ইতিহাস রচয়িতা প্রথিতযশা সাংবাদিক আব্দুল কুদ্দুস রানার জন্মদিন

হাফিজুল ইসলাম চৌধুরী:
টেকনাফের মাথিনের কুপ থেকে তিনি তুলে এনেছেন অমর প্রেম কাহিনী। গহীন পাহাড়ের উপরে উঠে আবিষ্কার করেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার বৃটিশ বাংকার। কুদুম গূহায় ঢুকে স্মৃতি হাতড়ান কানা রাজার। রহস্য উন্মোচন করতে ঢুকে পড়েন আলীর সূড়ঙ্গে। অল্প জনের জানা সে কথা- হাজার জনে ছড়ান যিনি, কখনও গিয়ে পৌঁছান বাঁকখালী নদীর উৎসস্থলে। কখনও ছুটে যান ঈদগড়ের আকাশ নামে বৃক্ষের কাছে। আকাশে ডলফিন, হাঙ্গর, অজগর উড়িয়ে যেমন হাসান, তেমনি কাঁদান সাগর কন্যার মৃত্যুর খবর দিয়ে।
বলছিলাম প্রথম আলোর কক্সবাজার আঞ্চলিক কার্যালয় প্রধান সাংবাদিক আবদুল কুদ্দুস রানার কথা। ৮ এপ্রিল মহৎ এই সাংবাদিকের জন্মদিন।

গ্রাম-বাংলা ঘুরে, রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে কঠোর পরিশ্রম করে আব্দুল কুদ্দুস রানা সংবাদ সংগ্রহ করেন। তাঁর প্রতিবেদন তৈরিতে সংযোজন হয় ভিন্ন মাত্রা। সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে জনমত সৃষ্টি ও সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে প্রয়াসী থাকেন তিনি। দৈনিক কক্সবাজার পত্রিকার সাহিত্য পাতা ‘ঝিকিমিকি’ থেকে লেখালেখি শুরু করেন আব্দুল কুদ্দুস রানা।

১৯৬৮ সালের ৮ এপ্রিল টেকনাফের শাহপরীরদ্বীপ বাজার পাড়ায় জন্ম নেয়া আব্দুল কুদ্দুস রানা সাংবাদিকতায় আসেন ১৯৮৪ সালে। তখন তিনি ছিলেন সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। প্রথম পত্রিকা সাপ্তাহিক স্বদেশ বাণী। পরবর্তীতে আজাদী, আজকের কাগজ, ভোরের কাগজ হয়ে ১৯৯৮ সালে প্রথম আলোতে যোগ দেন। প্রথম আলো প্রতিষ্ঠার ২০ বছরে ৬ বার সেরা প্রতিনিধি মনোনীত হয়েছেন তিনি। কাজ করে যাচ্ছেন ইতিবাচক সমাজ নির্মাণে।

লেখক হিসাবেও অনেক সুখ্যাতি রয়েছে সাংবাদিক আব্দুল কুদ্দুস রানার। ইতোমধ্যে তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘মক্কা মদিনার পথে’ বাজারে এসেছে।

জন্মদিন উপলক্ষে সাংবাদিক আব্দুল কুদ্দুস রানা নিজের ফেসবুকে ‘জন্মদিনে জীবনের গল্প….’ শিরোনামে একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাস দিয়েছেন।

পাঠকদের জন্য সেটা হুবুহু তোলে ধরা হলো:
ফেসবুকে ইন করলে চোখে পড়ে কারো না কারো জন্মদিন। যে যেভাবে ইচ্ছা প্রিয়জনদের উইস করছেন, জানাচ্ছেন অভিনন্দন। আমার ক্ষেত্রেও তাই হচ্ছে। আজ ৮ এপ্রিল আমার জন্মদিবস।

জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানিয়ে, স্মৃতিকথা তুলে ধরে ফেসবুক, মেসেঞ্জার, গ্রুপ, ইনবক্স ভরিয়ে দিচ্ছেন যাঁরা, পছন্দের উপহার সামগ্রী পাঠিয়েছেন প্রিয়জনেরা, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসা এবং অভিনন্দন।

নিজের জন্মদিন নিয়ে কখনোই লিখা হয়নি, নিজের জীবন সম্পর্কেও। পেশা যেহেতু সাংবাদিকতা, মানুষের জীবন কাহিনী শুনতে শুনতে আর লিখতে লিখতে পৌঁছেগেছি মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে। আজ নাহয় নিজের জীবন থেকে কিছুটা চর্চা হোক।

‘জন্মদিন’ মানে কী- সবার জানা বিষয় । তাহলে জন্মদিন পালন করা কি খুব জরুরি ? ‘জন্মদিন’ মানে কারো কাছে মৃত্যুর দিকে আরও একটা বছর এগিয়ে যাওয়া।

আমার কাছে তার উল্টোটা। জন্মদিন মানে মৃত্যুর কবল থেকে আরও একটা বছর বেঁচে যাওয়া। সবার সঙ্গে ভালো-মন্দে আরও একটা বছর কাটিয়ে দেওয়া। কারণ মৃত্যু কখন এবং কীভাবে কাকে যে আলিঙ্গন করে-কেউ টের পায়না। একারণে আমি সবসময় প্রস্তুত থাকি মৃত্যুর জন্য। জন্মের দায় যদি মৃত্যু দিয়ে শোধ করতে হয়, তাহলে সে জীবন মূল্যহীন।

মানুষ বাঁচে মানুষের দোয়ায়, স্নেহ-ভালোবাসায়। মানুষের মন জয় করে মরতে না পারলে সেজীবন মুল্যহীন। মৃত্যুর সময় কিছু চোখ থেকে যদি ভালোবাসার অশ্রু ঝরাতে না পারেন, তাহলে পৃথিবীতে এসে লাভ কী ?

আমার জীবনটা কীভাবে যাচ্ছে, সেটা উপলদ্ধি করার সুযোগ হয়নি কখনোই। তবে এটা উপলদ্ধি করি, ব্যস্ততার মধ্যেও দিনের কিছু মুহুর্ত কাটছে সুন্দরের সাথে, কিছু সময় কাটছে অন্ধকার-কালোর সাথে। এটাই তো জীবন। সুখ আর কষ্ট মিলেই তো জীবন !

আমার পেশাটাও ( সাংবাদিকতা) এমন যে সবসময় সুন্দর এবং কালোর সঙ্গে থাকতে হয়। সমাজের যত কালো-কুৎসিত; তার বিরুদ্ধে আমার লেখালেখির সংগ্রাম দীর্ঘজীবনের। বাকী জীবনটাও হয়তো কালো-কুৎসিতের বিরুদ্ধে লড়ে যেতে হবে। আর বাঁচতে চাই সুন্দরকে নিয়ে। সুন্দর মানুষগুলোর ভালোবাসা, সহযোগীতা, পরামর্শ নিয়েই এগোতে চাই আরও কিছু দূর।

৮ এপ্রিল আমার জন্মদিবস। কয়েক ঘন্টা আগে আমার ৪, ৯৫৫ জন ফেসবুক বন্ধু এবং ৮, ২৪০ জন ফলোয়াড় জেনে গেলেন খবরটা। এরপর জন্মদিনের শুভেচ্ছা, স্মৃতিকথা তুলে ধরে চলছে আপনজনদের লেখালেখি, কেউ কেউ হয়তো করতে পারেন সমালোচনাও। এটা স্বাভাবিক। দোষে-গুনেই তো মানুষ।

জন্মদিন পালন নিয়ে আমার তেমন আগ্রহ নেই, নেই উৎসাহও । কিন্তু অন্যের জন্মদিনগুলো আমি সুন্দরভাবেই উপভোগ করি। কক্সবাজার প্রেসক্লাবে একটা রেওয়াজ চালু হয়েছে-সাংবাদিকদের কারো জন্মদিন পড়লে কেক কেটে মহাধুমধামে তা পালন করা। গত এক মাসে এরকম পাঁচ-ছয় জন সাংবাদিকের জন্মদিন পালিত হলো।

কিছুদিন আগে প্রেসক্লাবে জন্মদিন আয়োজনের প্রধান সমন্বয়ক সাংবাদিক নুপা আলম আমাকে স্মরণ করে দিয়ে বললো-ভাইয়া, ৮ এপ্রিল আপনার জন্মদিন প্রেসক্লাবেই হচ্ছে। সুতরাং এবার অন্তত এদিক-ওদিক পালানোর চেষ্টা করবেন না।
প্রথম আলো বন্ধুসভার সদস্যদের কারো জন্মদিন পড়লে আমরা সবাই মিলে মহা আয়োজনে তা পালন করি, হয় যার জন্মদিন তার বাসাবাড়িতে-পরিবারের সবাইকে নিয়ে, নয়তো ভালো কোনো রেস্তোরায়।

বন্ধুসভার সিটি কলেজ সভাপতি মোহাম্মদ আবদুল্লাহ সপ্তাহ-দেড়েক ধরে আমার জন্মদিনের ক্ষণগণনা শুরু করে দিয়েছে-কখন আসবে ৮ এপ্রিল। সেদিন সবাই ( বন্ধুসভার সদস্যরা) মিলে জন্মদিনটা পালন করবে। প্রেসক্লাব এবং বন্ধুসভার জন্মদিন পালন নিয়ে অনেকটা বিপদে ছিলাম, শ্যাম রাখি না কুল রাখি অবস্থা।

শেষ পর্যন্ত এবারও রক্ষা পেলাম, জন্মদিন আর পালন হচ্ছেনা। কারণ সাত দিনের লকডাউন। স্বাস্থ্যবিধি মানতে হলে জন্মদিন পালন কি করে সম্ভব ? তাছাড়া জীবনতো আর শেষ হয়ে যাচ্ছে না। আপাতত আমরা সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখেই চলি। জীবনটাই তো আসল।

তাহলে জীবনের সংজ্ঞা কী ? জীবন সম্পর্কে আলবার্ট কেমুস-এর উক্তিটি কমবেশি সবাই মানেন। সেটি হচ্ছে-‘ জীবনের মানে কী-এটি খুঁজলে আপনি বেঁচে থাকতেই পারবেন না’।
তাহলে উপায় ?

আরেক দার্শনিক রেইমন্ড ই ফিস্ট সিলভার থোর্ণ বলেছেন, ‘ জীবন মানে সমস্যা, বেঁচে থাকা মানে সমস্যার সমাধান করা’।

আসলে ‘জীবন’ হচ্ছে নিছক একটা পরীক্ষা। শরীরে যতদিন প্রাণ থাকবে ততদিন জীবনের পরীক্ষা দিয়েই চলতে হবে মানুষকে। অ্যান্ড্র কিশোরের একটা হৃদয় বিদারক গান বাজে মানুষের মুখে মুখে; সেটি হচ্ছে-‘ জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প।

জীবনের গল্প বা সংজ্ঞা একেক জনের কাছে একেক রকম। জীবন কারো কাছে আনন্দের, কারো কাছে কষ্টের। জীবন একটা বৃত্তাকার কেন্দ্র। আমরা বৃত্তের মাঝে অবস্থান করছি, আর যে যার অবস্থান থেকে জীবনকে উপভোগ করেই চলেছি।
ষাট বছর বয়সী প্রখ্যাত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমামের কাছেও জীবন অনেক সুন্দর। বেঁচে থাকাটা আরও সুন্দর। বেঁচে থাকার চেয়ে সুন্দর আর কিছু হতে পারে না। মানুষের বয়স বাড়ে, মানুষ বুড়ো হয়, কিন্তু, মন কখনো বুড়ো হয় না।

জীবনের মুল্য অনেক। সেটা যেজন উপলদ্ধি করতে পারেন; তাদের পক্ষে কঠিনকে জয় করা অতিসহজ। একজনের উৎসাহ আর অনপ্রেরণাই পারে মানুষের জীবনকে বদলে দিতে, সুন্দর করতে, সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। সময়ই জীবনকে বদলে দেয়। যে জীবনে সময়ে মুল্য নেই, সে জীবন বৃথা, দুঃখ-কষ্টে ভরা।

পছন্দ না হলে আমি কোনো কাজেই শান্তি পাইনা, আসে না তৃপ্তি। মানুষকে ভালোবাসার অসীম ক্ষমতা নিয়েই মানুষ জন্ম নেয় পৃথিবীতে। কিন্তু অনেকের সে ক্ষমতা কাজে লাগানোর সুযোগ হয়না। আমার ৩৩ বছরের দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবন, পাশাপাশি সামাজিক সংস্কৃতিক এবং মানবিক কর্মকান্ডে যুক্ত থাকার সুবাধে ‘মানুষকে ভালোবাসার’ সেই সুযোগটা রপ্ত করেই চলেছি। ছোট বড় সবার স্নেহ-মমতা ভালোবাসায় সিক্ত আমার সাধারণ জীবন। যে জীবনে হিংসা-বিদ্বেষ,পরনিন্দা, পরশ্রীকাতরা স্পর্শ করেনি। সৎভাবে জীবন-যাপনের চেষ্টা করে চলেছি। ছোট বড় সকল শ্রেণিপেশার মানুষের কাছে সবসময় ছোট হয়েই চলার চেষ্টা করি। বাকী জীবনটাও এভাবে চলতে চাই, সুন্দরের পথে জীবনটা বিকোতে চাই-আজকের এই জন্মদিনে এটাই আমার অঙ্গীকার।

🌺❤️সবাইকে জন্মদিনে শুভেচ্ছা, ভালোবাসা।
✔️আসুন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলি, করোনামুক্ত জীবন গড়ি। দূর থেকে পাশে থাকি।

আব্দুল কুদ্দুস রানা
৮ এপ্রিল-২০২১