নববর্ষ ১৪২৮ঃ চর্যাপদের ঐতিহ্যিক পুনর্জাগরণে বাংলার বাউল-ফকির

সাইমন জাকারিয়াঃ
চর্যাপদ বাংলাদেশের প্রাচীনতম ঐতিহ্যিক ভাবসম্পদ। আজ থেকে এক হাজার বছরেরও বেশি আগে এদেশের সাধক কবি, গায়ক ও নৃত্যশিল্পীরা চর্যাপদের ধারক ও বাহক ছিলেন।

১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে নেপালের রাজদরবার গ্রন্থাগার থেকে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্যাপদের পাণ্ডুলিপি আবিস্কার ও সংগ্রহ করেন। চর্যাপদের সেই পাণ্ডুলিপিটি তিনি আরও তিনটি পুঁথির সঙ্গে ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা’ নামে বিস্তৃত ভূমিকাসহ ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেন। গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি লিখেছেন- “১৯০৭ সালে আবার নেপালে গিয়া আমি কয়েকখানি পুথি দেখিতে পাইলাম। একখানির নাম ‘চর্য্যাচর্য্য-বিনিশ্চয়’, উহাতে কতকগুলি কীর্তনের গান আছে… গানগুলি বৈষ্ণবদের কীর্তনের মত, নাম ‘চর্য্যাপদ’। …আমার বিশ্বাস, যাঁরা এই ভাষা লিখিয়াছেন, তাঁরা বাঙ্গালা ও তন্নিকটবর্তী দেশের লোক। অনেকে যে বাঙ্গালী, তাহার প্রমাণও পাওয়া গিয়াছে।” যেমন তিব্বতে প্রাপ্ত ‘চতুরশীতি-সিদ্ধাপ্রবৃত্তি’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, চর্যাগীতির সর্বাধিক পদের রচয়িতা কাহ্নুপার দেশ ছিল সোমপুরী তথা বর্তমানে নওগাঁ জেলার পাহাড়পুরে।

কাহ্নুপাসহ চর্যাপদের আরেক বিখ্যাত সাধক কবি বিরুপা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী দেবপালের রাজত্বকালে সোমপুর মহাবিহারের ভিক্ষু ছিলেন এবং তাঁরা সেসময়ে সেখানে চর্যাপদে উদ্ধৃত গীতি-নৃত্য ও নাট্যের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে দেহসাধনা ও ধর্মউপাসনার শিক্ষা দিতেন।
উল্লেখ্য, চর্যাপদের সেই দেহসাধনার ধারার পরবর্তীকালে বহু ধরনের অভিঘাতের ভেতর দিয়ে বিভিন্নভাবে চর্চিত ও রক্ষিত হয়ে আসছে। অনেক গবেষক চর্যাপদের ঐতিহ্যিক পরম্পরাকে বাউল-ফকিরদের দেহসাধনা ও গানে প্রত্যক্ষ করেছেন। এমনকি চর্যাপদ প্রাচীন ঐতিহ্য থেকেই যে বাউল সাধনা ও গান বিকশিত হয়েছে, সে সম্পর্কেও মত পাওয়া যায়।
ড. আহমদ শরীফ তাঁর ‘বাউলতত্ত্ব’ গ্রন্থে বাউল সাধনার প্রাচীনত্বের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে লিখেছেন- চর্যাপদে বর্ণিত ‘বাজিল’, ‘বাজুল’ শব্দ থেকেই ‘বাউল’ শব্দটি রূপ লাভ করেছে। আর চর্যাপদের ‘বাজিল’ বা ‘বাজুল’ শব্দটি মূলত দেহসাধনা গুরু ‘বজ্রকুল’ বা ‘বজ্রগুরু’ থেকে উদ্ভূত হয়েছে। এই সূত্রে চর্যাপদের ঐতিহ্যিক পুনর্জাগরণে বাউল-ফকিরদের ভূমিকাকে বিচার করা সংগত।
দুই.
চর্যাপদকে আশ্রয় করেই প্রাচীন বাংলার নাট্য, নৃত্য ও গীত পরিবেশন রীতির ইতিহাস নির্মাণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে আমরা সাধারণত চর্যাপদের ১৭ সংখ্যক পদ থেকে বীণাপার বাণীটি উদ্ধৃত করে থাকি। বাণীতে বলা হয়েছে- ‘নাচন্তি বাজিল গান্তি দেবী/বুদ্ধ নাটক বিসমা হোই ধ্রু’ এই বাণীতে প্রাচীন বাংলার তিনটি পরিবেশন রীতির সমন্বিত রূপের কথা লিপিবদ্ধ রয়েছে। সেই সঙ্গে পূর্বে উল্লিখিত প্রাচীন বাংলার দেহসাধক ‘বাজিল’ সম্পর্কেও তথ্য রয়েছে। এ ছাড়া, ৩৫ সংখ্যক চর্যাপদে ভাদেপার বাণীতে পাওয়া যায়- ‘বাজুলে দিল মো লক্‌খ ভণিআ।/মই অহারিল গঅণত পসিআ’ অর্থাৎ ‘বাজুল আমাকে দিয়েছেন বলে/সাধন করণ লক্ষ।/গগনের পানি পান করি আমি/শূন্যে মেলে পক্ষ’ এই ‘বাজুল’ সেই তো গুরু। এই গুরু সম্পর্কে চর্যাপদের টীকায় বলা হয়েছে- ‘বজ্রগুরু আমাকে লক্ষ্যের বা চতুর্থানন্দ লাভের উপায় বলে দিয়াছেন, অর্থাৎ অতীন্দ্রিয় সহজানন্দ লাভের সন্ধান দিয়াছেন।’ (মনীন্দ্র মোহন বসু, চর্য্যাপদ, ১৯৬৪ :১৭৬) এখানে দেহসাধন পদ্ধতির গুরু হিসেবে ‘বজ্রগুরু’ তথা ‘বাজুল’-এর কথা বলা হয়েছে, যাকে আজকের দিনের বাউলগুরুর পূর্বসূত্র হিসেবে ধরে নেওয়া যেতে পারে।
চর্যাপদের এই সূত্রকে মাথায় নিয়ে বাংলাদেশের বাউল-ফকির সাধকশিল্পীর চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণের ইতিহাস রচনার সময় এসেছে। কেননা, বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের বাউল-ফকির সাধকশিল্পীরা দীর্ঘদিন ধরে চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণ করে আসছেন। যতটুকু জানা যায়, বাংলাদেশে চর্যাপদের গান পরিবেশনের নাগরিক তৎপরতা হয়ে আসছিল সেই ১৯৫০-এর দশক থেকে; রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পর। কিন্তু সেই চর্চা শুধু শহুরে কতিপয় শিক্ষিত ও ধ্রুপদি সংগীতে পারদর্শী ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এর কারণও স্পষ্ট- চর্যাপদের আবিস্কার মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্যার পদগুলোকে লোকায়ত ভাবপরিমণ্ডলের সংগীতসম্পদ হিসেবে উল্লেখ করলেও চর্যার প্রতিটি পদের শীর্ষভাবে রাগ-রাগিণীর উল্লেখ থাকায় অধিকাংশ গবেষক-পণ্ডিত ও সংগীতকার একে ধ্রুপদি সংগীত হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। অথচ, কেউ তলিয়ে দেখেননি চর্যাপদের আবিস্কারক মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী কেন বলেছিলেন, “[চর্যার] গানগুলি বৈষ্ণবদের কীর্তনের মত, নাম ‘চর্য্যাপদ’।” এছাড়া, চর্যাপদের বাণীর অধিকাংশস্থলে লোকায়ত জনজীবন ও সাধনপদ্ধতির কথা লিপিবদ্ধ রয়েছে। এক্ষেত্রে চর্যাপদের গানগুলোকে লোকায়ত জীবনে চর্চার বিষয় করা যেতে পারত বহু আগেই। বেশ কিছুটা দেরি হলেও বাংলাদেশের সাধকশিল্পীরা সেই কাজটি সাম্প্রতিককালে সফল করেছেন। বাংলাদেশের ভাবসাধকদের চর্যাপদের গানের সেই পুনর্জাগরণের ইতিহাস বলার আগে চর্যাপদের পাণ্ডুলিপির আবিস্কারভূমি নেপালে প্রচলিত চর্যা-সংস্কৃতির কিছু কথা বলে নেওয়া ভালো।

তিন.
নেপালে এখনও চর্যাপদের গান লেখা হয় এবং কখনও তা কৃত্যমূলক আসরে পুথি পাঠের রীতিতে আবৃত্তি করা হয়। কখনও সুর করে সুরবাদ্যসহ গীত করা হয়। কখনও-বা আবার সুরবাদ্যসহ গীতের পাশাপাশি চর্যানৃত্য পরিবেশিত হয়ে থাকে।
জানা যায়, বাংলাদেশের মতো নেপালেও ৭০০ থেকে ৮০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে চর্যাপদে বর্ণিত গীতি-নৃত্য প্রচলিত ছিল। নেপালে প্রচলিত চর্যাপদের গীতি-নৃত্য মূলত বৌদ্ধতান্ত্রিকদের ঐতিহ্য। সুনির্দিষ্ট কিছু সাধন-তান্ত্রিক মানুষ এই চর্যা-সংস্কৃতিতে অংশ নিত। আধুনিককালে ১৯৫৭ সালে কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত বৌদ্ধদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রথম চর্যাগীতি-নৃত্য জনসমক্ষে প্রদর্শিত হয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত চর্যা-সংস্কৃতির নৃত্য ও গীতি নাগরিক পরিমণ্ডলে পরিবেশিত হয়ে আসছে। সাধারণত বজ্রাচার্য অনুসারী বৌদ্ধরা মন্দিরে ও বিভিন্ন নাগরিক অভিনয়মঞ্চে বা পর্যটকদের সামনে চর্যার গীত-নৃত্য পেশাগতভাবে পরিবেশন করে থাকে। নেপালের কাঠমান্ডুর কিছু হোটেল, গবেষণা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন নিয়মিতভাবে বিদেশি পর্যটকদের সামনে এ ধরনের চর্যানৃত্য গীত পরিবেশন করে। অন্যদিকে নেপালের কাঠমান্ডু শহরের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে বা বৌদ্ধ উপাসনালয়ে লোকায়ত সংগীত পরিবেশনের ধারায় নেওয়ারি ভাষায় ‘চচা গীত’ নামে চর্যাপদের আসর প্রত্যক্ষ করা যায়। এসব আসরে চর্যাপদ পরিবেশনে রাগ-রাগিণীর প্রাধান্য তেমনভাবে প্রত্যক্ষ করা যায় না।
চার.
মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর পাঠে প্রাপ্ত চর্যাপদের শীর্ষদেশে রাগ-রাগিণীর সুনির্দিষ্ট উল্লেখ নিয়ে গবেষক-পণ্ডিত মহলে যে অনড় ধারণা প্রচলিত রয়েছে, এবারে সে সম্পর্কে কিছু কথা বলা যেতে পারে। মজার ব্যাপার হলো, হরপ্রসাদ ৫১টি চর্যাপদের মধ্যে সাড়ে ৪৬টি পদ আবিস্কার করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে সুকুমার সেন যে তিব্বতি পাঠ অবলম্বনে ৫০টি চর্যাপদের পাঠ প্রকাশ করেছিলেন, সে বিষয়ে গবেষকদের কোনো মন্তব্য দেখা যায় না। অন্যদিকে শশিভূষণ দাশগুপ্ত আবিস্কৃত ৯৮টি পদের সংকলন ‘নব চর্যাপদ’ সম্পর্কেও গবেষকদের মন্তব্য দৃষ্ট হয় না। বাংলাদেশের ভাবসাধকদের চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণের ইতিহাস পর্যালোচনায় উপর্যুক্ত প্রকাশনের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কেননা, হরপ্রসাদ সংকলিত চর্যাপদের ৪ সংখ্যক পদটি শশিভূষণ দাশগুপ্তের ‘নব চর্যাপদ’-এ লভ্য। পদটির প্রথম চরণ ‘তিঅড্ডা চাপী জোইনি দে অঙ্কবালী’। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর পাঠে এই পদটির শীর্ষভাবে ‘রাগ অরু’-এর নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু শশিভূষণের পাঠে একই পদের শীর্ষভাগে ‘রাগ-কর্ণাটি’র উল্লেখ রয়েছে। শুধু তাই নয়, শশিভূষণের পাঠে ‘তাল-ঝপ’-এর নির্দেশনা রয়েছে। শশিভূষণের পাঠের মতো সাম্প্রতিককালের নেপালের কাঠমান্ডুতে প্রাপ্ত হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি ও কাঠমান্ডু থেকে মুদ্রিত গ্রন্থে প্রায় একই ধরনের রাগ ও তালের উল্লেখ পাওয়া পায়। উল্লেখ্য, ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দে নেপালের কাঠমান্ডু শহরের ‘চচা গান’-এর অন্যতম গুরু নরেন্দ্রমুনি বজ্রাচার্যের নিকট থেকে আমাদের সংগৃহীত একটি হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপিতে এই পদটির শুরুতে ‘রাগ কর্ণাটি’ এবং ‘তাল-ঝপ’-এর নির্দেশনা রয়েছে। এছাড়া, নেপালের কাঠমান্ডু থেকে প্রকাশিত রত্নকাজী আচার্য্য সম্পাদিত চর্যাপদের সংকলন ‘চচা-মুনা’তে একই পদের শীর্ষে ‘রাগ :পদ্মাঞ্জলী’ ও ‘তাল :মাথ’-এর নির্দেশনা রয়েছে। [Ratnakj ajrcrya (ed.), Pulgu va Nhgu Cac-mun, Niggu Bva (Vol. II), Kathmandu, 1999 : 118] এ বিষয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে জাপানের অধ্যাপক মাকোতো কিতাদা-ও রচিত “The fourth Carypada still being chanted in Kathmandu today : Cac song, Triha” শীর্ষক প্রবন্ধটি ওসাকা ইউনিভার্সিটি নলেজ আরকাইভ : OUKA-তে সবার জন্য উন্মুক্ত রয়েছে [লিঙ্ক : :http://hdl.handle.net/11094/73441]|]। এ ক্ষেত্রে একটি চর্যাপদ যে বিভিন্ন রাগ ও তালে গাওয়া যেতে পারে, তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, চর্যাপদের গানগুলো যে লোকায়ত আঙ্গিকেও পরিবেশনযোগ্য, তার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
পাঁচ.
বাংলাদেশের বাউলসাধকরা মূলত দেহকেন্দ্রিক সাধনা করেন। বাংলার বাউলরা প্রাচীনকাল থেকে দেহের ভেতর বিশ্বজগতের সবকিছু আবিস্কার করে সাধনায় সিদ্ধি লাভ করেছিলেন। বাউলদের দেহসাধনার প্রাচীনধারা প্রভাবে প্রাচীন চর্যাপদের কবিরাও গান লিখেছিলেন, যা চর্যাপদ বা চর্যাগীতি নামে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। আগেই বলা হয়েছে, ‘বাউল’ শব্দটি চর্যাপদের বজ্রগুরু ‘বাজুল’ বা ‘বাজিল’ থেকে আগত। তাই, আমাদের বিবেচনায় প্রাচীনকালের চর্যাপদের গানগুলোই প্রাচীন বাউলগান। আর বাংলাদেশের বাউল-ফকির সাধকরা সেই সত্যকে উদ্ধৃত করে ভাবনগর সাধুসঙ্গের উদ্যোগে চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণ সম্ভব করেছেন।
আমরা জানি, নওগাঁর বদলগাছি থানার পাহাড়পুর গ্রামের সোমপুর মহাবিহার প্রাচীন চর্যাগান ও বাউলগানের প্রাণকেন্দ্র। ৭৭০-১১০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এখানে চর্যাগানের চর্চা অব্যাহত ছিল। সোমপুর বা পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের প্রতিষ্ঠাতা ধর্মপাল এবং তার পুত্র দেবপালের রাজত্বকালে চর্যাপদের বিখ্যাত কবি কাহ্নুপা এবং বিরূপা এই বিহারের ভিক্ষু এবং সাধক ছিলেন। কাহ্নুপা তাঁর গুরু জালন্ধরপার নিকট থেকে সাধনশিক্ষা গ্রহণ করেন। তারপর বিচিত্র অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে সাধনায় সিদ্ধি লাভ করেন, কাহ্নুপার জীবনসাধনার ভেতর দিয়ে মানুষকে অহঙ্কার ও ঈর্ষা বর্জনের নির্দেশনা দিয়ে গেছেন। একই সঙ্গে গুরুভক্তির মাধ্যমে কীভাবে অসম্ভব কার্যে সিদ্ধি লাভ করা যায় তাও কাহ্নুপার জীবন থেকে আমরা জানতে পারি। কাহ্নুপা ও বিরুপার স্মৃতিধন্য পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার অঞ্চলের বাউল-ফকির সাধকেরা লোকায়ত সংগীত পরিবেশনের আঙ্গিকে দেহসাধনার প্রাচীন ধারায় চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণে গড়ে তুলেছে ‘ভাবনগর সাধুসঙ্গ চর্যা চর্চা কেন্দ্র’। মূলত ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে জাপানের হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও লালনপন্থি সাধক-গবেষক মাসাহিকো তোগাওয়ার উপস্থিতিতে ভাবনগর সাধুসঙ্গের সাধকশিল্পীর চর্যাপদের সৃষ্টিভূমি সোমপুর বৌদ্ধ মহাবিহারের প্রায় ১০০০ বছর পর চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করে। তারই ফলস্বরূপে সেখানে শতাধিক বাউল-সাধকেরা চর্যা চর্চা কেন্দ্র গড়ে তুলেছে।
২০১৬ ও ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দে ২১ মে বুদ্ধপূর্ণিমায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ও বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের ভাবনগর সাধুসঙ্গের সাধকশিল্পীরা জাতীয় পর্যায়ে চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণের পূর্ণাঙ্গ অনুষ্ঠান করেছেন। বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় ভাবসাধকদের চর্যাপদের পুনর্জাগরণ কেন্দ্র গড়ে উঠেছে।
এর মধ্যে ‘ভাবনগর সাধুসঙ্গ পাহাড়র বৌদ্ধবিহার চর্যা চর্চা কেন্দ্রে’র পাশাপাশি পাবনা জেলার ‘ফকির আবুল হাশেম চর্যা চর্চা ও গবেষণা কেন্দ্র’, কুমিল্লার ‘বাউল তাহমিনা চর্যা চর্চা কেন্দ্র’, কিশোরগঞ্জের ‘মুন্সী আহমদ চিশতি চর্যা চর্চা কেন্দ্র’, চুয়াডাঙ্গার একুশে পদকপ্রাপ্ত সাধকশিল্পী খোদাবক্স সাঁই নিকেতনের ‘আব্দুল লতিফ শাহ চর্যা চর্চা কেন্দ্র’, ঝিনাইদহ জেলার ‘লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণ: চর্যাপদের চর্চা কেন্দ্র’, মানিকগঞ্জের ‘শ্যামপুর ভাবনগর সাধুসঙ্গ চর্যা চর্চা কেন্দ্র’ প্রভৃতি প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এই সকল কেন্দ্রের সহস্রাধিক সাধকশিল্পী নিয়মিতভাবে চর্যাপদের ৫০টি পদ রাগ-রাগিণীর আশ্রয়ে ও লোকায়ত আঙ্গিকে পরিবেশন করে থাকেন। সাধকশিল্পীরা চর্যাপদের গান পরিবেশনে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আদি চর্যাপদের সমকালীন বাংলায় রূপান্তরিত গীতবাণীকে ব্যবহার করেন। তবে, ক্ষেত্রবিশেষে তাঁরা আদি বাংলা ভাষার চর্যাপদ ও সমকালীন বাংলার মিশ্রণ করে থাকেন। কোনো কোনো সাধকশিল্পী অবশ্য আদি বাংলাতেও চর্যাপদের গান পরিবেশন করেন।
বাংলাদেশের ভাবসাধকদের চর্যাপদের গানের এই পুনর্জাগরণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপাক আগ্রহ সঞ্চার করেছে। যার প্রমাণ পাওয়া যায়, ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ভাবসাধকদের চর্যাপদের পুনর্জাগরণ নিয়ে আলোচনা করেন তৎকালীন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এমপি। বাংলা একাডেমি ফোকলোর পত্রিকায় ভাবসাধকদের চর্যাগানের পুনর্জাগরণ নিয়ে সংগীততাত্ত্বিক অধ্যাপক করুণাময় গোস্বামীর প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া, আমেরিকা, ইতালি, জার্মানি, জাপান, ইংল্যান্ড, হাঙ্গেরি, চেক রিপাবলিক, পোল্যান্ড, চীন প্রভৃতি বহু দেশের গবেষক এখন ভাবনগর সাধুসঙ্গের চর্যাপদের গানের পুনর্জাগরণ নিয়ে গবেষণা করছেন।

লেখক, গবেষকও প্রাবন্ধিক