এটা এমপি বদির ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ

তোফায়েল আহমদ:

উখিয়া-টেকনাফ সংসদীয় আসনের মাননীয় এমপি আবদুর রহমান বদির এরকম কথা-বার্তায় আজকাল কেউ বিচলিত হন বলে মনে হয়না। তিনি এসব প্রায়শ বলে থাকেন। দৈনিক কালের কন্ঠ আর দৈনিক প্রথম আলোর দুই সাংবাদিক নিয়ে যা বলেছেন এসব কথাও তেমন নতুন কিছু নয়। তবে নতুন কথা একটিই আর তা হচ্ছে-পত্রিকা দু’টির সাংবাদিক নাকি কড (মাসোহারা) নেন। তাও ইয়াবা কারবারিদের নিকট ?

এই কথাটি নিয়ে কিছুটা খটকা লেগেছে। কেননা ইয়াবা কারবারিদের ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যে তালিকাটি রয়েছে সেখানে এমপি সাহেব সহ তাঁর পরিবারের ২০ জন মত সদস্য রয়েছেন। এছাড়াও রয়েছেন আরো কয়েকশ পাচারকারি। দৈনিক কালের কন্ঠ ২০১০ সালের ১০ জানুয়ারিতে আত্মপ্রকাশের পর থেকেই সীমান্তের ইয়াবা কারবারিদের নিয়ে জোরালো ভাবে লিখে আসছে।

এমনকি সীমান্ত জনপদে জনাব আবদুর রহমান বদি এমপি নির্বাচিত হবার মাত্র আড়াই বছর পার হবার পরই সর্বপ্রথম কালের কন্ঠ ‘বদনামের শেষ নেই এমপি বদির’ শীর্ষক প্রধান শিরোনামে সরেজমিন দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই সংবাদ আইটেমেই মুসলিম এইড এনজিওকে জমি দেয়ার দলিলটিও প্রকাশ করা হয়। ২০১১ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তারিখের কালের কন্ঠে এমন প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর উখিয়া-টেকনাফে অনেক মিছিল-মিটিং করা হয়। এমনকি এসব মিছিল-মিটিংয়ে পুড়ানো হয় আমার কুশপুত্তলিকাও।

কালের কন্ঠ অত্যন্ত দায়িত্বশীল সাংবাদিকতায় বিশ্বাস করে থাকে। কোন ভাবেই এমপি সাহেব বা অন্য কারো মানহানির উদ্দেশ্যে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেনি। তবুও এমপি বদির ভাই মৌলভী মুজিবুর রহমান বাদি হয়ে আমি ও কালের কন্ঠের সম্পাদক সহ তিনজনের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় হয়রানিমূলক মামলা। এখানেই শেষ নয়-২০১৪ সালের ২৯ এপ্রিল কালের কন্ঠ প্রকাশ করে ‘ইয়াবা বদি’ শিরোনামের আরেক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন।

এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর এমপি বদি নিজে বাদি হয়ে কালের কন্ঠ সম্পাদক সহ দুই জনের বিরুদ্ধে দায়ের করেন আরো একটি হয়রানিমূলক মামলা। মামলা দু’টি বর্তমানে মহামান্য উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। কালের কন্ঠের অব্যাহত লেখালেখি সহ প্রকাশিত সংবাদের চাঞ্চল্যকর শিরোনামের কারণে এমপি বদির ক্ষোভ জমাট বাঁধতে পারে এটা স্বাভাবিক। এরকম আরো অনেক প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। সুতরাং তিনি কালের কন্ঠের বিরুদ্ধে একটু-আধটু রাগ-গোস্বা করাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

একজন সংবাদকর্মী দেশ ও জাতির কল্যাণের জন্যই অবিচল থেকে ন্যায়-নিষ্ঠার মাধ্যমে সংবাদ পরিবেশন করে থাকেন। কাউকে খুশি করা বা কারও মানহানির উদ্দেশ্যে সংবাদ পরিবেশন করা হয়না। সমাজের শুদ্ধতার জন্য পরিবেশিত সংবাদে যারা ক্সতিগ্রস্থ হয়ে থাকেন তারা রাগ-গোস্বা দেখাতেই পারেন। সত্য এবং তথ্য নির্ভর প্রতিবেদন প্রকাশের পর একজন ক্ষতিগ্রস্থ ব্যক্তির একটি মাত্রই ভাষা হয়-‘প্রকাশিত সংবাদ ডাহা মিথ্যা। সাংবাদিকের দাবি পূরণ না হওয়ায় এরকম মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে।’

কিন্তু সংবাদ প্রকাশের পর একে একে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা করার ব্যাপারে কোন ব্যাখ্যা থাকে না। কেবলই একটি কমন কথা বলা হয়-‘মানহানি হয়েছে।’ আমি এবং আমার সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে মামলা বিচারাধীন থাকায় সংগত কারণেই বিরুপ কোন মন্তব্য করা থেকে বিরতই রইলাম।

তবে বলার লোভ সামলাতে না পেরে বলতেই হচ্ছে-যদি কিনা ইয়াবা কারবারিরা কডই দিয়ে থাকেন তাহলে এত লেখালেখি হয় কিভাবে ? এবং একটির পর একটি মামলাও কেন দেয়া হয় ? একারণেই বলছি-গত ৩১ জুলাইয়ের টেকনাফের সাগর পাড়ের বাহারছড়া শামলাপুরের আরএসও জঙ্গিদের গোপন বৈঠকের সংবাদ প্রকাশের পর এসব ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কিছু নয়।

আর এই গোপন বৈঠক প্রসঙ্গে এমপি বদি কোন কোন টিভি চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে প্রথম আলো এবং কালের কন্ঠের সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এরকম বিষোদগার ছেড়েছেন। তবে তিনি কারো নাম উল্লেখ করেননি। এমপি বদির এই বিষোদগার কক্সবাজার নিউজডমকম (সিবিএন) নামক ওয়েব পোর্টালে প্রচার করা হয়। আর সেই সিবিএন এর বরাতে পহেলা আগষ্টের দৈনিক বাঁকখালী পত্রিকায় এমপি বদির ক্ষোভের বক্তব্যটি প্রকাশ করতে গিয়ে কালের কন্ঠের সাংবাদিক তোফায়েল আহমদ ও প্রথম আলোর সাংবাদিক আবদুল কুদ্দুস রানার নামটি জুড়ে দেয়া হয়েছে।

এমপি বদি সম্পর্কে সংবাদ প্রকাশ সহ মামলা-মোকদ্দমা নিয়ে সংবাদকর্মীদের মনোমালিন্য থাকতেই পারে। তবে দৈনিক বাঁকখালী পত্রিকা কিসের ক্ষোভে সাংবাদিকদ্বয়ের নাম গায়ে পড়ে জুড়ে দিয়েছে সেটা জানা গেল না। এরপরেও সিবিএন কর্তৃপক্ষ ভুল বুঝতে পেরে পরে তাদের সংবাদটি তুলে নেয়। সেই সাথে দৈনিক বাঁকখালীতে সিবিএন’র বরাতে প্রকাশিত সংবাদটির জন্য তীব্র নিন্দাও প্রকাশ করে।

লেখক: সাংবাদিক, কালের কন্ঠ, কক্সবাজার।