ফের লকডাউনে বাংলাদেশ

অনলাইন ডেস্কঃ
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা সাত হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার পরদিন গতকাল সোমবার থেকে সাত দিনের ‘লকডাউন’ শুরু হয়েছে বাংলাদেশে। এর মাধ্যমে একগুচ্ছ বিধিনিষেধের বেড়াজালে সংক্রমণ বিস্তার রোধের চেষ্টা সরকারের।

অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে প্রায় এক বছর পর আবার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রণের পথে যেতে হলো সরকারকে।

দেশজুড়ে ‘লকডাউন’ দিয়ে সবার মধ্যে যোগাযোগ সীমিত করে এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বাধ্যবাধ্যকতা তৈরি করে সোমবার সকাল থেকে অনেক কিছুই করা যাবে না, মানতে হবে বেশ কিছু ‘অপ্রিয়’ নিয়মও।

লক্ষ্য সাত দিনেই সংক্রমণ কমিয়ে আবার নিয়মিত কার্যক্রমে ফেরা। গত বছর সংক্রমণ কমাতে ঘোষণা করা হয়েছিল সাধারণ ছুটি, যেটির কয়েক দফা মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল।

মহামারীকালে দীর্ঘ সময় ধরে সংক্রমণের হার কম থাকায় সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে ছন্দ ফিরতে শুরু করে। তবে সর্বক্ষেত্রে গতি পাওয়ার এ সময়টাতে স্বাস্থ্যবিধি ও সুরক্ষায় ঢিলেঢালা হতেই মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে সংক্রমণ বাড়তে থাকে।

অব্যাহত ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণের এ ধারা সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত শনিবার লকডাউনের ঘোষণা দেয় সরকার, যা সোমবার সকাল থেকে শুরু হবে।

রোববার এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সরকার এ সময়ে কী করা যাবে আর কী করা যাবে না তা সুষ্পষ্ট করে।

সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করে এরপর বিভিন্ন ঘোষণা আসতে থাকে। ব্যাংক ও পুঁজিবাজারে লেনদেন সময় কমানো হয়। অন্যান্য ক্ষেত্রেও নতুন সিদ্ধান্ত আসতে থাকে।

গণপরিবহন চলাচল বন্ধের পাশাপাশি বাজার-মার্কেট, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপের নির্দেশনার কথা জানানো হয় প্রজ্ঞাপনে।

এরপরই অনেকে ঢাকা ছাড়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। বাস, ট্রেন ও লঞ্চ টার্মনালগুলোতে যাত্রীদের ভিড় ছিল ঈদের ছুটির সময়ের মতো। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব, স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষিতও ছিল।

দেশে গত বছর সংক্রমণ ধরা পড়লে ২৩ মার্চ প্রথমবার সাধারণ ছুটির ঘোষণা দিয়েছিল সরকার। ওই সময় সব অফিস আদালত, কল-কারখানা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে সারা দেশে সব ধরনের যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। ছুটির মধ্যে সব কিছু বন্ধ থাকার সেই পরিস্থিতি ‘লকডাউন’ হিসেবে পরিচিতি পায়।

এর আগে দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ নিশ্চিতের পর গত বছরের মার্চের শুরুতে রাজধানীর মিরপুরের টোলারবাগ এলাকা প্রথম ‘লকডাউন’ করা হয়েছিল।

সাধারণ ছুটির পরেও এলাকাভিত্তিক লকডাউনের অংশ হিসেবে দুই থেকে তিন সপ্তাহ অবরুদ্ধ রাখা হয়েছিল ঢাকার রাজাবাজার ও ওয়ারীসহ কয়েকটি এলাকা।

চলতি বছরে আবার মার্চের শেষ থেকে প্রতিদিন সংক্রমণে রেকর্ড হতে থাকায় শনিবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এক সপ্তাহের লকডাউন আসছে বলে ঘোষণা দেন।

এরপর রোববার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে লকডাউন বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতে বলা হয়েছে, ৫ এপ্রিল ভোর ৬টা থেকে ১১ এপ্রিল রাত ১২টা পর্যন্ত এসব নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে।

মহামারী পরিস্থিতি পর্যালোচনায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় গত ২৯ মার্চ যে ১৮ দফা নির্দেশনা দিয়েছিল, সেটির আলোকে এসব নির্দেশনা দেওয়ার কথা জানানো হয়।

এরমধ্যে সন্ধ্যা ৬টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে যেতে নিষেধ করা হয়েছে।

কাঁচাবাজার এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত উন্মুক্ত স্থানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কেনাবেচা করতে বলা হয়েছে।

সংক্রমণের পরবর্তী পরিস্থিতি ও লকডাউন কোন দিকে মোড় নেয় তা ভাবনা রেখেই শনিবার থেকে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ ঢাকা ছাড়তে শুরু করেন।

রোববার টার্মিনালগুলোয় বাড়িফেরা মানুষের ভিড় আরও বাড়ে। গাড়ির চাপ বেড়ে যাওয়ায় রাজধানীর প্রবেশ এবং বের হওয়ার সবগুলো পথে দিনভর যানজট ছিল। গাড়ির জট ছিল মধ্য রাতেও।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে স্বাস্থ্যবিধি না মেনে হাজারো মানুষের ভিড় করে বাড়ি যাওয়ায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে।

ঘরমুখো মানুষের ভিড় কেমন ছিল তা সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কালামের কথায় কিছুটা বোঝা যায়।

রোববার সন্ধ্যায় আবুল কালাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মনে হচ্ছে টার্মিনালে যাত্রীদের ভিড় ঈদের সময়ের চেয়ে বেশি।”

তিনি বলেন, রোববার ঢাকার বাইরে যেমন মানুষ যাচ্ছে তেমনি বিভিন্ন জেলা থেকে বাসে করে ঢাকামুখী মানুষেরও ভিড় রয়েছে।

ঢাকা ছেড়ে যাওয়া যাত্রীরা বলছেন, লকডাউনের সময় অফিস আদালত বন্ধ থাকবে। কর্মহীন অবস্থায় ঢাকায় বসে থাকার চেয়ে বাড়ি চলে যাওয়াকেই ভালো।

রামপুরার একটি রেস্টুরেন্টের কর্মী আলাউদ্দিন বলেন, লকডাউনের সময় হোটেল বন্ধ থাকবে। তাই তিনি বাড়ি চলে যাচ্ছেন। সেখানে অন্তত খাওয়ার কষ্ট থাকবে না।

যাত্রীদের ভিড়ের কারণে স্বাস্থ্যবিধি মানা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন মহাখালী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কালাম। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, বাস টার্মিনাল থেকে বাসের অর্ধেক আসন ফাঁকা রাখলেও পরে তা মানা যাচ্ছে না।

“যাত্রীরা জোর করে উঠে পড়ছে। অনেক জায়গায় যাত্রী না তোলায় স্টাফদের চড়-থাপ্পড় দেওয়ার ঘটনাও শুনেছি।”

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ডা. বে-নজির আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সাতদিনের লকডাউন দিলেও তা আরও বাড়তে পারে-মানুষের এমন সংশয় আছে। এ কারণে মানুষের গ্রামে ফিরে যাওয়াটা অস্বাভাবিক না। ঢাকার উচ্চবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত মানুষ শহর ছাড়বে না। নিম্নবিত্ত, নিম্নবিত্তরাই ঢাকা ছাড়ছে।

তিনি বলেন, মহামারীর মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান, বইমেলা, বিজিএমইএর নির্বাচন, হেফাজতের আন্দোলন, মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় নানা অনুষ্ঠান হয়েছে। সেখানে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ আশা করা যায় না।

“সরকার যদি এরকম ভুল করতে পারে। তাহলে একজন অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত মানুষের কাছ থেকে অনেক সুচিন্তিত ন্যায্য আচরণ আমরা কিভাবে আশা করি।”

গত বছরের ৮ মার্চ দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ে। এ রোগে রোববার পর্যন্ত ৬ লাখ ৩৭ হাজার ৩৬৪ জন আক্রান্ত হয়েছে। মারা গেছেন ৯ হাজার ২৬৬ জনের।

মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে সংক্রমণের মাত্রা অনেক বাড়তে থাকে। ২৩ মার্চ তা সাড়ে তিন হাজার ছাড়িয়ে যায়। এরপর ২৯ মার্চ থেকে টানা তিনদিন দৈনিক শনাক্ত ৫ হাজারের বেশি থাকে। ১ এপ্রিল ৬ হাজারের ঘর ছাড়ায়।

রোববার রেকর্ড ৭ হাজার ৮৭ জনের করোনাভাইরাস ধরা পড়েছে। এদিন মারা গেছে ৫৩ জন।

সূত্রঃ বিডিনিউজ