নতুন ধরন ভয়ংকর

অনলাইন ডেস্কঃ
দেশে শনাক্ত হওয়া করোনাভাইরাসের যুক্তরাজ্য ও দক্ষিণ আফ্রিকীয় ধরন (স্ট্রেইন) ভয় জাগাচ্ছে। দুটি ধরনই ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়ছে বাংলাদেশে। এর মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার ধরনটি ছড়িয়েছে সবচেয়ে বেশি। করোনা আগের ধরনের তুলনায় নতুন ধরনের সংক্রমণ ক্ষমতা ৩০ থেকে ৭০ শতাংশ বেশি। সংক্রমণ ও মৃত্যুর পরিসংখ্যানে এর প্রমাণ মিলেছে।

গত বছরের জুন-জুলাই মাসে করোনার সর্বোচ্চ সংক্রমণের সময়ের তুলনায় এখন এক দিনে দ্বিগুণেরও বেশি মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন; মারা যাচ্ছেন। গত আট দিনে করোনায় ৫৪ হাজার ৩৪৩ জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং ৫০৬ জন মারা গেছেন। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সব রেকর্ড এরই মধ্যে ভেঙে গেছে। গত চব্বিশ ঘণ্টায় করোনায় ৭৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এক দিনে এটিই সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা। এর আগে ৮ এপ্রিল ৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

অধিক শক্তিশালী যুক্তরাজ্য ও দক্ষিণ আফ্রিকার নতুন ধরন ছড়িয়ে পড়ায় সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ছে বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের অভিমত, করোনাভাইরাসের নানা ধরনের মধ্যে যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলিয়ান ধরনের সংক্রমণের হার বেশি এবং জিনগত পরিবর্তনও ঘটে বেশি। বাংলাদেশেও ওই ধরনের কারণেই সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ছে। এই নতুন ধরনের বিরুদ্ধে টিকার কার্যকারিতা নিয়েও সংশয় রয়েছে।

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) বলছে, দেশে শনাক্ত হওয়া করোনাভাইরাসের মধ্যে ৮১ শতাংই আফ্রিকার ধরন। করোনাভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের প্ল্যাটফর্ম নেক্সটস্ট্রেইন জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যে শনাক্ত হওয়া করোনার নতুন ধরন বি.১.১.৭ প্রথম পাওয়া যায় গত বছরের ডিসেম্বরে। বর্তমানে আরও আটটি নমুনায় এর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। আর দক্ষিণ আফ্রিকীয় ধরন বি.১.৩৫১ বাংলাদেশে শনাক্ত হয় গত ২৪ জানুয়ারি।

আইসিডিডিআর,বির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ৬ জানুয়ারি প্রথম যুক্তরাজ্যের ধরন শনাক্ত হয়। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত এ ধরনটি বাংলাদেশে বৃদ্ধি পায়। তবে মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে দেখা যায়, দক্ষিণ আফ্রিকার ধরনটি সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

আইসিডিডিআর,বি জানায়, দক্ষিণ আফ্রিকার ধরন বাংলাদেশে নাটকীয় পরিবর্তন আনে। মার্চের চতুর্থ সপ্তাহেই দেখা যায়, দেশে শনাক্ত করোনাভাইরাসের ধরনগুলোর মধ্যে ৮১ শতাংশই দক্ষিণ আফ্রিকার।

এজন্য এখন টিকার কার্যকারিতা এবং রোগী ব্যবস্থাপনার দিকটি নতুন করে ভাবতে হবে বলে মনে করে আইসিডিডিআর,বি। করোনার নতুন ধরন নিয়ে জিনোম সিকোয়েন্সিং করা চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সমীর কুমার সাহা সমকালকে বলেন, যুক্তরাজ্য ও দক্ষিণ আফ্রিকার ধরনের উপস্থিতি উদ্বেগজনক। কারণ নতুন এই ধরনের সংক্রমণ ক্ষমতা অনেক বেশি। অতিদ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বেশি মানুষ আক্রান্ত ও মৃত্যুবরণ করতে পারে। সুতরাং এই ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে অতিদ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

তথ্য লুকিয়েছিল স্বাস্থ্য বিভাগ: চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি যুক্তরাজ্যফেরত পাঁচজনের শরীরে সেদেশে শনাক্ত হওয়ার করোনার নতুন ধরন ‘এন৫০১ওয়াই’ শনাক্ত হয়। একই মাসে ঢাকা ও সিলেটে আরও পাঁচজনের নমুনায় এ ভাইরাস শনাক্ত হয়। তাদের সবাইকে আইসোলেশনে রাখা হয় এবং সবাই সুস্থও হয়ে ওঠেন। কিন্তু স্বাস্থ্য বিভাগ এই নতুন ধরন সম্পর্কে কাউকে জানায়নি।

তবে ১০ মার্চ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে এক নির্দেশনায় যুক্তরাজ্যফেরত যাত্রীদের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বলা হয়। এটি জারির পরই যুক্তরাজ্যের ধরন বাংলাদেশে শনাক্ত হওয়ার তথ্য প্রকাশ্যে আসে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ সমকালকে বলেন, সংক্রামক রোগের তথ্য লুকানো এক ধরনের অপরাধ। শুরু থেকে সবাইকে সচেতন করলে পরিস্থিতি অন্যরকম হতে পারত। আবার যখন রোগী শনাক্ত হলো, তখন কন্টাক্ট ট্রেসিং জরুরি ছিল। কিন্তু সেটি করা হয়নি। এতে করে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। এখন মারাত্মক আকার ধারণ করছে।

টিকার কার্যকারিতা কমতে পারে: আন্তর্জাতিক একাধিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে করোনার এই নতুন ধরনের বিরুদ্ধে টিকার কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, নতুন ধরনটি আগেরটির তুলনায় বেশি সংক্রামক। টিকা গ্রহণের পর অ্যান্টিবডি তৈরি হলেও ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে এবং আগে আক্রান্ত হয়েছেন- এমন ব্যক্তি আবারও আক্রান্ত হচ্ছেন।

সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফাইজারের টিকা যুক্তরাজ্যের নতুন ধরনের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, তা কাজ করছে। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার ধরনের ওপর চালানো এক পরীক্ষায় দেখা গেছে, ফাইজারের টিকার কার্যকারিতা ৬ থেকে ১০ শতাংশ কমে যায়। তবে নোভাভ্যাক্স কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি তৃতীয় ট্রায়ালে তাদের টিকা ৮৯ শতাংশ কার্যকর বলে দাবি করেছে। এই টিকাটি যুক্তরাজ্যের নতুন ধরনের ওপর ৮৬ শতাংশ এবং দক্ষিণ আফ্রিকার ধরনের ওপর ৬০ শতাংশ কার্যকর। একইভাবে জনসন অ্যান্ড জনসনের টিকার কার্যকারিতা সার্বিকভাবে ৬৬ শতাংশ। দক্ষিণ আফ্রিকার ধরনের ওপর এর কার্যকারিতা ৫৭ শতাংশ।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা করোনার সংক্রমণ কমাতে কার্যকর ফল দিয়েছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণার বরাত দিয়ে দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী ম্যাট হ্যানকক বিবিসিকে এ তথ্য জানান। তবে ওই গবেষণায় নতুন ধরনের ওপর টিকার কার্যকারিতার বিষয়ে কিছু উল্লেখ করা হয়নি।

সতর্কতার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, করোনাভাইরাসের আগের ধরনের তুলনায় নতুন ধরনগুলো ৩০ থেকে ৭০ শতাংশ বেশি সংক্রামক বলে আন্তর্জাতিক একাধিক গবেষণায় বলা হয়েছে। এর প্রমাণ এখন পাওয়া যাচ্ছে। জানুয়ারি মাসের শুরুতে শনাক্ত হওয়া এই ভাইরাস দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। এখন দ্রুতগতিতে সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ছে। আক্রান্ত ব্যক্তিদের দ্রুত হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন পড়ছে। সুতরাং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে সর্বাত্মক লকডাউন এবং যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ ও মাস্ক ব্যবহারের ওপর জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে।

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ সমকালকে বলেন, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে দেখা যায়, নতুন ধরনে আক্রান্ত মানুষের ফুসফুস মারাত্মক সংক্রমিত হচ্ছে। আবার কারও অনবরত পাতলা পায়খানা হচ্ছে। মৃত্যু হওয়া রোগীদের অধিকাংশের ফুসফুসের সংক্রমণ ছিল মারাত্মক। অক্সিজেন স্যাচুরেশন অত্যন্ত নিচে নেমে গিয়েছিল। সঙ্গে ছিল মারাত্মক শ্বাসকষ্ট। অনেকের ফুসফুসের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এ ধরনের রোগীদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি। সুতরাং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। মাস্ক বাধ্যতামূলকভাবে পরতে হবে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে কার্যকর লকডাউন দেওয়া প্রয়োজন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সমকালকে বলেন, গত ৫ এপ্রিল থেকে বিধিনিষেধ আরোপ করে যে নির্দেশনা জারি করা হয়েছিল, মানুষ তা মানতে চাইছে না। দোকানপাট খুলে দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন হয়েছে। পরিবহন শ্রমিকরা বাস চালাতে চায়। পরে বাস চালু করা হয় এবং দোকানপাট ও শপিংমল খুলে দেওয়া হয়। কিন্তু আগামী ১৪ এপ্রিল থেকে কঠোর লকডাউন আসছে। এবার জরুরি সেবা ছাড়া সবকিছু বন্ধ থাকবে। প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘরের বাইরে বের হতে পারবে না। কারণ, সংক্রমণ যে হারে বাড়ছে, তাতে এই পদক্ষেপ ছাড়া পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না।

সূত্রঃ সমকাল