রাজনৈতিক দলের আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশঃ একটি রায়

মোহাম্মদ শাহজাহান,এডভোকেটঃ
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের মহামান্য সুপ্রীম কোর্টের হাই কোর্ট বিভাগ দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর আয়-ব্যয়ের হিসাব জনসম্মুখে প্রকাশের পক্ষে একটি মাইলফলক রায় দিয়েছেন।রায়ের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়া আয়-ব্যয়ের হিসাব আগ্রহী নাগরিকদের কাছে প্রকাশের নির্দেশ দেয়ার পাশাপাশি এতে নির্বাচন কমিশনের রাজনৈতিক দলগুলোর পূর্বানুমতিও দরকার নেই মর্মে সুস্পষ্ট অভিমত দেয়া হয়েছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর কর্তা ডঃ বদিউল আলম মজুমদারসহ দেশের একাধিক বিশিষ্ট নাগরিকের দায়ের করা একটি রীট পিটিশনের সূত্রেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই রায়টি মিললো।

ডঃ বদিউল আলম মজুমদার তথ্য অধিকার আইনের আওতায় রাজনৈতিক দলগুলোর আয়-ব্যয়ের হিসাবের তথ্য জানতে চেয়ে নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেছিলেন। নির্বাচন কমিশন এই যুক্তিতে তাঁর আবেদন নাকচ করে যে, এ সংক্রান্ত তথ্য গোপনীয় এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অনুমতি ব্যতিত তা প্রকাশ করা যাবে না।

নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পরে তিনি তথ্য কমিশনে আপীল করলে সেখানেও প্রায় একই রকম যুক্তিতে আপীল নাকচ হবার প্রেক্ষিতে রীট পিটিশন দায়ের করা হয়।
প্রসঙ্গতঃ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী সম্পর্কে তথ্য জানার অধিকার নিয়ে দায়েরকৃত বহুল আলোচিত আবু সাফার মামলাটির কথা স্মরণ করা যেতে পারে। হাই কোর্ট বিভাগ এই মামলার রায়ে নির্বাচনে প্রার্থী সম্পর্কে বেশ ক’টি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশের আদেশ দিয়েছিলেন। মামলার একটি পক্ষ কতিপয় অসার যুক্তি উপস্থাপনে ও মিথ্যার আশ্রয়ে এই মামলায় হাই কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপীল দায়ের করলে বিচার বিভাগের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনাবলীর পর অবশেষে হাইকোর্টের রায়টিই বহাল থাকে। ফলে ভোটার তথা জনগণের পক্ষে ভোটাধিকার প্রয়োগে অবহিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার পথ সুগম হয়।

রাজনৈতিক দলগুলোর আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ নিয়ে সাম্প্রতিক রায়টিও দেশের সামগ্রিক রাজনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব রাখবে বলে আশাবাদী হবার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

প্রথমতঃ প্রকৃত রাজনীতিকদের বাদ দিয়ে ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের কাছে মনোনয়ন বিক্রি করে তাঁদের প্রার্থী করার পথ কিছুটা হলেও রুদ্ধ হবে বলে মনে করা যায়।

দ্বিতীয়তঃ এতে করে দলগুলোর অভ্যন্তরে আর্থিক কার্যাদিতে শৃংখলা চর্চার সূচনার পাশাপাশি দলীয় কর্মকান্ডে জবাবদিহীতার পরিবেশ সৃষ্টি হবে।

সর্বোপরি, দলগুলোর আয়-ব্যয়ের হিসাব বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণে ভোটাধিকার প্রয়োগে যোগ্যতর দলকে ক্ষমতাসীন করার কাজও সহজ হবে ভোটারদের জন্যে।

সংসদীয় গণতন্ত্রের বেশিরভাগ দেশেই নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর মাত্র তিন মাস অন্তর অন্তর আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশের সংস্কৃতি রয়েছে।সেসব দেশে এটি আইনি বিধান হিসেবে বর্তমান। এ নিয়ে আইনি বিধান নেই, এ রকম বহু দেশের রাজনৈতিক দলগুলোও স্বেচ্ছা-প্রণোদিত হয়ে আয়-ব্যয়ের হিসেব প্রকাশ করে থাকেন।

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও নির্বাচন কমিশনের তরফে সেটি করা হয়।
সৌভাগ্যবশতঃ এমন এক সময়ে আলোচ্য রায়টি এলো, যখন দেশব্যাপী স্থানীয় সরকারের আসন্ন নির্বাচনে কালো টাকার জোরে মনোনয়ন কেনার জন্যে চরম ঘৃণ্য ইয়াবা-ব্যবসায়ীসহ কালোবাজারিদের অকল্পনীয় দৌঁড়-ঝাপের খবর গণমাধ্যমে চাওর হয়ে আছে।

মনোনয়ন বাণিজ্যসহ নানারূপ অপসংস্কৃতি ,দুর্নীতি ও গণতন্ত্র-বিনাশী কর্মকান্ড থেকে মুক্তি পাক দেশীয় রাজনীতি-অধম আম-আদমির প্রত্যাশা এটুকুই।

লেখকঃ এডভোকেট, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, কক্সবাজার।