জন্মদিনঃ চিরপ্রেরণা চিরনির্ভর

সীমা মোসলেমঃ
আজ থেকে দু’দশক আগে সুফিয়া কামাল আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তবে মনে হয় আজও তিনি আমাদের পাশে আছেন ছায়া হয়ে নির্ভরতা ও আশ্রয় জোগাতে। এ উপলব্ধির কারণ তার জীবনভর সাধনা। বিংশ শতাব্দীর পুরোটা সময় কবি সুফিয়া কামাল (১৯১১-১৯৯৯) মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ব্রতী ছিলেন। সেখানে ছিল নারীর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, সাংস্কৃতিক চেতনা বিকাশের আন্দোলন। তিনি প্রথাগত রাজনীতি করেননি কিন্তু রাজনীতি সম্পর্কে তিনি ছিলেন সচেতন। তার সুস্পষ্ট রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তার সব কাজে প্রতিফলিত হতো। পাকিস্তান আমলে শাসকগোষ্ঠীর সব ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদী কণ্ঠ সবসময় সোচ্চার ছিল। বেগম রোকেয়ার আদর্শে অনুপ্রাণিত সুফিয়া কামাল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের অচলায়তন ভেঙে সমাজ বিকাশের কাজে আত্মনিবেদন করেন।

বিকশিত সামাজিক শক্তিই সমাজের মুক্তি ঘটাবে- এই আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন সুফিয়া কামাল। তাই দেখি, একদিকে তিনি শিশু-কিশোরদের সংগঠন কচিকাঁচার মেলার সঙ্গে যুক্ত, আবার অন্যদিকে সমাজের অধস্তন ও পশ্চাৎপদ নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নারী সমাজকে সচেতন ও সংগঠিত করার কাজে মহিলা পরিষদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের প্রতিবাদী কর্মসূচি থেকে শুরু করে ছায়ানট প্রতিষ্ঠা, রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ গঠন ইত্যাদি কাজে রয়েছে তার অগ্রণী ভূমিকা। সাহিত্যিক হিসেবে তার আত্মপ্রকাশ ঘটে ত্রিশের দশকে সওগাত পত্রিকায় লেখার মধ্য দিয়ে। পাকিস্তান আমলে মুক্তবুদ্ধি চর্চার লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন সাহিত্য সম্মেলনে তার ছিল অগ্রণী ভূমিকা। দেশ ভাগ-পরবর্তী পূর্ববাংলার জাতীয়, গণতান্ত্রিক আন্দোলন, বাঙালির জাতীয় বিকাশের সংগ্রামসহ সব সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিলেন সুফিয়া কামাল। তার ‘জননী সাহসিকা’ সুফিয়া কামাল হয়ে ওঠা এবং বাঙালি জাতির আত্মবিকাশের ধারা একই সূত্রে গাঁথা। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা, সব ক্ষেত্রেই তাকে আমরা সামনে পেয়েছি। বাংলাদেশের যে কোনো দুর্দিনে, সংকটে, দুঃসময়ে, সংঘাতে সমাজের নানা মত ও পথের মানুষ তাকে ঘিরে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। ভিন্ন ভিন্ন সংগঠনে যুক্ত ছিলেন বলে সংগঠনের কাজের ভিন্নতাও স্বাভাবিক, কিন্তু সুফিয়া কামালের ছিল সর্বজনীন সত্তা।

একবিংশ শতাব্দীর দ্বারপ্রান্তে ১৯৯৮ সালে সুফিয়া কামাল বলেছিলেন, ‘একুশ শতকের মানুষেরা যদি মানব ধর্ম পালন না করে, তাহলে একুশ শতকের কোনো মূল্য নেই। বাংলাদেশের জীবনে একুশ শতক আসছে। নারী ও শিশুর ওপরে আর কোনো নির্যাতন হবে না- তা এই জয়গান প্রতিষ্ঠা করবে, এটা আমার বিশ্বাস।’ কিন্তু এখনও আমরা সমাজের চার দিকে তাকালে প্রত্যক্ষ করি, কীভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। নারীর প্রতি পুরুষতান্ত্রিক অধস্তন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নারী, কন্যাশিশু সহিংসতার শিকার হচ্ছে জীবনের নানা ক্ষেত্রে। করোনা অতিমারিতে নারীর প্রতি সহিংসতার হার বৃদ্ধি পেয়েছে। এখনও নারী নির্যাতনের শিকার হলে নারীর দোষ খুঁজে বের করতে অনেকেই তৎপর হয়ে ওঠে। করোনা অতিমারি নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে ঝরে পড়ার হার বাড়িয়ে তুলছে। বাল্যবিয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি সমাজের অভ্যন্তরে চোরাবালির মতো ধস সৃষ্টি করছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মকেন্দ্র ধ্বংস করা, তাদের সম্পত্তি দখল ইত্যাদির মধ্য দিয়ে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ নস্যাৎ করার নানা অপচেষ্টা তৎপর রয়েছে।

সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সুপারিশ- নারী ইউএনও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গার্ড অব অনারে থাকতে পারবেন না, সেখানে বিকল্প ভাবা প্রয়োজন। এই সুপারিশ যখন খোদ মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় থেকে আসে, তখন বিস্মিত হতে হয়। সম্প্রতি আরেকটি সুপারিশ- নারীরা বিয়ে রেজিস্ট্রার হতে পারবেন না একই ভাবনার প্রকাশ ঘটায়। নারীর প্রতি অধস্তন দৃষ্টিভঙ্গি যা নারীর মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে এবং নারীকে মানুষ হিসেবে না দেখে অধস্তন দেখার দৃষ্টিভঙ্গি সমাজের অভ্যন্তরে যত কাজ করবে, নারী নির্যাতনের হার ততই বৃদ্ধি পাবে।

সুফিয়া কামাল যখন সমাজের আত্মশক্তি বিকাশের কাজ করেছেন, সে পথ ছিল অনেক কঠিন। আশপাশে সহযাত্রীর সংখ্যাও ছিল স্বল্প। কিন্তু কী দৃঢ়তা নিয়ে ব্যক্তিজীবনের সংকট মোকাবিলা করে, মানবমুক্তি তথা সমাজমুক্তির কাজ করে গেছেন, তা ভাবলে বিস্মিত হতে হয়। তার জীবনব্যাপী সাধনার পরতে পরতে যে সক্রিয়তা ও প্রজ্ঞা, ত্যাগ ও সাহস রয়েছে তা খুঁজে বের করে বিশ্নেষণের মধ্য দিয়ে এই সময়ের সংকট মোকাবিলায় পথ দেখাবে। তার কর্ম ও প্রেরণা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তর মানুষকে উজ্জীবিত করে থাকে, যা সমাজের শুভ ও কল্যাণ-চেতনা বহমান রাখে। তিনি আমাদের সঙ্গেই আছেন অশেষ প্রেরণা হয়ে।

সীমা মোসলেম, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক,বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ।

সূত্র: সমকাল