১৮ ডিসেম্বর ১৯৭১: মুক্ত ঢাকায় এল সরকারের অগ্রবর্তী দল

অনলাইন ডেস্কঃ
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়, বিশ্বের মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে মুক্ত, স্বাধীন বাংলাদেশের। কিন্তু বাংলাদেশের প্রথম সরকার তখনও প্রবাসে।

১৮ ডিসেম্বর কলকাতা থেকে বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে আটজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে পাঠানো হয় ঢাকায়। তাদের লক্ষ্য ছিল বিমানবন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। সেটাই ছিল বিজয়ের পর মুক্ত ঢাকায় বাংলাদেশ সরকারের বেসামরিক প্রশাসনের প্রথম পদচ্হ্নি।

তার আগের দিন ১৭ ডিসেম্বর ওই আটজন কর্মকর্তাকে ঢাকায় যাওয়ার নির্দেশনা দিয়ে আনুষ্ঠানিক সরকারি আদেশ জারি হয় তখনকার মন্ত্রিপরিষদের সেক্রেটারি জেনারেল রুহুল কুদ্দুসের স্বাক্ষরে। ১৮ ডিসেম্বর সকাল সোয়া ৭টার ফ্লাইটে দমদম এয়াপোর্ট হয়ে তাদের ঢাকায় ফিরতে বলা হয়।

সেই আদেশের একটি ছবি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দিয়েছেন আইনজীবী আনাতুল ফাতেহ, যার বাবা এ এফ এম আবুল ফাতেহ ছিলেন মুজিবনগর সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টার দায়িত্বে।

পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে বাংলাদেশিদের মধ্যে জ্যেষ্ঠতম কর্মকর্তা আবুল ফাতেহ মুক্তিযুদ্ধের সময় রাষ্ট্রদূত হিসেবে বাগদাদের দায়িত্বরত ছিলেন। একাত্তরের জুলাই মাসে তিনি পক্ষ ত্যাগ করে পালিয়ে লন্ডনে চলে যান। প্রথম একজন রাষ্ট্রদূতের পক্ষত্যাগের ওই ঘটনা সে সময় পাকিস্তানি প্রশাসনকে নাড়িয়ে দেয়।

মুজিবনগর সরকার শুরুতে আবুল ফাতেহকে অ্যাম্বাসেডর অ্যাট লার্জ হিসেবে দায়িত্ব দেয়। অগাস্টে তিনি প্রবাসী সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের উপদেষ্টার দায়িত্ব পান। তিনিই বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্র সচিব।

রুহুল কুদ্দুস ও আবুল ফাতেহসহ আট কর্মকর্তা ১৮ ডিসেম্বর সকালে ঢাকার তেজাগাঁও বিমানবন্দরে পৌঁছান।

ওই দলে আরও ছিলেন সংস্থাপন সচিব এম নুরুল কাদের; বাংলাদেশ পুলিশের প্রথম মহা পরিদর্শক আবদুল খালেক; তথ্য ও সম্প্রচার সচিব আনোয়ারুল হক খান; অর্থ সচিব কে এ জামান; বন্দর ও অভ্যন্তরণী নৌ চলাচল পরিচালক কিউ এ বি এম রহমান এবং বেসামরিক বিমান পরিবহনের পরিচালক উইং কমান্ডার মির্জা।

মন্ত্রিপরিষদের সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে রুহুল কুদ্দুস সেদিন সরকারের প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধিত্ব করছিলেন। আর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধিত্ব করছিলেন আবুল ফাতেহ।

ঢাকা পৌঁছানোর পর তারা চলে যান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে, বাঙালির যে স্মৃতির মিনার পাকিস্তানি বাহিনী ভেঙে দিয়েছিল। সেখানে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তারা।

ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং মন্ত্রিসভার সদস্যরা ২২ ডিসেম্বর বিকালে ঢাকা পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত রুহুল কুদ্দুস ও আবুল ফাতেহই ছিলেন নতুন দেশের রাজধানীতে সরকারের প্রধান প্রতিনিধি।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রবাসী সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দায়িত্বে ছিলেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, সরকারের জ্যেষ্ঠ সেই আট কর্মকর্তা সেদিন ঢাকা পৌঁছেছিলেন অগ্রবর্তী দল হিসেবে। এ সংক্রান্ত আদেশেও তাদের ‘অ্যাডভান্স পার্টি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।

“১৬ ডিসেম্বর গ্রুপ ক্যাপ্টেন খন্দকারকে [মুক্তিযুদ্ধের উপ-অধিনায়ক এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকার] পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে জয়েন করার জন্য পাঠানো হয়েছিল। ওই সময় সঙ্গে আরও কয়েকজন অফিসারকে পাঠানো হয়েছিল।

“তারপর বেছে বেছে ভাগে ভাগে কর্মকর্তাদের ঢাকায় পাঠানো হয়। তখন তো অনেককে পাঠানো যেত না, এয়ার ছাড়া তাড়াতাড়ি আসার পথ ছিল না “

এইচ টি ইমাম বলেন, ১৮ ডিসেম্বর যে আটজন কর্মকর্তা ঢাকায় পৌঁছান, তাদের দায়িত্ব ছিল গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে বেসামরিক প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।

“গ্রুপ ক্যাপ্টেন খন্দকার সাহেবের পরামর্শ ছিল যে আমাদের অনেক সেনসিটিভ জিনিস আছে ক্যান্টনমেন্টে এবং এয়ারপোর্ট, এগুলো আমাদের লোকজন গিয়ে আগে কন্ট্রোল নেওয়া দরকার, সেজন্যই তারা এসেছিলেন।”

এইচ টি ইমাম প্রবাসী সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে যোগ দেন একাত্তরের ১৬ জুলাই। পরে আরও অনেকেই যোগ দেন, সরকারের তরফ থেকে তাদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়।

“রুহুল ‍কুদ্দুস সাহেব ছিলেন আমাদের অনেক সিনিয়র, ১৯৪৯ ব্যাচের। উনি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আসামি ছিলেন।… আহমেদ ফজলুর রহমান, খান শামসুর রহমানসহ সিএসপি যারা ছিলেন, তাদের মধ্যে রুহুল কুদ্দুস সাহেব ছিলেন একজন।

“উনি প্রথম দিকে আমাদের সঙ্গে সরকারে জয়েন করতে পারেননি। পরের দিকে অনেক লেইটে উনি জয়েন করলেন, বোধহয় নভেম্বর মাসে… আমি তখন কেবিনেট সেক্রেটারি, কাজেই উনাকে কী পজিশন দেওয়া যায়… তখন আমরা বললাম- উনাকে সেক্রেটারি জেনারেল করা হোক। এভাবে উনি কিছু দিনের জন্য ওই পজিশনে ছিলেন।”

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে এসে রহুল কুদ্দুসকে মুখ্য সচিব করে নেন। পরে কেবিনেটের সেক্রেটারি জেনারেলের পদটি আর ছিল না বলে জানান এইচ টি ইমাম।

স্বাধীন বাংলাদেশে মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক ১৯৭১ সালের ২৩ ডিসেম্বর বঙ্গভবনে হলেও ওই বছরের ১৮ ডিসেম্বর ঢাকা সেক্রেটারিয়েট ভবনে সেক্রেটারি জেনারেল রুহুল কুদ্দুসের সভাপতিত্বে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি সভা হয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহাকুমার বৈদ্যনাথতলার আম বাগানে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করে।

স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ ও সরকার পরিচালনা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। নয় মাস যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।

২৫ মার্চ কালরাতে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরোচিত হামলার পর শুরু হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ।

এরপর ১০ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করা হয়। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণাকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন ও অনুমোদন করা হয় সেই ঘোষণাপত্রে।

ঘোষণাপত্রে দেশের সংবিধান প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি এবং সৈয়দ নজরুল ইসলামকে প্রজাতন্ত্রের উপ-রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করা হয়।

তাজউদ্দিন আহমেদ সেই সরকারের প্রধানমন্ত্রী, খন্দকার মোশতাক আহমেদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ক্যাপ্টেন মুহাম্মদ মনসুর আলী অর্থমন্ত্রী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামান স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

১১ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ জাতির উদ্দেশে বেতার ভাষণ দেন, যা আকাশবাণী থেকে প্রচার করা হয়। দেশ-বিদেশের মানুষ জানতে পারে, বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম পরিচালনার লক্ষ্যে একটি আইনানুগ সরকার গঠিত হয়েছে।

এরপর ১৭ এপ্রিল সকালে মুজিবনগরে শপথ গ্রহণের মাধ্যমে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠা লাভ করে। পরদিন এ খবর দেশ-বিদেশের পত্র-পত্রিকা এবং সংবাদ মাধ্যমে শিরোনাম হয়।

সূত্র : বিডিনিউজ