করোনাভাইরাস: সংক্রমণের নতুন চূড়ায় বিশ্ব

অনলাইন ডেস্কঃ
করোনাভাইরাস সংক্রমণের এবারের ধাক্কায় গত মার্চ থেকেই বিশ্বে দৈনিক শনাক্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছিল, দুই মাসেই তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।

এর আগে জানুয়ারিতে বিশ্বে দৈনিক শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি; গেল দুই সপ্তাহ ধরে জানুয়ারির সর্বোচ্চ অবস্থানকেও টপকে গিয়ে সেই সংখ্যা নতুন চূড়ায় পৌঁছেছে।

এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে দৈনিক শনাক্ত রোগীর সংখ্যা থাকছে আট লাখের ঘরে।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই নতুন চূড়ায় পৌঁছাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে ভারতের রেকর্ড ছাড়ানো সংক্রমণের হার।

গত মার্চ থেকে দেশটিতে আক্রান্ত আর মৃত্যুর সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। গত ১ এপ্রিল থেকে সংক্রমণের হার পাঁচগুণ বেড়ে সপ্তাহে দৈনিক আক্রান্তের গড় বৃহস্পতিবার তিন লাখ ৫৭ হাজার ছাড়িয়ে যায়।

বিশ্বে করোনাভাইরাসে মোট আক্রান্তের ৪০ শতাংশের বেশি এখন ভারতের। গড়ে প্রতিদিন তিন হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটছে সেখানে।

অবশ্য, বাস্তব সংখ্যা এর চেয়ে আরো অনেক বেশি বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ে তছনছ হয়ে গেছে পুরো ভারত। রাজধানী নয়াদিল্লির হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেনের ঘাটতি একটি সংকটে পরিণত হয়েছে। একের পর এক মৃতদেহের সৎকারে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে পেরে উঠছে না শ্মশানগুলো।

দেশটিতে বিশ্বের অন্যতম কঠোর লকডাউনের কারণে তুলনা বিচারে গত মার্চে মৃত্যু কিছুটা কমেছিল। এরপরই বিধিনিষেধ শিথিল করে দেয় ভারতীয় কর্মকর্তারা। সাম্প্রতিক সময়ে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির মধ্যেও জনাকীর্ণ সমাবেশ করেছেন বেশ কিছু রাজনৈতিক নেতা। এসবের পরই আক্রান্তের ভিড়ে উপচে পড়ে হাসপাতালগুলো।

ফেসবুক পোস্টে একজন চিকিৎসক লিখেছেন, “কোনো হাসপাতাল বন্ধ করা হয়নি, লড়াইয়ে সামনের সারিতে থাকা কোনো চিকিৎসকও পিছু হটেনি। আমরা লাঠি নিয়ে ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে লড়ছি, কিন্তু আমরা যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে যাচ্ছি না।”

দেশটতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ার কারখানা থাকলেও সংক্রমণের ঢেউ সামাল দিতে টিকাদান কর্মসূচি চলছে অত্যন্ত ধীরগতিতে। জনসংখ্যার দুই শতাংশেরও কম মানুষ টিকার পূর্ণ ডোজ পেয়েছন এবং ১০ শতাংশেরও কম পেয়েছেন একটি ডোজ।

বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চল এবং দেশেও দেখা গেছে একই ধরনের উদ্বেগের ধারা। জনসংখ্যা বিচারে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের হার এখন উরুগুয়েতে। মাত্র ৩৫ লাখ মানুষের এই দেশটিতে প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন।

পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে দক্ষিণ আমেরিকার অন্যান্য দেশগুলোও। বৃহস্পতিবারের তথ্য অনুযায়ী, কোভিড- ১৯ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হারে শীর্ষ ২০টি দেশের তালিকায় আছে উরুগুয়েসহ প্যারাগুয়ে, ব্রাজিল, পেরু, আর্জেন্টিনা ও কলম্বিয়া।

দক্ষিণ আমেরিকায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ মহামারী হয়ে ওঠার পেছনে বেশ কিছু কারণে কথা বলা হয় প্রতিবেদনে। করোনাভাইরাসের ঝুঁকির বিষয়ে মহাদেশটির সবচেয়ে বড় দেশ ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারোর অবজ্ঞাসূচক আচরণের কারণে মাসব্যাপী সংকটের পর তা আশপাশের দেশেও ছড়িয়ে পড়ে।

এক গবেষণায় বলা হয়, সম্ভবত সবচেয়ে দ্রুত সংক্রামক এবং বেশি বিপজ্জনক করোনাভাইরাসের পি১ ধরনটি গত বছরের শেষে ব্রাজিলের মানাউস শহরেই প্রথম শনাক্ত হয়।

কলম্বিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী মেডেলিনেও সংক্রমণের তীব্রতা দেখা যাচ্ছে। গত বছর দেশটির কর্মকর্তারা করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেশ ভালভাবেই ঠেকিয়েছিলেন। কিন্তু জানুয়ারি এবং এপ্রিলে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ঢেউয়ে তছনছ হয়ে গেছে পুরো নগরী। ২০২০ সালে সেখান এক হাজার নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিও) ব্যবস্থা করা হলেও তাতে কুলোয়নি।

হসপিটাল পাবলো টোবোন উরিব এর প্রধান চিকিৎসক ডা. আন্দ্রেজ অ্যাগুইরে সম্প্রতি জানিয়েছেন, মেডেলিন ও তার আশপাশের এলাকার অন্তত তিনশ রোগী আইসিওতে জায়গা পেতে অপেক্ষা করছেন। টিকাদান কর্মসূচির ধীরগতির কারণে ওই এলাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে বলেও তিনি আশঙ্কা করেন।

কোভিড- ১৯ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হারে শীর্ষ ২০টি দেশের অর্ধেকই মধ্য এবং পূর্ব ইউরোপের। সংক্রমণ বাড়ায় দূর পূর্বাঞ্চলীয় দেশ তুরস্কে নতুন করে বৃহস্পতিবার থেকে আবারও লকডাউন শুরু হয়েছে।

পশ্চিম ইউরোপের কিছু অংশে সংক্রমণ বেড়ে একই অবস্থানে থাকছে অথবা খুবই ধীর গতিতে তা কমছে। ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস এবং সুইডেনেও নতুন করে সংক্রমণের হার বেশ উঁচুতেই আছে। এই বসন্তে অঞ্চলটি করোনাভাইরাসের বি.১.১.৭ ধরনের নতুন ঢেউয়ে বিপর্যস্ত হয়ে গেছে।

বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান সংকটের সময়ে ভারতকে দেওয়া আন্তর্জাতিক মহলের সহযোগিতার প্রশংসা করেন। ভারতকে অর্থ এবং চিকিৎসা সামগ্রী দিয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ।

তিনি বলেন, “একই সময়ে আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, বিশ্বের অনেক দেশেই এখনও তীব্র সংক্রমণ হচ্ছে।”

এ মাসের শুরুতে মৃত্যুর হার কমতে থাকা ব্রাজিলের করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক বলেন, “মহামারী আমাদের শিখিয়েছে, কোনো দেশ একা তার সুরক্ষানীতি কমিয়ে ফেলতে পারে না।”

সূত্রঃ বিডিনিউজ