‘সাদায়’ ‘সাদায়’ আর হবে না প্রতিবাদ!

অনলাইন ডেস্কঃ
দুই টুকরো সাদা কাপড়। তাতেই দ্রোহের প্রকাশ। সাধারণত প্রতিবাদের ভাষা ফুটে ওঠে ‘লালে’। সাদায় মেলে শান্তি। সাদা শান্তির প্রতীক। লাল বিপ্লবের। অথচ চিরায়িত এই ধারণা যেন অনেকটাই বদলে গেল ব্যক্তি সৈয়দ আবুল মকসুদের পোশাকে।

সাদায় সাদায় এত তীব্রভাবে প্রতিবাদ করা যায়, তা আর দেখেনি কেউ। শান্তির জন্য প্রতিবাদ। সেই ২০০৩ সালের কথা। ঠুনকো অজুহাতে ইরাকে ইঙ্গো-মার্কিন বিধ্বংসী হামলা। হামলার প্রতিবাদেই পরেছিলেন সেলাইবিহীন দুই টুকরো সাদা কাপড়। প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, ইরাকে মার্কিন দখলদারিত্ব শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাদা কাপড়েই থাকবেন তিনি।

মার্কিন দখলদারিত্ব শেষ হয়নি ইরাক থেকে। সাদা কাপড়ও আর ছাড়া হয়নি আবুল মকসুদের। যে সাদায় এত মিতালি তার, তা আর ছাড়ায় কে! এক সাদা ছেড়ে আরেক সাদায় মোড়ালেন। পরনের সাদা কাপড় রেখে কাফনের সাদা কাপড়েই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন।

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘এত আকস্মিকভাবে মকসুদ ভাইকে হারাতে হবে মানতে পারছি না। বয়সের বিবেচনায় নয়, তার চলে যাওয়া আমাদের কাছে অকাল। অথচ কত কাজ বাকি রয়েছে তার!’

পরিণত বয়সে সৈয়দ আবুল মকসুদকে সরাসরি কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করতে দেখা যায়নি। অথচ প্রগতিশীল দলগুলোর বিশেষ আস্থার জায়গা ছিলেন তিনি। জনবান্ধব সব রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নিজের উপস্থিতি যেন অবধারিত করেছিলেন। ১৯৬৪ সালে সাপ্তাহিক নবযাত্রা দিয়ে সাংবাদিকতা শুরু সৈয়দ আবুল মকসুদের- লেখা-গবেষণা-আলোচনায় সর্বত্রই ছিল মানুষের জয়গান।

বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, ‘সাদা’ও প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে, তা সৈয়দ আবুল মকসুদ প্রতিষ্ঠা করে গেলেন। ইরাকে মার্কিন হামলার বিরুদ্ধে আমাদের রাজনৈতিক প্রতিবাদ ছিল ২০০৩ সালে। সৈয়দ আবুল মকসুদ ঘোষণা দিলেন মার্কিন দখলদারিত্ব শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাদা কাপড়েই থাকবেন। তাই থাকলেন। এমন প্রতিজ্ঞা ক’জন রক্ষা করতে পারেন?’

সৈয়দ আবুল মকসুদ সাংবাদিকতা থেকে ইস্তফা দিলেও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব হিসেবেই সুপরিচিত ছিলেন। লেখা-গবেষণার জন্য যা করেছেন, তা প্রায় সাংবাদিকতার মতোই। যেখানে অন্যায় দেখেছেন, সেখানেই ছুটে গেছেন। অন্যয়ের প্রতিবাদে এমন আওয়াজ ক’জনই তুলতে পেরেছেন!

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘তার এভাবে চলে যাওয়া আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হলো, যা কখনই আর পূরণ করা সম্ভব নয়। আবুল মকসুদ বামপন্থী রাজনৈতিক ধারায় বিশ্বাসী ছিলেন। তার লেখা, গবেষণা আর প্রতিবাদের ভাষায় জাতির বিবেক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। তিনি স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে যেমন কলম ধরেছেন, তেমনি সংখ্যালঘু-আদিবাসীদের অধিকার রক্ষায় প্রতিবাদে শামিল হয়েছেন।

সৈয়দ আবুল মকসুদ আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তার সাম্রাজ্যবাদবিরোধী যে চেতনা প্রতিষ্ঠা করে গেলেন, তা নতুন প্রজন্ম লালন করবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।’

একই প্রত্যাশা ব্যক্ত করে জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘মানুষ সৈয়দ আবুল মকসুদকে একজন প্রতিবাদী বুদ্ধিজীবী মনে করেন। অথচ দিন যাচ্ছে, সুশীল-বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা নিয়ে মানুষ প্রশ্ন তুলছেন। কিন্তু মকসুদ ভাই সব প্রশ্নের ঊর্ধ্বে ছিলেন। প্রগতিশীল লেখক হিসেবে পরিচিতি পেলেও প্রতিটি আন্দোলনে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ দেখেছি আমরা। জনজীবনের সব অধিকার নিয়ে তিনি লিখেছেন। প্রতিবাদ করতে করতে মকসুদ ভাই নিজেই একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছিলেন। যেটি তার বলা এবং বসনেও প্রকাশ পায়। আমরা সাদা কাপড়ে এমন প্রতিবাদ আর দেখব না।

সূত্রঃ জাগোনিউজ