কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী আর নেই

অনলাইন ডেস্কঃ
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক এবং একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী আর নেই (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্নাইলাইহি রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৭২ বছর।

সোমবার (২৪ মে) রাত ১১টার দিকে রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বাংলা একাডেমির সচিব এ এইচ এম লোকমান খবরটি নিশ্চিত করেছেন।

এর আগে, গত ২৫ এপ্রিল পাকস্থলীর সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন হাবীবুল্লাহ সিরাজী। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ভ্যান্টিলেশনে নেয়া হয় এ কবিকে।

এ এইচ এম লোকমান জানান, হাবীবুল্লাহ সিরাজীর মরদেহ মঙ্গলবার (২৫ মে) সকাল ১০টায় শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে (করোনাকালীন স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে) রাখা হবে। এখানে প্রথম নামাজে জানাজার পর আজিমপুর কবরস্থানে দ্বিতীয় জানাজা শেষে সেখানে দাফন করা হবে তাকে।

হাবীবুল্লাহ সিরাজী ১৯৪৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর ফরিদপুর জেলার রসুলপুর গ্রামে আবুল হোসেন সিরাজী ও জাহানারা বেগম দম্পতির ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। ফরিদপুর জিলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক, ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিকের পর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে স্নাতক (১৯৭০) ডিগ্রি লাভ করেন তিনি।

শিক্ষাজীবন থেকেই সাহিত্যচর্চায় মনোযোগী হওয়া হাবীবুল্লাহ সিরাজী আশির দশকে জাতীয় কবিতা পরিষদ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে তিনি ভূমিকা রেখে গেছেন কবি, শিশুসাহিত্যিক, গদ্যকার, অনুবাদক, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, ছড়াকার প্রভৃতি পরিচয়ে।

তার রচিত কবিতাগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—দাও বৃক্ষ দাও দিন (১৯৭৫), মোমশিল্পের ক্ষয়ক্ষতি (১৯৭৭), মধ্যরাতে দুলে ওঠে গ্লাশ (১৯৮১), হাওয়া কলে জোড়া গাড়ি (১৯৮২), নোনা জলে বুনো সংসার (১৯৮৩), স্বপ্নহীনতার পক্ষে (১৯৮৩), আমার একজনই বন্ধু (১৯৮৭), পোশাক বদলের পালা (১৯৮৮), সিংহদরজা (১৯৯০), ম্লান, বিপ্লব বসত করে ঘরে (১৯৯৯), ছিন্নভিন্ন অপরাহ্ন (১৯৯৯), সারিবদ্ধ জ্যোৎস্না (২০০০), হ্রী (২০০৫), কতো কাছে জলছত্র, কতোদূর চেরাপুঞ্জি (২০০৬), কাদামাখা পা (২০০৬), ইতিহাস বদমাশ হলে মানুষ বড়ো কষ্ট পায় (২০০৯), একা ও করুণা (২০১০), আমার জ্যামিতি (২০১২), মিথ্যে তুমি দশ পিঁপড়ে (২০১৪), বডিমিস্ত্রি ফেসবুক (২০১৬), যে শ্রেষ্ঠ একা (২০১৬), জো (২০১৭), আমি জেনারেল (২০১৮), সুভাষিত (২০১৯) এবং ঈহা (২০১৯)।

কবিতা সংকলনের মধ্যে রয়েছে—প্রেমের কবিতা (১৯৮৯), বেদনার চল্লিশ আঙুল (১৯৯০), জয় বাংলা বলো রে ভাই (২০০০), নির্বাচিত কবিতা (২০০১), তুচ্ছ (২০০৩), স্বনির্বাচিত প্রেমের কবিতা (২০০৪), কবিতাসমগ্র (২০১১), ৫০ চড়বসং ড়ভ ঐধনরনঁষষধয ঝরৎধলবব (২০১৫) এবং হাবীবুল্লাহ সিরাজীর প্রেমের কবিতা (২০১৬)।

হাবীবুল্লাহ সিরাজীর রচিত আখ্যান—কৃষ্ণপক্ষে অগ্নিকা- (১৯৭৩), পরাজয় (১৯৮৮) এবং আয় রে আমার গোলাপজাম (২০১৭)। তিনি অনুবাদ করেছেন—রুমীর কবিতা (২০১৩) ও রসুল হামজাতভের কবিতা (২০১৯)।

এছাড়া তার গদ্যগ্রন্থ—দ্বিতীয় পাঠ (২০১০), মিশ্রমিল (২০১২), গদ্যের গন্ধগোকুল (২০১৮), পায়ে উর্বর পলি (২০১৮); শিশুসাহিত্য—ইল্লিবিল্লি (১৯৮০), নাইপাই (১৯৮৪), রাজা হটপট (১৯৯৯), ফুঁ (২০০১), ফুড়–ৎ (২০০৪), মেঘভ্রমণ (২০০৯), রে রে (২০১০), ছয় লাইনের ভূত (২০১১), একে শূন্য (২০১৫), কানাকানি (২০১৩), ছড়াছড়ি (২০১৮), মিলটিল (২০১৯); ছড়া সংকলন—এই আছি মৌমাছি (২০০৮), ছড়াপদ্য (২০১২) রয়েছে। তিনি ‘আমার কুমার’ (২০১০) নামে আত্মজৈবনিক বইও লিখেছেন।

বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে অনন্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে হাবীবুল্লাহ সিরাজী বিভিন্ন পুরস্কার-সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—একুশে পদক (২০১৬), বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯১), আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৯), সংহতি গুণীজন সম্মাননা পদক (যুক্তরাজ্য, ২০০৯), রূপসী বাংলা পুরস্কার (ভারত, ২০১০), মহাদিগন্ত পুরস্কার (ভারত, ২০১১), নলতা মিতালী কচিকাঁচার মেলা সম্মাননা (২০১১), বঙ্গবন্ধু স্মারক পুরস্কার (ভারত, ২০১৩), ফজল শাহাবুদ্দিন কবিতা পুরস্কার (২০১৬), জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার (২০১৮)।

২০০৭-২০১৫ মেয়াদে জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি পদে থাকা হাবীবুল্লাহ সিরাজী ২০১৮ সাল থেকে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

সূত্র: জাগোনিউজ