বুদ্ধ, সক্রেটিস ও মানবতাবাদ

চিররঞ্জন সরকারঃ
‘যে দর্শন মানুষের চিত্তে মনুষ্যত্ববোধের জাগরণ ঘটায়, মানবিকতাবোধের উন্মেষ করে, মানুষের মর্যাদার প্রতি আস্থাশীল হয়, মানুষের সুখ–শান্তি–কল্যাণ ও সর্বাঙ্গীন উন্নতি–অগ্রগতির জন্য নিবেদিত থাকে তা–ই মানবতাবাদী দর্শন।’ গৌতম বুদ্ধ এ মানবতাবাদী দর্শনকেই প্রতিষ্ঠিত করেছেন, এগিয়ে নিয়ে গেছেন। মানবতার মুক্তিই ছিল বুদ্ধের নিরন্তর সাধনা।

বুদ্ধ ছিলেন একজন মৌলিক চিন্তার প্রবর্তক। মানব জাতিকে তিনিই প্রথম জানান, দুঃখ আছে, দুঃখের কারণ আছে, দুঃখ নিবৃত্তি সম্ভব, তার উপায় আছে। ঈশ্বর আছেন কি নেই–সেটা নিয়ে তিনি মাথা ঘামাননি। তিনি বলেছেন,

মনে করো, বিষাক্ত তিরে বিদ্ধ হয়েছে এক জন। তুমি তাকে ওষুধ খাওয়াতে গেলে। সে বলল, না, তিরটা কোন দিক থেকে এল, কে মারল, সে মোটা না রোগা, ফরসা না কালো, আগে জানতে হবে। তারপর ওষুধ খাব। লোকটি সেক্ষেত্রে আর বাঁচবে না। তাই ঈশ্বর আছেন কি নেই, তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। দুঃখবিদ্ধ লোকটির যন্ত্রণার উপশমই আমার প্রতিপাদ্য।

নিজের ধর্মমত সম্পর্কে তিনি বলেছেন,

আমি তোমাদের একটা সেতু দিয়েছি। দুঃখের নদী পার হওয়ার জন্য। নদী পেরিয়ে গেলে সেতুটাকে আর মাথায় নিয়ে বইবার দরকার কী?

নিজের ধর্মমতকে তিনি নিছক সেতু মনে করেছেন। মহামতি বুদ্ধ মানুষের মর্যাদাকে গুরুত্ব দিয়েছেন, অলৌকিক শক্তির চেয়ে মানবিক শক্তির উপরই জোর দিয়েছেন বেশি। তিনি বলেছেন,

একজন মা যেমন তার সন্তানদের কল্যাণের জন্য যে কোনো বিপদ বা ঝুঁকিকে মাথা পেতে নেন, তেমনি আমাদেরও উচিত বিশ্বের সকল প্রাণীর জন্য আমাদের দয়া ও সহানুভূতি বিলিয়ে দেওয়া।

বুদ্ধের চিন্তার সঙ্গে গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের চিন্তার মিল আছে। জ্ঞানজগতের দুই মহান দিকপালই মানুষের জীবনের সমস্যাগুলোর প্রতি নজর দিয়েছেন, এগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন এবং সমাধানের পথও অনুসন্ধান করেছেন।

সক্রেটিসের চিন্তা ছিল মানুষকে আদর্শ নাগরিকে পরিণত করা যাদের দ্বারা একটি সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ, শান্তিময় সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে। বুদ্ধের চিন্তা ছিল মানুষকে পরিপূর্ণ মানুষে পরিণত করা। মানুষের কল্যাণ কামনার পাশাপাশি বুদ্ধ জগতের সকল প্রাণী বা প্রাণসত্তার শান্তি ও মঙ্গলের কথাও ভেবেছেন। আর এখানেই তিনি সক্রেটিসসহ পৃথিবীর অপরাপর সব মনীষীর চিন্তাকে ছাড়িয়ে গেছেন।

বুদ্ধের মতো সক্রেটিসও এ বিশ্বজগতের নিগূঢ় রহস্য নিয়ে আলোচনার চেয়ে জীবন ও সমাজের বাস্তব বিষয়াদি নিয়ে আলোচনায় বেশি আগ্রহী ছিলেন। যেমন, সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মানুষের আচরণ কেমন হওয়া উচিত? মানুষের মহত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব কিসে নিহিত? – এ জাতীয় জীবনধর্মী প্রশ্নের উত্তরানুসন্ধানই ছিল তার চিন্তার অগ্রাধিকার। তিনি বিশ্বাস করতেন, ন্যায় ও শুভ কী, তা না জেনে কেউ ন্যায়বান ও কল্যাণনিষ্ঠ হতে পারে না। তার মানে, জ্ঞান ও প্রজ্ঞাই মানুষের সদাচরণের ভিত্তি। সত্যিকারের জ্ঞানী ব্যক্তি কখনো অন্যায় করতেই পারেন না। আবেগ–উচ্ছ্বাস নয়, প্রজ্ঞাই ছিল সক্রেটিসের চিন্তা ও কর্মের চালিকাশক্তি। সক্রেটিস মনে–প্রাণে বিশ্বাস করতেন যে, নিজ আত্মার যত্ন নেওয়া, আত্মাকে সৎ ও শুভ লক্ষে পরিচালিত করা মানুষের অভিষ্ট। তিনিই প্রথম আত্মাকে কল্পনা করেছিলেন একটি বুদ্ধিসঞ্জাত নৈতিক শক্তি হিসেবে– এমন শক্তি যা ব্যক্তির ভালো বা মন্দ আচরণের জন্য দায়ী।

সক্রেটিস গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন শিক্ষাই মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ, শিক্ষার মধ্যেই মানুষের অন্তরে জ্ঞানের পূর্ণ জ্যোতি উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। জ্ঞানের মধ্যদিয়েই মানুষ একমাত্র সত্যকে চিনতে পারে। যখন তার কাছে সত্যের স্বরূপ উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে সে আর কোনো পাপ করে না। অজ্ঞানতা থেকেই সব পাপের জন্ম। তিনি চাইতেন মানুষের মনের অজ্ঞানতাকে দূর করে তার মধ্যে বিচার–বুদ্ধিবোধকে জাগ্রত করতে।

তিনি যুবকদের সুপথে পরিচালিত হওয়ার শিক্ষা দিতেন। সক্রেটিস তীব্রভাবে বিশ্বাস করতেন যে দুনিয়া সম্পর্কে জানার আগে মানুষকে নিজেকে জানতে হবে; এর একমাত্র মাধ্যম হলো যৌক্তিক চিন্তাভাবনা। তাই তিনি জোরের সঙ্গে বলেছিলেন, নিজেকে জান (know thyself)।

বুদ্ধের দর্শনও সক্রেটিসের ভাবনার সঙ্গে মিলে যায়। যুক্তিনির্ভর নয় এমন কোনো কিছুকে গৌতম বুদ্ধ তার চিন্তা বা আদর্শে স্থান দেননি, গ্রহণও করেননি। সক্রেটিসের মতো তিনিও বলেছেন, প্রতিটি মানুষের শিক্ষার প্রয়োজন। মানুষের জীবনসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো বুদ্ধদর্শনের প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় নয় বা জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় এমন বিষয় বৌদ্ধদর্শনে স্থান পায়নি। কোনো অন্ধবিশ্বাস, ভ্রান্ত–অযৌক্তিক মতবাদও বুদ্ধের ধর্ম–দর্শনকে স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি বলেছেন,

শাস্ত্রের মধ্যে নয়,মানুষের হৃদয়েই থাকে প্রকৃত ধর্মের অস্তিত্ব। কিছুই অসম্ভব নয়। কিছুই চিরকালের জন্য বাধ্যতা মূলক নয়,সবকিছুই অনুসন্ধান ও পরীক্ষা–সাপেক্ষ। জানো তারপর মানো। সত্যকে সত্য, মিথ্যাকে মিথ্যা বলে জেনো।

বুদ্ধের মতে, মানবজীবনে চিন্তা ও কর্মের সমন্বয় থাকা চাই। মানুষকে চিন্তা ও কর্ম উভয়ই সৎ হতে হবে। কাজে চিন্তার প্রতিফলন থাকা চাই। আর এর জন্য যুক্তির প্রাধান্য অত্যন্ত জরুরী। মানবতাবাদের ধারণটি তখনই সার্থকতা লাভ করে যখন সমাজে বা রাষ্ট্রে একজন মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়। মানুষের সৎ চিন্তা, সৎ কর্ম ও সৎ আদর্শের সঠিক প্রকাশের মাধ্যমেই সমাজে মানবতাবাদ ও মনুষ্যত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। সৎ চিন্তা, সৎ কর্ম ও সৎ আদর্শের সমন্বয় হলেই সমাজে শান্তি, উন্নয়ন, প্রগতি, সমৃদ্ধি ও সম্প্রীতি নিশ্চিত হয়।

বুদ্ধদর্শনে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, মানুষের নিজের কর্ম দ্বারাই তার ভাগ্য নির্ধারিত হয়, কোনো অলৌকিক বিষয়ের দ্বারা নয়। ব্যক্তি নিজেই তার আপনসত্তার নির্মাতা। মানুষ কর্ম, চিন্তা ও আদর্শ প্রকাশের মাধ্যমে তার মধ্যে অন্তর্নিহিত মানবীয় সত্তার বিকাশ করতে পারে। সুতরাং নিজের ভাগ্যের জন্য মানুষ নিজেই দায়ী।

বুদ্ধ সকল প্রাণীর সুখ–শান্তি ও কল্যাণ কামনা করেছেন। বিশ্বের সকল জীবের প্রতি মৈত্রী প্রদর্শনের নজির স্থাপন করে তিনি ‘পঞ্চশীল’ বাণীতে সকলকে প্রাণী–হত্যা হতে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। প্রতিটি জীবের প্রতি মৈত্রীময় আচরণ করতে বলেছেন। তিনি মনে করেন, জগতের প্রত্যেক প্রাণীর একটি স্বকীয় সত্তা আছে। এ সত্তাকে শ্রদ্ধা করতে হবে।

বুদ্ধের ধর্ম–দর্শনের সারকথাই হচ্ছে ত্যাগ। অপরের জন্য ত্যাগের মানসিকতা চাই। অপরের উন্নতি, শান্তি ও কল্যাণের জন্য আমাকে কাজ করতে হবে। কারণ অপরের উন্নতি–শান্তি–কল্যাণের মধ্যে আমার উন্নতি–শান্তি–কল্যাণ নিহিত। অপরের উপকার সাধনে সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। তাহলেই নিজের উন্নতি ও সমৃদ্ধি হবে। অপরকে আমার একান্ত অখণ্ড সত্তা বা আপন সত্তা বলে বিবেচনা করতে হবে। অপরের উন্নতিতে আমার উন্নতি, অপরের কল্যাণে আমার কল্যাণ, অপরের শান্তিতে আমার শান্তি–এ মনোবৃত্তিকে জাগ্রত করতে হবে সবার হৃদয়ে। আর এটি বুদ্ধের মানবতাবাদী দর্শন। আজকের অশান্ত–অস্থির–স্বার্থপর পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় মহান বুদ্ধের এ শাশ্বত মানবদর্শন অতি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

বুদ্ধ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের যথার্থ মূল্যায়ন, “যিনি সর্বভূতকে আপনারই মতো দেখেন এবং আত্মাকে সর্বভূতের মধ্যে দেখেন, তিনি প্রচ্ছন্ন থাকেন না। আপনাকে আপনাতেই যে বদ্ধ করে সে থাকে লুপ্ত; আপনাকে সকলের মধ্যে যে উপলব্ধি করে সেই হয় প্রকাশিত। মনুষ্যত্বের এই প্রকাশ ও প্রচ্ছন্নতার একটা মস্ত দৃষ্টান্ত ইতিহাসে আছে। বুদ্ধদেব মৈত্রীবুদ্ধিতে সকল মানুষকে এক করে দেখেছিলেন।” (শিক্ষার মিলন প্রবন্ধ)

মানুষের মানবীয় গুণ ও শক্তির সদ্ব্যবহারের উপর বেশি গুরুত্বারোপ করেছেন বুদ্ধ। এর মাধ্যমেই মানবসমাজের মধ্যে জাগরুক থাকতে পারে মনুষ্যত্ববোধ। কবি চণ্ডীদাসের বিখ্যাত উক্তি বুদ্ধের দর্শনের সঙ্গে বেশ সাদৃশ্যপূর্ণ। চণ্ডীদাস বলেছেন, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য/তাহার উপরে নাই।’ মানুষের মানবিক ক্ষমতার কথাই উচ্চারিত হয়েছে এখানে যা বুদ্ধের দর্শনেরও কথা। মানবতার কবি নজরুলেরও দৃঢ় উচ্চারণ, ‘গাহি সাম্যের গান/মানুষের চেয়ে বড় কিছুই নাই/নহে কিছু মহীয়ান।’

মানবতাবাদ চিন্তাকে অগ্রাধিকার দিয়েই মানবসমাজকে এগিয়ে যেতে হবে সামনের দিকে; সমাধান করতে হবে মানুষের সব সমস্যার। বুদ্ধের মতে, মানুষের মানবসত্তার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারলেই সব সমস্যা, অজ্ঞতা, অন্ধকার দূর করা যাবে। মানুষের সব ধরনের শক্তিকে মানুষের কল্যাণে যথার্থভাবে কাজে লাগাতে হবে; মানুষের কল্যাণে মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে; মানুষের মর্যাদা মানুষকেই প্রতিষ্ঠিত করতে হবে; মানবতাকে রক্ষায় মানুষকেই এগিয়ে আসতে হবে–এটি বুদ্ধের মহান শিক্ষা।

ধর্মীয় ভেদবুদ্ধি নয়, বুদ্ধের জন্মদিনে মানবতাবাদ বা মনুষ্যত্বের সাধনা বিস্তৃত হোক।