কোভিড–১৯ অ্যান্টিবডি টেস্ট পজিটিভ হওয়ার অর্থ কী?

লাইফস্টাইল ডেস্কঃ
অ্যান্টিবডি থাকা মানেই কী সুরক্ষিত?
কে করোনাভাইরাস সংক্রমণের শিকার হয়েছে আর কে এই ভাইরাস থেকে ঝুঁকিমুক্ত তা জানার উপায় হবে ‘অ্যান্টিবডি টেস্ট’। আর পৃথিবী জুড়ে ঢালাওভাবে এই পরীক্ষা করার মাধ্যমেই অবশেষে সুস্থ স্বাভাবিক সময়ে ফিরে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

কিছু মানুষ নিশ্চিত যে তাদের কোভিড-১৯ হয়েছিল কিন্তু তার ‘অ্যান্টিবডি টেস্ট’য়ের ফলাফল আসলো ‘নেগেটিভ’। আবার কেউ হয়ত ‘অ্যান্টিবডি টেস্ট’য়ের ফলাফল ‘পজিটিভ’ পেয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছেন যে তার আর কোভিড-১৯ হওয়া সম্ভব নয়।

তবে বাস্তব চিত্রটা এতটা সহজ নয়। সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন্স অ্যান্ড ইমিউনাইজেইশন’-এর প্রতিবেদন অবলম্বনে জানানো হলো বিস্তারিত।

অন্যান্য সকল স্বাস্থ্য পরীক্ষার মতো ‘কোভিড-১৯ অ্যান্টিবডি টেস্ট’ও অত্যন্ত সংবেদনশীল। যারা ইতোমধ্যে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন তাদের সিংহভাগেরই ফলাফল আসবে ‘পজিটিভ’।

তবে আসলেই কার রোগটি হয়েছে? সেটা বুঝতে ফলাফল আরও গভীরভাবে দেখতে হবে।

অ্যান্টিবডি টেস্ট’য়ের ‘সেনসিটিভিটি’ ও ‘স্পেসিফিসিটি’

পরীক্ষার ‘সেনসিটিভিটি’ ৯০ শতাংশ হওয়ার মানে হলো যাদের কোভিড-১৯ হয়েছে তাদের মধ্যে ৯০ শতাংশেরই ফলাফল আসবে ‘পজিটিভ’। আর ১০ শতাংশের আসবে ‘ফলস নেগেটিভ’।

অপরদিকে পরীক্ষার ‘স্পেসিফিসিটি’ ৯৮ শতাংশ, যার মানে হলো ২ শতাংশ মানুষ যাদের কখনই কোভিড-১৯ হয়নি তাদের ‘ফলস পজিটিভ’ আসবে।

পৃথিবীর বহু দেশে এই রোগে আক্রান্ত না হওয়া মানুষের সংখ্যাই এখন পর্যন্ত বেশি। সেই হিসেবে পৃথিবীর জনসংখ্যার ২ শতাংশ মানুষের ‘ফলস পজিটিভ’ মোটেই অবহেলা করার মতো সংখ্যা নয়।

সম্প্রতি স্পেন এক জরিপের মাধ্যমে দাবী করছে দেশটির জনসংখ্যার পাঁচ শতাংশ করোনাভাইরাসের সংস্পর্শে এসেছে। অর্থাৎ স্পেনে এক হাজার মানুষ ‘অ্যান্টিবডি টেস্ট’ করালে তাদের মধ্যে ৫০ জনের শরীরে কোভিড-১৯ অ্যান্টিবডি থাকা উচিত।

‘অ্যান্টিবডি টেস্ট’ যদি ৯০ শতাংশ ‘সেনসিটিভ’ হয় তবে ওই ৫০ জনের মধ্যে ৪৫ জন ‘ট্রু পজিটিভ’ শনাক্ত হবে। অপরদিকে যেহেতু পরীক্ষাটি শতভাগ ‘স্পেসিফিক’ নয়, তাই যে ৯৫০ মানুষ করোনাভাইরাসের সংস্পর্শে কখনই আসেনি তাদের মধ্য থেকে ২ শতাংশের হিসেবে ১৯ মানুষের আবার ‘ফলস নেগেটিভ’ আসবে।

সবমিলিয়ে মোট ৬৪ জন মানুষ ‘পজিটিভ’ ফলাফল পাবেন, যাদের মধ্যে মাত্র ৭০ শতাংশের আসলেই করোনাভাইরাসের ‘অ্যান্টিবডি’ আছে।

এই শতাংশের হিসাবকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন ‘পজিটিভ প্রেডিক্টিভ ভ্যালু (পিপিভি)’।

একটি দেশের জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভাইরাসটি কতটা ছড়িয়েছে তার ওপর এর মান নির্ভর করবে।

যদি বেশি মানুষের মাঝে রোগ ছড়িয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে যারা পরীক্ষা করিয়ে পজিটিভ ফলাফল পাচ্ছেন তাদের মধ্যে বেশি মানুষের আসলেই রোগ আছে কিংবা হয়েছিল, ফলে ‘পিপিভি’য়ের মান বেশি।

এই পুরো বিষয়টা অবশ্যই জটিল। সহজভাষায় বলতে গেলে, যে জনগোষ্ঠীর মাঝে ভাইরাসের প্রকোপটা এখনও কম, তাদের মাঝে ‘অ্যান্টিবডি টেস্ট’ ব্যবহার করলে যে ফলাফল আসবে তাকে সরাসরি গ্রহণ করলে চলবে না।

এই পরীক্ষার ভরসা-যোগ্যতা শুধু ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল নয়, যে জনগোষ্ঠীকে নিয়ে পরীক্ষা করা হচ্ছে তাদের ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার মাত্রার ওপরেও নির্ভরশীল।

রোগাক্রান্ত হওয়ার সময়

‘অ্যান্টিবডি’ টেস্টকে কতটুকু ভরসা করা যাবে তা রোগী কতদিন আগে সংক্রমণের শিকার হয়েছে সেটাও ওপরেও নির্ভরশীল। অ্যান্টিবডি টেস্ট’য়ে শনাক্ত করতে পারার মতো অ্যান্টিবডি তৈরি করতে অনেকটা সময় প্রয়োজন হয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার।

উপসর্গ দেখা দেওয়ার এক সপ্তাহের মধে যদি অ্যান্টিবডি টেস্ট করানো হয় তবে মাত্র ৩০ শতাংশ রোগীর পজিটিভ ফলাফল আসবে।

দ্বিতীয় সপ্তাহের তা দাঁড়াবে ৭০ শতাংশে, আর তৃতীয় সপ্তাহের ৯০ শতাংশ।

আবার এই সময়ের মধ্যে যদি কারও ‘অ্যান্টিবডি’য়ের মাত্রা কমে যায় তবে পজিটিভ’য়ের সংখ্যা কমে যেতে পারে। অনেকের আবার কোনো উপসর্গই দেখা দেয় না।

কিছু মানুষের শরীরে কখনই পরীক্ষার শনাক্ত করা মতো পর্যাপ্ত ‘অ্যান্টিবডি’ তৈরি হয় না।

একই ধরনের ভিন্ন অ্যান্টিবডি

করোনাভাইরাস অনেক ধরনের হয়। সাধারণ সর্দিজ্বর হয় যে করোনাভাইরাসে তাকে ধ্বংস করার যে অ্যান্টিবডি আর ‘কোভিড-১৯’ রোগের কারণ যে করোনাভাইরাস তাকে ধ্বংস করার ‘অ্যান্টিবডি’ অনেকটা একই রকম হতে পারে।

ফলে রক্তে থাকা সেই অ্যান্টিবডির কারণেও পজিটিভ ফলাফল আসতে পারে। কিন্তু কোভিড-১৯ থেকে সুরক্ষাকারী অ্যান্টিবডি তার শরীরে কখনই ছিল না।

অ্যান্টিবডি থাকা মানেই কি কেউ সুরক্ষিত?

সবকিছু হিসেব করেও যদি কারও শরীরে অ্যান্টিবডি খুঁজে পাওয়া যায় তারপরও বলা সম্ভব নয় যে ওই মানুষটি আর ‘কোভিড-১৯’য়ে আক্রান্ত হবেন না।

শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার অসংখ্য জটিল প্রক্রিয়া মধ্যে একটি হলো এই অ্যান্টিবডি। আর অ্যান্টিবডি না থাকলেও যেকোনো ভাইরাসকে ধ্বংস করার ক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার আরও অনেক হাতিয়ার থাকে।

তবে অ্যান্টিবডি হোক আর অন্য যে হাতিয়ারই হোক, তা ভাইরাসকে দমন করার জন্য পর্যাপ্ত শক্তি রাখে কি-না সেটাই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করে জয় কার হবে।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা জয় পেলে আপনি সুস্থ হবেন, আর ভাইরাস জিতে গেলে আপনি কোভিড-১৯’য়ে আক্রান্ত হবেন।

সূত্রঃ বিডিনিউজ