষ চাপে থাকে। তাই ক্লান্ত লাগার আসল কারণটা খুঁজে বের করতে হবে।

ডা. গ্রিন বলেন, “অবসাদ, ক্লান্তি বা চাপ কিংবা শারীরিক সমস্যা – এসবের আসল কারণ বের করতে পারলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে যদি ভালো মতো ঘুমানো যায়, দিনে অন্তত সাত ঘণ্টা, তবে ক্লান্ত লাগার অনুভূতি কমে আসবে। উপযুক্ত চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করা তখনই সম্ভব হবে যখন ক্লান্ত লাগার আসল কারণ চিহ্ণিত করা যাবে।”

সূত্রঃ বিডিনিউজ