গত বছর ‘পিকের’ দ্বিগুণ সংক্রমণ ও মৃত্যু

অনলাইন ডেস্কঃ
দেশে মহামারি পরিস্থিতি উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। গত বছরের জুলাইয়ে সর্বোচ্চ সংক্রমণের সময় যেখানে ৩০ দিনে এক লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলেন। এখন সর্বশেষ এক লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন মাত্র ১৬ দিনে। আর গত বছরের ওই সময় ২৫ দিনে মৃত্যু হয়েছিল সহস্রাধিক মানুষের। এখন সর্বশেষ ১৫ দিনে করোনায় প্রাণ হারিয়েছেন এক হাজার মানুষ। অর্থাৎ গত বছরের সর্বোচ্চ সংক্রমণের সময়ের তুলনায় সংক্রমণ ও মৃত্যু বেড়েছে।

গত চব্বিশ ঘণ্টায় নতুন করে আরও চার হাজার ১৯২ জনের শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা সাত লাখ সাত হাজার ৩৬২ জনে পৌঁছাল। এই সময়ে করোনা সংক্রমিত আরও ৯৪ জন মৃত্যুবরণ করেন। এর মধ্য দিয়ে দেশে করোনা সংক্রমণের ৪০৪তম দিনে মোট ১০ হাজার ৮১ জনের মৃত্যু হলো। আগের দিন বুধবার ৯৬ জনের মৃত্যু হয়। এক দিনে এটি সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা। বুধবার পাঁচ হাজার ১৮৫ জনের শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্তের মধ্য দিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা সাত লাখ ছাড়ায়।\হএর বিপরীতে গত চব্বিশ ঘণ্টায় পাঁচ হাজার ৯১৫ জন করোনার সংক্রমণ থেকে সুস্থ হয়ে উঠেছেন। এর মধ্য দিয়ে করোনা সংক্রমিত মোট পাঁচ লাখ ৯৭ হাজার ২১৪ জন সুস্থ হয়ে উঠলেন। করোনাভাইরাস সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করা আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডওমিটারসের তথ্যানুযায়ী, বিশ্বে করোনাভাইরাস সংক্রমিত দেশগুলোর মধ্যে ৩৩তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশে গত বুধবার আক্রান্তের সংখ্যা সাত লাখ অতিক্রম করে। আর গতকাল বৃহস্পতিবার ৩৮তম দেশ হিসেবে মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়াল।\হদেশে করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যু আরও বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের করোনাভাইরাস ব্যবস্থাপনা কোর\হকমিটি। গত সপ্তাহে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃপক্ষের কাছে পূর্বাভাস সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করা হয়। এতে বলা হয়, প্রতিদিন গড়ে ১০ হাজার করে সংক্রমিত এবং ১০০ কিংবা তার কাছাকাছি মানুষ মৃত্যুবরণ করতে পারে। এটি এপ্রিল মাসজুড়ে থাকবে। মে মাসের মাঝামাঝি অথবা শেষ দিকে গিয়ে আক্রান্ত ও মৃত্যু কমে আসতে পারে।\হকোর কমিটির প্রধান অধ্যাপক ডা. শাহ মনির হোসেন সমকালকে বলেন, চলমান সংক্রমণ ও মৃত্যুর বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে লকডাউন চলছে। এ অবস্থা দুই সপ্তাহ চললে সংক্রমণ ও মৃত্যু পরবর্তী সময় কমে আসবে। আরও একটি ধাপে ১৪ দিন লকডাউন দেওয়া গেলে সংক্রমণ ও মৃত্যু কমে আসবে। তবে জনসাধারণকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে, মাস্ক পরতে হবে।

দ্রুততম আক্রান্ত এবং সহস্রাধিক মৃত্যু :গত বছর ৮ মার্চ প্রথম সংক্রমণ শনাক্ত থেকে পরবর্তী ৮৭ দিনে আক্রান্ত হয় ৫২ হাজার ৪৪৫ জন, মারা যায় ৭০৯ জন। সংক্রমণের ১০৩তম দিন গত বছরের ১৮ জুন আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ দুই হাজার ২৯২ জনে এবং মৃত্যুর সংখ্যা এক হাজার ৩৩৪ জনে পৌঁছায়। পরবর্তী ১৬ দিনে আক্রান্ত হন ৪৯ হাজার ৮৪৭ জন এবং মৃত্যুবরণ করেন ৬৩৪ জন। সংক্রমণের ১১৭তম দিনে গত বছরের ২ জুলাই এসে আক্রান্তের সংখ্যা সংখ্যা এক লাখ ৫৩ হাজার ২৭৭ জনে এবং মৃতের সংখ্যা এক হাজার ৯২৬ জনে পৌঁছায়। অর্থাৎ ১২ দিনে ৫০ হাজার ৯৮৫ জন আক্রান্ত এবং ৫৯২ জন মৃত্যুবরণ করেন। সংক্রমণের ১৩৩তম দিন গত বছরের ১৮ জুলাই আক্রান্তের সংখ্যা দুই লাখ দুই হাজার ৬৬ জনে এবং মৃতের সংখ্যা দুই হাজার ৫৮১ জনে পৌঁছায়। অর্থাৎ ১৬ দিনে আক্রান্ত হন ৪৮ হাজার ৭৮৯ জন এবং মৃত্যুবরণ করেন ৬৫৫ জন। সংক্রমণের ১৫৩ দিন গত বছরের ৭ আগস্ট মোট আক্রান্তের দুই লাখ ৫২ হাজার ৫০২ জনে এবং মৃতের সংখ্যা তিন হাজার ৩৩৩ জনে পৌঁছায়। অর্থাৎ ২০ দিনে ৫০ হাজার ৪৩৬ জন আক্রান্ত এবং মৃত্যুবরণ করেন ৭৫২ জন। সংক্রমণের ১৭২তম দিনে গত বছরের ২৬ আগস্ট আক্রান্তের সংখ্যা তিন লাখ দুই হাজার ১৪৭ জনে এবং মৃত্যুর সংখ্যা চার হাজার ৮২ জনে পৌঁছায়। অর্থাৎ ১৯ দিনে ৪৯ হাজার ৬৪৫ জন আক্রান্ত এবং ৭৪৯ জন মৃত্যুবরণ করেন। সংক্রমণের ১৯৮তম দিনে গত বছরের ২১ সেপ্টেম্বর আক্রান্তের সংখ্যা তিন লাখ ৫০ হাজার ৬২১ জনে এবং মৃতের সংখ্যা চার হাজার ৯৭৯ জনে পৌঁছায়। অর্থাৎ ২৬ দিনে মোট ৪৮ হাজার ৪৭৪ জন আক্রান্ত এবং ৮৯৭ জন মৃত্যুবরণ করেন।

তথ্য-উপাত্তে দেখা যায়, সংক্রমণের ৩৬৫তম দিনে চলতি বছরের ৭ মার্চ আক্রান্তের সংখ্যা পাঁচ লাখ ৫০ হাজার ৩৩০ জনে এবং মৃতের সংখ্যা আট হাজার ৪৬২ জনে পৌঁছায়। অর্থাৎ ৭৭ দিনে ৪৯ হাজার ৬১৭ জন আক্রান্ত এবং এক হাজার ১৮২ জন মৃত্যুবরণ করেন। এর পর সংক্রমণ ও মৃত্যু দ্রুত হারে বাড়তে থাকে। ৩৮৮তম দিন ৩০ মার্চ আক্রান্তের সংখ্যা ছয় লাখ পাঁচ হাজার ৯৩৭ জনে এবং মৃতের সংখ্যা আট হাজার ৯৯৪ জনে পৌঁছায়। অর্থাৎ ২৩ দিনে ৫৫ হাজার ৬০৭ জন এবং মৃত্যুবরণ করেন এক হাজার ৫৩২ জন। সংক্রমণের ৪০৩তম দিনে ১৪ এপ্রিল আক্রান্তের সংখ্যা সাত লাখ ছাড়ায়। আর ১৫ এপ্রিল গতকাল বৃহস্পতিবার আক্রান্তের সংখ্যা সাত লাখ সাত হাজার ৩৬২ জনে এবং মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ৮১ জনে পৌঁছায়। অর্থাৎ সর্বশেষ ১৬ দিনে আক্রান্ত হয় এক লাখ এক হাজার ৪২৫ জন মানুষ। একই সময়ে মৃত্যুবরণ করে এক হাজার ৮৭ জন।

লকডাউনের বিজ্ঞানসম্মত প্রয়োগ দাবি :করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে চলমান লকডাউনের জোরালো কার্যকরের পাশাপাশি বিজ্ঞানসম্মত প্রয়োগ চান জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, প্রথম দফায় ৬ এপ্রিল থেকে লকডাউন কার্যকর করা গেলে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার অনেকাংশে কমানো যেত। কিন্তু সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া বিধিনিষেধ আরোপ করায় সেটি প্রথম দিন থেকেই অকার্যকর হয়ে পড়ে। পরে বুধবার থেকে এক সপ্তাহের জন্য কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। প্রথম দিন থেকেই এটি সুষ্ঠুভাবে কার্যকর হচ্ছে। এটি অব্যাহত রাখতে হবে। কিন্তু চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীসহ জরুরি সেবার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের এর আওতামুক্ত রাখতে হবে।\হস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ সমকালকে বলেন, শুরু থেকে বলে আসছি চলমান লকডাউন বিজ্ঞানসম্মত হয়নি। মানুষের শরীরে করোনাভাইরাসের সুপ্তিকাল এক থেকে ১৪ দিন। কারও শরীরে এই ভাইরাস সংক্রমিত হলে তা এক থেকে ১৪ দিনের মধ্যে প্রকাশ পাবে। সুতরাং করোনার এই ধাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য নূ্যনতম ১৪ দিন লকডাউন প্রয়োজন। আর দুটি ধাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য ২৮ দিন লকডাউন দিতে হবে। এই লকডাউনের উদ্দেশ্য হলো- জনসাধারণকে পরস্পরের থেকে দূরে রাখা। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে পারলে সংক্রমণ অনেকাংশে হ্রাস পাবে। এই ধাপ অতিক্রম করার পর মাস্ক পরা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সামাজিক দূরত্ব মেনে চলাফেরা করলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।\হস্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সমকালকে বলেন, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে চলমান বিধিনিষেধ কার্যকর করতে সরকারের সংশ্নিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ একযোগে কাজ করে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সার্বিক বিষয় পর্যবেক্ষণ করছেন। প্রতিটি মুহূর্তে তিনি সবাইকে পরামর্শ দিচ্ছেন। সাত দিন পর পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।

সূত্রঃ সমকাল