তারুণ্যের চোখে শেখ মুজিব: ইতিহাস কথা বলে চিরদিন

রুবেল বড়ুয়া:
ইতিহাস কথাটি শুধু অতীতের ঘটনার পারস্পরিক বর্ণনা নয়; বরং এটি হলো একটি দেশের অধিবাসীদের দীর্ঘকালীন সংগ্রাম, প্রচেষ্টা ও পরিবর্তনের কালানুক্রমিক বর্ণনা। ইতিহাস কখনো গৌরবের হয়, কখনো বিয়োগব্যথা শোকের মাতমের।

বাঙালির ইতিহাস নিত্যনতুন সংগ্রামের ইতিহাস, রক্তরঞ্জিত ইতিহাস। সময়ের নীরব সাক্ষী হিসেবে যুগ যুগ ধরে দাড়িঁয়ে আছে বাঙালির ইতিহাস।ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষনের ঝড় প্রতিনিয়ত বাঙালির উপর বয়ে গেছে ক্রমবর্ধমান।

ঔপনিবেশ শোষণ ও শাসনের পরিধি থেকে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ইতি টানে।বাঙালি জাতি স্বাধীনতার মহানায়কের হাত ধরে সোনার বাংলা পুন:ঘটনের হাত দেয়।যুদ্ধ কবলিত দেশকে পুনরায় চাঙ্গা করতে কাজ শুরু করেন।তখনি বাঙালি জাতির উপর পুনরায় নেমে আসে কালোছায়া।হায়েনারা আক্রমণ করে মুজিব পরিবারের উপর।

হ্যাঁ, আমি সেই মুজিবের কথা বলছি, যাঁকে বাস্তবে কোনদিন দেখিনি।তবে মনে ধারণ করেছি, চিরদিন। মন মন্দিরে লালন করেছি ছোটকাল থেকে।যাঁর চোখের বড় ফ্রেমের চশমা দিয়ে সমগ্র বাঙালি জাতিকে দেখেছে সমান চোখে। দেখেছেন, শোষিত মানুষকে মুক্ত করার স্বপ্ন।কিন্তু মীর জাফরের দল সেই লুক্কায়িত স্বপ্নকে বাস্তবে রুপান্তর করতে বেশি সময় দেয়নি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেই স্বপ্নকে বুলেটের বিস্ফারণে ধূলিসাৎ করে দেয়। ১৯৭৫ সালের এই দিনে তার দলের লুকিয়ে থাকা ষড়যন্ত্রকারী বিপদগামী সেনাবাহিনীর একটি অংশের মাধ্যমে তাঁকে সপরিবারের হত্যা করে। এবং আওয়ামী লীগেরই ওই অংশ নাটের গুরু খোন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্ব সরকার গঠন করে।

2015-08-14__108964

বঙ্গবন্ধু কোনো সাধারণ মানুষ ছিলেননা। তিনি ইতিহাসের এক অনন্য ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব, বাঙালি জাতির জাতীয় জাগরণের অবিসংবাদিত নেতাও স্বাধীনতার স্থপতি। বঙ্গবন্ধু ব্যতিত ইতিহাসে আর কোনো নেতা তার দেশে এতটা জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন-এমন নজির খুঁজে পাওয়া ভার। বিশেষায়িত অনেক গুণের সমষ্টিই তাকে এ পর্যায়ে নিয়ে আসতে সহায়তা করেছে।

তিনি ছিলেন অত্যন্ত উদার, মানবিক গুণসম্পন্ন, প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী ও পরিশ্রমী একজন মানুষ। নেতা হিসেবে কর্মী-সংগঠকদের সুখে-দুঃখে, আপদে-বিপদে তিনি যেভাবে পাশে দাঁড়াতেন তার তুলনা খুঁজে পাওয়া ভার।

১৯৪৭-৬৬ পর্যন্ত পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ওপর শোষণ, নির্যাতন চালিয়েছে, তারা ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকার কেড়ে নিয়েছে। ’৫৪-এর নির্বাচনের পর বিজয়ী যুক্তফ্রন্টের সরকার নিয়ে ষড়যন্ত্রমূলক খেলা খেলেছে। ’৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক শাসন চাপিয়ে দিয়ে বাঙালি জাতিকে নিষ্পেষিত করেছে। এতে বাংলা ভাষাভাষী এ অঞ্চলের মানুষ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর ওপর প্রচণ্ড বিক্ষুব্ধ।

1425699538

১৯৪৭-৬৬ পর্যন্ত এ ঔপনিবেশিক শাসনের পটভূমিতেই বঙ্গবন্ধু ১৯৬৬ সালে বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এই ৬ দফার পথ ধরেই বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বাতন্ত্র্ জাতিবোধ গড়ে ওঠতে শুরু করে। এর সাথে আরও অনেকের ভূমিকা যুক্ত হয়ে বহু চড়াই-উতরাই, লড়াই-সংগ্রাম ও সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধু হত্যা ছিল সুপরিকল্পিত ও সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত। মূলত এটি ছিল একটি ষড়যন্ত্রমূলক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। ষড়যন্ত্রকারীরা বঙ্গবন্ধু কর্তৃক একটিমাত্র রাজনৈতিক দল গঠনকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত সাময়িক বিভ্রান্তিকর রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নেয়। বস্তুত বঙ্গবন্ধু হলেন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ দু’ পরাশক্তির মধ্যে ‘স্নায়ুযুদ্ধ ‘ (Cold war) জনিত রাজনীতির নির্মম শিকার। এই হত্যাকাণ্ড কেবল একজন বা কয়েকজন ব্যক্তিকেই হত্যা করা ছিল না, এই হত্যাকাণ্ডেরর উদ্দেশ্য ছিল একটি আদর্শকে হত্যা করা।

বঙ্গবন্ধুর হত্যার উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে শুধু সংবিধান থেকে নয়, বাঙালির মন থেকে মুছে ফেলা। কিন্তু ঘাতকদের স্বীয় পরিকল্পনা সফল হয়নি। বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে আজও স্মরণ করে এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বুকে ধারণ করে আজো দেশ এগিয়ে যাচ্ছে এবং অদুর ভবিষ্যতেও এগিয়ে যাবে।যতদিন ইতিহাস থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি ম্লান থাকবে।