সংক্রমণের ৮০ ভাগই ‘ভারতীয় ধরন’

                                  আইইডিসিআরের গবেষণায় তথ্য
                           সীমান্ত এলাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুত

অনলাইন ডেস্কঃ
করোনাভাইরাসের ভারতীয় ধরনের সংক্রমণ সীমান্তবর্তী জেলার বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। দেশে সংক্রমণের ৮০ শতাংশই এখন ভারতীয় ধরন বলে সরকারের একটি গবেষণায় পাওয়া গেছে। এ ধরনটির গোষ্ঠী সংক্রমণের (কমিউনিটি ট্রান্সমিশন) প্রমাণও পাওয়া গেছে। পাশাপাশি অজানা একটি ধরনও (ভ্যারিয়েন্ট) শনাক্ত হয়েছে।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এবং ইনস্টিটিউট ফর ডেভেলপিং সায়েন্স অ্যান্ড হেলথ ইনিশিয়েটিভস (আইডিএস এইচআই) করোনভাইরাসের ৫০টি নমুনার জিনোম সিকোয়েন্স করে এ তথ্য পেয়েছে।

যৌথ এ গবেষণায় সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর বাইরে ঢাকা, খুলনা, বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ, পিরোজপুর ও গাইবান্ধায় ভারতীয় ধরন হিসেবে পরিচিত ডেলটা ভ্যারিয়েন্টে সংক্রমিত রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগীর বিদেশ ভ্রমণের ইতিহাস নেই। এ ঘটনায় করোনার সংক্রমণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ বাড়ল। গত ৮ মে ভারত থেকে আসা তিন বাংলাদেশির শরীরে করোনার ভারতীয় নতুন ধরন শনাক্তের খবর জানায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এরপর মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে ভারত সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে সংক্রমণ বাড়তে থাকে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে সংক্রমণ পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। গত ২৪ মে ওই জেলায় লকডাউন ঘোষণা করে স্থানীয় প্রশাসন।

দুই সপ্তাহ ধরে সীমান্তবর্তী সাতটি জেলায় সংক্রমণ পরিস্থিতি ক্রমেই নাজুক হতে থাকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৯ মে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব ও জনস্বাস্থ্যবিদদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি সীমান্তবর্তী সাত জেলা নওগাঁ, নাটোর, সাতক্ষীরা, যশোর, রাজশাহী, কুষ্টিয়া ও খুলনায় কঠোর লকডাউনের আওতায় আনার সুপারিশ করে। এর মধ্যে শুধু সাতক্ষীরা জেলায় আজ শনিবার থেকে লকডাউন কার্যকরের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

তবে সরকারি সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। তাদের অভিমত, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কমিটির সুপারিশ আমলে নিয়ে লকডাউন দিলে সংক্রমণ ওই জেলাগুলোর বাইরে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ কমে আসত। কিন্তু সেটি না করায় সংক্রমণ দেশের অন্যান্য জেলায়ও এখন ছড়িয়ে পড়ছে। এতে করে সংক্রমণ পরিস্থিতি ভারতের মতো নাজুক হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। সেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা স্বাস্থ্য বিভাগের নেই বলেও মনে করেন কেউ কেউ।

উদ্বেগ ছড়াচ্ছে ভারতীয় ধরন: আইইডিসিআর এবং আইডিএসএইচআইয়ের যৌথ গবেষণায় বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসের ৫০টি নমুনার জিনোম সিকোয়েন্সিং করে ৪০টিতে ভারতীয় ধরন শনাক্ত হয়েছে। এ হিসাবে ৮০ শতাংশ ভারতীয় ধরন বা ডেলটা ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হলো। আটটি অর্থাৎ ১৬ শতাংশ নমুনায় বিটা ভ্যারিয়েন্ট বা সাউথ আফ্রিকান ধরন শনাক্ত হয়েছে। একটি সার্কুলেটিং এবং একটি অজানা ধরন।

কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের বিষয়টি তুলে ধরে গবেষণায় বলা হয়, ভারতীয় ধরনের কমিউনিটি ট্রান্সমিশন শুরু হয়েছে। কারণ, ভারতীয় ধরন শনাক্ত হওয়া ১৪ জন কখনও ভারতে যাননি এবং বিদেশ থেকে আসা রোগীর সংস্পর্শে আসার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এ কারণে বলা যায়, ভারতীয় ধরনটির কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বিদ্যমান।

গবেষণায় আরও বলা হয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে সংগ্রহ করা ১৬টি নমুনার মধ্যে ১৫টি এবং গোপালগঞ্জ থেকে সাতটি নমুনার সবগুলোর মধ্যেই ভারতীয় ধরন শনাক্ত হয়েছে। খুলনা থেকে সংগ্রহ করা তিনটি নমুনার সবগুলো এবং ঢাকা থেকে সংগ্রহ করা চারটির মধ্যে দুটি ভারতীয় ধরন পাওয়া গেছে। এছাড়া গাইবান্ধা, বাগেরহাট, খুলনা, চুয়াডাঙ্গা, দিনাজপুর, ঝিনাইদহ ও পিরোজপুর থেকে সংগ্রহ করা নমুনায় ভারতীয় ধরন শনাক্ত হয়েছে।

আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর সমকালকে বলেন, করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধে সামাজিক দূরত্ব, যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ও মাস্ক ব্যবহারের ওপর শুরু থেকেই গুরুত্বারোপ করে আসছে স্বাস্থ্য বিভাগ। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা মানছে না। এ কারণে সংক্রমণ বাড়ছে। সুতরাং সবার প্রতি আহ্বান থাকবে স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনা মেনে চলুন, নিজেকে ও পরিবারের সদস্যদের সংক্রমণমুক্ত রাখুন।

রোগী বাড়ছে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয়: স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত দুই সপ্তাহ ধরে ভারতের সীমান্তে অবস্থিত কয়েকটি জেলায় সংক্রমণ বাড়ছে। গত দুই সপ্তাহের এই জেলাগুলোয় গত এক সপ্তাহে শনাক্তের হার ২৩ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছে। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সর্বোচ্চ আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জে। এ জেলায় শনাক্তের হার ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ। এরপর পর্যায়ক্রমে খুলনায় ২৯ দশমিক ৭৭ শতাংশ, রাজশাহীতে ২২ দশমিক ৭৪ শতাংশ, মৌলভীবাজারে ২০ শতাংশ, মেহেরপুরে ১৮ দশমিক ৮১ শতাংশ, দিনাজপুরে ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ, সাতক্ষীরায় ১৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ, সিলেটে ১৪ শতাংশ, যশোরে ১৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ এবং কক্সবাজারে ১২ দশমিক ৮৩ শতাংশ রোগী শনাক্ত হয়েছে। সারাদেশে এক সপ্তাহে শনাক্তের হার ৯ দশমিক ০৮ শতাংশ।

সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় রোগী বাড়তে থাকায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ওপর চাপ বেড়েছে। হাসপাতালে করোনা ডেডিকেটেড ২৩২টি শয্যার মধ্যে গতকাল শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত ২২৫টিতে রোগী ভর্তি ছিল। আইসিইউর ১৭টি শয্যার সব ক’টিতে রোগী ভর্তি রয়েছে।

পরামর্শ অগ্রাহ্যের মূল্য দিতে হবে, মত বিশেষজ্ঞদের: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, এক সপ্তাহ আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব ও জনস্বাস্থ্যবিদদের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটি সীমান্তের সাত জেলায় লকডাউনের সুপারিশ করেছিল। কিন্তু সরকার সেটি এখনও বাস্তবায়ন করেনি। এর মধ্যে সীমান্ত জেলার বাইরেও ভারতীয় ধরনে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। অর্থাৎ ভারতীয় ধরনটি সারাদেশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। কিন্তু লকডাউন নিয়ে কালক্ষেপণ না করলে হয়তো ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পেত না। কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভাইরাসটি দ্রুতগতিতে দেশের অন্যান্য জেলায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ সমকালকে বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালিত না হওয়ার মূল্য হয়তো সবাইকে দিতে হতে পারে। যেখানে দ্রুত লকডাউনের সুপারিশ করা হয়েছিল, সেখানে এক সপ্তাহ পরও তা কার্যকর হয়নি। অথচ সীমান্তের বাইরে অন্যান্য জেলায়ও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ মিলেছে। এখন এই সংক্রমণ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়বে- এটি নিশ্চিত করে বলা যায়। কিন্তু এক সপ্তাহ আগে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় লকডাউন কার্যকর করা গেলে পরিস্থিতি অন্যরকম হতে পারত। সরকারের প্রতি আহ্বান থাকবে, স্বাস্থ্য বিভাগ কর্তৃপক্ষের পরামর্শ আমলে নিন। অন্যথায় বিপদ বাড়বে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সমকালকে বলেন, সীমান্তবর্তী সাত জেলায় লকডাউনের কঠোর বিধিনিষেধ জারি করতে দেরি হলে সংকট বাড়বে, বিষয়টি গত সোমবারই মন্ত্রিসভার বৈঠকে বলেছি। স্বাস্থ্য বিভাগ লকডাউন কার্যকর করে না, সুপারিশ করে। এটি কার্যকর করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে তাদের কাছে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর সার্বিক চিত্র তুলে ধরে লকডাউনের সুপারিশ করা হয়েছিল। কারণ ওইসব জেলার ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ যেন সারাদেশে ছড়িয়ে না পড়ে। কিন্তু সরকারকে অনেক বিষয় চিন্তাভাবনা করে লকডাউনের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। জীবন-জীবিকার বিষয় আছে। সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে হয়তো সেটি করা সম্ভব হয়নি। এর পরও আমি মনে করি, ভাইরাসটির দ্রুত ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধ করতে সুপারিশ করা জেলাগুলোয় দ্রুত লকডাউন দেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হবে।

সূত্র: সমকাল