অমর একুশে ফেব্রুয়ারি আজ

২১শে ফেব্রুয়ারি আমাদের মাতৃভাষা দিবস। শুধু তাই নয় ; আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। মূলত বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করেই ২১ শে ফেব্রুয়ারি সারাবিশ্বে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। পৃথিবীর প্রায় ১৯৩টি দেশে ২১ ফেব্রুয়ারি পালিত হয়।

পৃথিবীর অনেক দেশে, দেশমাতৃকার স্বাধীনতা অর্জনে যুদ্ধ-বিগ্রহ হয়েছে, প্রাণ সংহার হয়েছে, হত্যাযজ্ঞ হয়েছে। কিন্তু ভাষার স্বাধীনতা অর্জনে কোথাও কখনো আতœত্যাগের ঘটনা ঘটেনি ; কোন দেশের মানুষ বুকের তরতাজা রক্ত ঢেলে দেন নি। আমরাই একমাত্র অদ্বিতীয় জাতি যারা ভাষার অধিকার আদায়ে জীবন যৌবন, রক্ত সবই দিয়েছি। এটা আমাদের জন্য গর্বের বিষয় যে বাংলা ভাষার কারণে ২১ শে ফেব্রুয়ারি আজ বিশ্বময় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

আবার ইংরেজী আন্তর্জাতিক ভাষা। ভাষাগত সুবিধার কারণে এটি পৃথিবীর প্রায় দেশের দ্বিতীয় ভাষা। বাংলাদেশেও এটি দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে গণ্য হয়। তাই অনেকে মনে করেন বাংলা ও ইংরেজী ভাষা। কিন্তু প্রতি বছর ২১ শে ফেব্রুয়ারি আসলে তাদের কাছে বাংলা বনাম ইংরেজী ভাষা ইস্যুটি মূখ্য হয়ে যায়। মাতৃভাষার প্রতি এ এক অদ্ভুদ টান। এটা মাতৃভাষার প্রতি টান, না ভাষা বিদ্বেষী প্রাণ। অথচ এদিকে ১লা জানুয়ারি থেকে ২০শে ফেব্রুয়ারি এবং ২২শে ফেব্রুয়ারি থেকে ৩১ শে ডিসেম্বর পর্যন্ত ইংরেজী বলা যাবে, পপ, ডিস্কো, আধুনিক, হিন্দি গান নির্বিচারে শুনা যাবে, গাওয়া যাবে, কিন্তু ২১শে ফেব্রুয়ারি চারদিকে শুনতে পাওয়া যায় দেশাত্ববোধক হৃদয়ছোঁয়া গানগুলো। এখন তো দেশাতœবোধক গানের ক্যাসেট ও সিডি গুলো যেকোন দোকানে পাওয়া যায় না।

অবশ্যই অন্তত ২১শে ফেব্রুয়ারির দিন হলেও মানা হচ্ছে। এটা ইতিবাচক দিক। কিন্তু খাঁটি দেশাতœবোধক সারা বছর ধরে থাকা উচিত। লোক দেখানো দেশাতœবোধ এবং জাতীয়তাবোধ কখনো সুফল বয়ে আনতে পারে না। অনেক ব্যক্তিকে দেখা যায় ২১শে ফেব্রুয়ারি ইংরেজী বলা না বলা নিয়ে রীতিমত এক বিতর্ক বেধে যায়। তখন তাদের মধ্যে ভাষার টানের চেয়ে ভাষা বিদ্বেষীর ভাব বেশি মাত্রায় মূর্ত হয়ে উঠে। এটা দুঃখ জনক।

ইউরোপের অন্যান্য দেশ সমূহের মত আমাদের দেশে ও মহাধুমধামের সাথে জাকজমপূর্ণ পরিবেশে থার্টি ফার্স্ট নাইট ইংরেজী নববর্ষ পালিত হয়। আমাদের দেশের অধিকাংশ শিক্ষিত ব্যক্তি বাংলা মাস এবং তারিখ মনে রাখেন না। ইংরেজী মাস এবং দিন তারিখের কথা যত সহজে বলতে পারেন, বাংলার ক্ষেত্রে তত সহজে পারেন না। ইংরেজী আমাদের দেশে জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে কেবল আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভাষা নয় ; এটি এখন অর্থকরী ভাষায় পরিণত হয়েছে।

অনার্স পড়তে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের প্রথম বিবেচনায় বাংলা থাকে না, থাকে ইংরেজী। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে বাংলা বিভাগের চেয়ে ইংরেজী বিভাগের শিক্ষকদের কদর অপেক্ষাকৃত বেশি। ছোট-বড় যেকোন চাকরির বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে স্পষ্ট ভাষায় জানান দেওয়া হয় যে, ইংরেজী জানা প্রার্থীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নেওয়া হবে। আমাদের অভিভাবকদের মধ্যে ছেলে মেয়েদেরকে কয়জনে বা বাংলাভাষা শেখার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখেন, কম বেশি সবাই ইংরেজী শিক্ষার প্রতি একেবারে কড়া নজর রাখেন এবং অত্যন্ত যতœশীল হয়ে থাকেন। খোদ আমাদের দেশের সর্বোচ্চ আদালতে বাংলার প্রচলন নেই।

অনেক জায়গায় ভাষা শহীদদের স্মরণে নির্মিত শহীদ মিনার সারা বছর ধরে অযত্ন অবহেলায় পড়ে থাকে, ময়লা আবর্জনার স্তুপ গড়ে উঠে, একটা ফুলের মালাও শহীদ মিনারে দেওয়া হয়না। কিন্তু ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২৬ শে মার্চ ও ১৬ ই ডিসেম্বর আসলে শহীদ মিনারে তিল ধারণের জায়গা থাকেনা। নামী-দামী ফুলের আবরণে শহীদ মিনার ঢাকা পড়ে যায়। একজন মানুষের জীবনে দেশাতœবোধ বা দেশপ্রেম অনেক বড় জিনিস। দেশের একজন ভাল নাগরিক এবং ভাল মানুষ হতে গেলে এই একটা গুনই যথেষ্ট। তবে সেই দেশাতœবোধ বাহ্যিক না হয়ে যেন মনের হয়। তবেই আমরা যার যার অবস্থান থেকে বুক চাপড়িয়ে বলতে পারব আমি গর্বিত বাঙ্গালী।

আমরা বাংলাদেশে জন্ম নিয়ে গর্ববোধ করি। কেননা আমাদের দেশ কখনও কারো দেশ, ভাষা ও অধিকার ছিনিয়ে নিতে নেতৃত্ব দেয়নি। আমাদের দেশের মাটি উর্বর, ভাষা সুমধুর, সংস্কৃতি অত্যন্ত মার্জিত এবং প্রকৃতি চির সবুজময়। তাইতো বলি আমরা গর্বিত বাঙ্গালী।

আজ মহান একুশে ফেব্রুয়ারি। এই দিনে যাঁরা বাংলা ভাষার মান এবং অধিকার রক্ষায় জীবন উৎসর্গ করেছেন, সেই সকল শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। তাঁদের পারলোকিক সদগতি কামনা করছি।

জয়তু, বাংলাদেশ, জয়তু বাংলা ভাষা