কোভিড-১৯: ডায়াবেটিসে ঝুঁকি বেশি, তাই আগে টিকা দেওয়ার তাগিদ

অনলাইন ডেস্কঃ
ডায়াবেটিস রোগীরা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন; আবার সংক্রমণমুক্ত হওয়ার পর তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সময় বেশি লাগছে।

এ অবস্থায় ডায়াবেটিস রোগীদের টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুপারিশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির হিসেবে, দেশের ৮০ লাখের বেশি মানুষ এখন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।

দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ৫ লাখ ৪৮ হাজার জন শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছে ৮ হাজারের বেশি জন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যান্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহজাদা সেলিম স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, এমন রোগীদের প্রায় ৪৬ শতাংশ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।

তিনি জানান, করোনাভাইরাস সংক্রমণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তির পর ডায়াবেটিস নেই, এমন ব্যক্তিরা গড়ে ৮-৯ দিন চিকিৎসা নিয়েছেন। যাদের ডায়াবেটিস আছে, তাদের কারও কারও ১৫ থেকে ১৭ দিন পর্যন্ত হাসপাতালে থাকতে হয়েছে।

ডা. সেলিম বলেন, করোনাভাইরাস থেকে মুক্ত হওয়ার পরও সুস্থ জীবনে ফিরতে দেরি হচ্ছে ডায়াবেটিস আক্রান্তদের।

“পোস্ট কোভিড রিকভারি টাইম নন ডায়াবেটিসের যত দ্রুত হচ্ছে, যাদের ডায়াবেটিস আছে, তাদের ততটা দ্রুত হচ্ছে না। স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে বেশি সময় লাগছে। আগের মতো কাজ করতে পারছে না।”

ডায়াবেটিস রোগীরা করোনাভাইরাস আক্রান্ত হলে কতটা ঝুঁকিতে পড়েন, একটি গবেষণার ফলাফলে তা কিছুটা বোঝা যায়।

দেশে সংক্রমণ শুরুর পর গত বছরের ১ এপ্রিল থেকে ২৪ অগাস্ট পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি হওয়া ১৬৮ জন রোগীর উপর একটি গবেষণা চালানো হয়।

‘ক্লিনিক্যাল কারেক্টারিস্টিকস অ্যান্ড আউটকাম অফ কোভিড-১৯ ইনফেক্টেড ডায়াবেটিক পেশেন্টস অ্যাডমিটেড ইন আইসিইউ’স অব দা সাউদার্ন রিজিওন অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণার জন্য যে ১৬৮ জনকে বাছাই করা হয়েছিল, তার মধ্যে ৮৮ জন ডায়াবেটিস আক্রান্ত ছিলেন, ৮০ জনের ডায়াবেটিস ছিল না।

আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৬৮ জনের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে মোট ৯৫ জনের। ডায়াবেটিস ছিল এমন ৮৮ জনের মধ্যে ৫৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ ডায়াবেটিস রোগীদের শতকরা ৬০ দশমিক ২ জন মারা গেছেন।

আইসিইউতে ছিলেন, কিন্তু ডায়াবেটিস নেই এমন ৮০ জনের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৪২ জনের। শতকরা হারে তা ৫২ দশমিক ৫।

ডায়াবেটিস আক্রান্তদের করোনাভাইরাসের টিকা নেওয়া ‘খুবই জরুরি’ বলে মনে করেন ডা. শাহাজাদা সেলিম।

“কারণ হল, যদি আক্রান্ত হয়ে যায়, তাহলে তাদের ঝুঁকি অনেক বেশি। মৃত্যুর ঝুঁকি, সুস্থ হলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে দেরি হওয়ার ঝুঁকি।”

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খানও মনে করেন, ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের আগে টিকা নেওয়া দরকার।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যার ডায়াবেটিস নাই, তার করোনাভাইরাস হলে যতটা মারাত্মক হবে, যার ডায়াবেটিস আছে, তার করোনাভাইরাস হলে ঝুঁকি অনেক বেশি। সেজন্য ডায়াবেটিস রোগীর তাড়াতাড়ি ভ্যাকসিন নিয়ে নেওয়া উচিত।”

আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং করোনাভাইরাস মহামারী নিয়ন্ত্রণে সরকারকে পরামর্শ দিয়ে আসা বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতা যাদের আছে, তাদের শারীরিক ঝুঁকি বেশি। তাই তাদের আগে টিকা দিতে হবে।

“তারা আক্রান্ত হলে দ্রুত স্বাস্থ্যের অবনতি হতে পারে। কাজেই ঝুঁকি এড়াতে টিকা নিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। টিকা দেওয়ার সময়ও তাদের প্রায়োরিটি দিতে হবে। তারা যেন আগে টিকাটা পায়।”

সরকার দেশের ১৩ কোটি ৮২ লাখ ৪৭ হাজার ৫০৮ জন মানুষকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে। ভারত থেকে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা আসার পর ৭ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়েছে গণটিকাদান।

প্রায় ৩৫ লাখ মানুষকে ইতোমধ্যে টিকা দেওয়া হয়েছে। টিকা নিতে নিবন্ধন করেছেন ৪৫ লাখের বেশি।

টিকার জন্য অগ্রাধিকারের তালিকায় ২১টি শ্রেণিতে ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তিদের নাম নেই।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমএনসিঅ্যান্ডএএইচ অপারেশনাল প্ল্যানের লাইন ডিরেক্টর ডা. শামসুল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, অগ্রাধিকারে না থাকলও টিকা ডায়াবেটিস রোগীরাও পাচ্ছেন।

“৪০ বছরের ওপর যাদের বয়স, তারা সবাই টিকা পাচ্ছেন। এর মধ্যে ডায়াবেটিস আক্রান্তরাও আছেন। এ কারণে অগ্রাধিকার তালিকায় নেই। এছাড়া বিভিন্ন শ্রেণিতে যারা টিকা পাচ্ছেন তাদের মধ্যেও ডায়াবেটিস আক্রান্তরা রয়েছেন।”

ডা. শাহাজাদা সেলিম বলেন, ডায়াবেটিস আক্রান্তদের টিকা নিতে হলে ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। যাদের ব্লাড সুগার বেশি আছে তাদের সুগার কমিয়ে টিকা নিতে প্রস্তুত হতে হবে।

ডায়াবেটিস রোগীদের ঘনঘন পিপাসা পাওয়া, ঘনঘন প্রস্রাব হওয়া, দুর্বল লাগা, মুখ শুকিয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ থাকলে টিকা না দেওয়ার পক্ষপাতি এই চিকিৎসক।

সূত্রঃ বিডিনিউজ