পর্যাপ্ত ঘুম এবং করোনাভাইরাস সংক্রমণ!

সেরীন ফেরদৌসঃ
করোনাভাইরাস আক্রান্ত পৃথিবী হঠাৎ করেই থমকে গেছে বলা চলে! সামাজিক দূরত্ব ও আইসোলেশন বজায় রাখতে গিয়ে গত মাস দুয়েক অথবা তারও বেশি সময় ধরে প্রচুর মানুষ একেবারেই দরকারি কাজের বাইরে ঘরবন্দী হয়ে রয়েছেন। অনেককেই অফিসের কাজ করতে হচ্ছে ঘরে বসে। একাকার হয়ে গেছে ঘরের কাজ আর বাইরের কাজ। ইন্টারনেটে মানুষ রাত জেগে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছে, নির্দিষ্ট রুটিনের বালাই না থাকায় পরিবারের সাথে রাত জাগছে অথবা মুভি দেখছে, ইন্টারনেট ঘাঁটছে ইত্যাদি। ফলে, প্রচুর মানুষই লাগাতার অনিদ্রা/অপর্যাপ্ত ঘুমের শিকার হচ্ছে এই সময়টাতে!

অন্যদিকে দেশে দেশে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের নানারকম অবনতির রিপোর্ট যাচ্ছে বেড়ে। শুধু তাই নয়, দেখা গেছে, পরিবারে নানারকম অশান্তি, চিৎকার-চেঁচামেচি আর মারধোরের পরিমাণও উদ্বেগজনকহারে বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ঘুমের সময়, পরিমাণ ও রুটিনের হেরফের এসবের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হয়তো পালন করছে।

মনোস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাসের বিস্তার ও মৃত্যু বিষয়ে আচম্বিতে চেপে বসা উদ্বেগ, আতংক, ভীতি, দৈনন্দিন এলোমেলো রুটিন মানুষের ভেতরে লাগাতার মানসিক চাপ তৈরি করছে অনিশ্চয়তার এ পরিবেশে মানুষ তার প্রতিদিনের নির্দিষ্ট রুটিন অনুযায়ী কাজগুলো করতে পারছে না এবং তাদের এই নাজুক মানসিক অবস্থাকে আরো অসহনীয় করে তুলেছে অপর্যাপ্ত ঘুম!

ইউনিভার্সিটি অব মন্ট্রিয়লের সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক এবং কানাডিয়ান স্লিপ এন্ড সার্কাডিয়ান নেটওয়ার্কের সায়েন্টিফিক ডিরেক্টর জুলি ক্যারিয়ার বলেন, উদ্বেগ এবং মানসিক চাপের শিকার প্রচুর মানুষ এ সময়টায় রাতকেই বেছে নিচ্ছেন বেশি কাজ করার জন্য এবং প্যানডেমিক সময়ে এটা অস্বাভাবিক নয়। আমাদেরকে এই “নতুন” অবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। এবং নিজেদের প্রয়োজনেই একটি ঘুমের রুটিন বানিয়ে নিতে হবে।

তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় কথা হলো একটি নির্দিষ্ট সময়ে প্রতিদিন ঘুমুতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠা! শরীর খুব দ্রুত সেটা অভ্যাস করে নিতে পারবে। প্রাকৃতিক-স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই ঘুমুতে যাওয়া দরকার। তিনি হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেন, অনেকেই ভাবেন যে, অ্যালকোহল অথবা ঘুমের ওষুধ দ্রুত ঘুম পাড়িয়ে দিতে সক্ষম। তারা চটে যাওয়া, রুটিনবিহীন ঘুম লাইনে আনার জন্য অ্যালকোহলের (বা ঘুমের ‍ওষুধ) উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। হ্যাঁ, আপাতদৃষ্টিতে প্রাথমিক অবস্থায় অ্যালকোহল তন্দ্রা আনছে বটে কিন্তু তা কোনো গুণগত ঘুম নিশ্চিত করে না। অ্যালকোহল আসক্তরা বরং ঘুমের বেশ কয়েকঘন্টা আগে তা পান করতে পারেন যাতে সেটা গুণগত ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটায়।

ঘুম একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফেনোমেনা আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং রোগব্যাধি প্রতিরোধের ক্ষেত্রে। বলা হয়ে থাকে আমাদের স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা ব্যবস্থাপনার তিনটি পিলার হচ্ছে– ঘুম, পুষ্টি এবং ব্যায়াম। এলোমেলো জীবনযাপনের কারণে এই তিনটির যেকোনো একটিকে যদি দিনের পর দিন অবহেলা করা হয় তবে তা অচিরেই আমাদের দৈনন্দিন জীবনের উপর স্বল্পস্থায়ী এবং ভবিষ্যতে দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

প্রাণীজগতের প্রত্যেকেরই, উদ্ভিদ, প্রাণী, মানুষ–এর নানারকম প্রাকৃতিক জৈবিক শারীরিক ছন্দ থাকে। মানুষের বেলায় তেমনি ঘুম একটি অত্যন্ত শক্তিশালী জৈবিক ছন্দ যা পরিপার্শ্বের পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে চলে আলো ও অন্ধকারের সাপেক্ষে। একে বলা হয় “সার্কাডিয়ান রিদম” বা “ঘুম-জাগরণ চক্র”। এটি পুরোটাই জৈবিক একটি প্রক্রিয়া। বায়োলজির ভাষায় জেগে থাকাকে দেখা হয় শারীরিক-মানসিক সর্বোচ্চ কর্মক্ষম অবস্থা এবং ঘুমকে দেখা হয় শারীরিক-মানসিক সবচেয়ে কম কর্মক্ষম অবস্থা হিসেবে। যেমন, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জেনেটিক কোড অনুযায়ী আমাদের ব্রেইন রাতের বেলায় মেলাটোনিন নামের হরমোন রিলিজ করে যা ঘুম ঘুম ভাব আনে এবং উত্তেজক হরমোন কর্টিসোল রিলিজ হওয়া বন্ধ থাকে ইত্যাদি।

যদিও শরীরের ওপর ঘুমের প্রভাবকে পুরোপুরি বুঝে ওঠা যায়নি, তারপরও ঘুমের অবস্থাকে সাধারণভাবে দুইভাগে ভাগ করা হয় মেডিকেল সায়েন্সে। ননরেম (NREM- Non Repid Eye Movement) এবং রেম (REM-Repid Eye Movement) ঘুম, আমাদের ঘুমের পুরোটা সময়ে ননরেম এবং রেম ঘুমের একেকটি চক্র একের পর এক পর্যায়ক্রমে আসতে থাকে। ননরেম ঘুমের চক্রটি বেশি লম্বা সময় ধরে হয় এবং এর কয়েকটি ধাপ আছে। এর শেষের ধাপগুলোতে ডিপস্লিপ বা গভীর ঘুম হয়ে থাকে। একে স্লো-ওয়েভ স্লিপও বলা হয় কারণ তখন হার্ট এবং ফুসফুস প্রায় ২০% থেকে ৩০% কম কাজ করে জেগে থাকার চাইতে। শরীরের সকল ইন্দ্রিয় শিথিলতম অবস্থায় থাকে, বিশেষ করে মাথার মাংশপেশীগুলো সবচেয়ে শিথিল হয়। বলা হয়ে থাকে এই সময়ই শরীরে শক্তির পুনর্গঠন ঘটে ও নানারকম হরমোন রিলিজ হয় যা বেড়ে ওঠার জন্য ও ইমিউন সিস্টেমের জন্য কাজ করে। রেম ঘুম গড়ে প্রতি ৯০ মিনিট পরপর আসে ও ৫ থেকে ৩০ মিনিট স্থায়ী হয়। এই সময়টাতে ব্রেইন সবচেয়ে সক্রিয় থাকে এবং চিন্তা, তথ্য সুসংহত করা, শেখা ইত্যাদি ব্যাপারগুলো ঘটে এবং মানুষ স্বপ্ন দ্যাখে। কারো বেলায় যদি ঘুমের এই চক্রগুলি অনিয়মিত হয় অথবা কোনো একটি চক্র অনুপস্থিত তাকে, তবে তাকে স্লিপ-ডিসঅর্ডার বলা হয়।

ঘুম শুধু আমাদের সতেজই করে না, প্রতিদিনের কর্মশক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করে থাকে। আমরা জানি, শরীর ঘুমালেও আমাদের বিশেষ বিশেষ কিছু কোষ, বিশেষ করে আমাদের ব্রেইন সেলগুলো ঘুমের সময়টাকে সবচেয়ে বেশি কাজে লাগায়। গবেষকরা দেখেছেন ঘুমের বিভিন্ন ধাপে আমাদের ব্রেইন বিভিন্ন ধরনের কাজ সম্পন্ন করে থাকে। আমরা ঘুমালে ব্রেইন সেলগুলো যে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করে তার মধ্যে অন্যতম হলো স্মৃতি ও শেখা জিনিসগুলোকে একত্র করে, নবায়ন করে, পুনরায় জমা রাখে।

আমাদের পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে দিনভর আমরা যে সমস্ত শারীরিক ও মানসিক অভিজ্ঞতা, রাশি রাশি তথ্য ও অবস্থার ভেতর দিয়ে যাই সেইগুলোকে যাচাই-বাছাই, ঝাড়াই করে অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দেয়, প্রয়োজনীয় অংশকে সযত্নে তুলে রাখে। এই প্রক্রিয়া মানুষের জ্ঞান বাড়াতে ও মানসিক ভারসাম্য রক্ষা করতে বড় ভূমিকা রাখে। ঘুম আমাদের মানসিক চাপকে নিয়ন্ত্রণ করে, আবেগের ভারসাম্য রাখতে সাহায্য করে।

ঘুম প্রচুর এন্টিবডি তৈরি করে ইমিউন সিস্টেমকে সযতনে রক্ষা করে ও শক্তিশালী করে পরবর্তী দিনের রোগব্যাধি মোকাবেলা করার জন্য মানুষকে প্রস্তুত করে। ঘুমের সময় আমাদের দেহের দরকারি নানারকম সেলগুলো নবায়ন ও সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটে। শরীরের ফুসফুস, হার্ট, ব্রেইন, হরমোনাল ও মেটাবলিজম প্রক্রিয়া বিশ্রাম পায় ও শক্তিশালী হয়। উপরন্তু ব্রেইন নানারকম মেটাবলিক বর্জ্যও অপসারণ করে ঘুমেরই সময়! শিশু ও অ্যাডোলেসেন্টদের বেলায় “গ্রোথ হরমোন” রিলিজ হয় ঘুমের সময়!

ঘুম কম হলে সরাসরি তা আমাদের মেজাজ-মর্জি এবং আচরণের উপর প্রভাব ফেলে। দিনের বেলায় ঘুম ঘুম লাগে, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায় আর ছোটখাটো কারণে মানুষ উত্তেজিত হয়ে উঠতে পারে। অমনোযোগী ও ভুলোমন হয়ে ওঠাও নিয়মিত কম ঘুম হওয়া লোকের ভেতরে দৃশ্যমান হয়। দীর্ঘদিনের কম ঘুম নানা শারীরিক জটিলতা তৈরি করে।

প্রফেসর জুলি ক্যারিয়ারের মতে, মুড ঠিক রাখার জন্য, চাপ কমিয়ে রাখতে এবং ইমিউন সিস্টেম চাঙা রাখতে বড়দের গড়ে প্রতিদিন অন্তত ৬-৭ ঘন্টা ঘুম দরকার। পৃথিবীজুড়ে নানারকম খবরের ভেতর বিরামহীন ঘোরাঘুরি কমিয়ে ঘুমের আগে আগে ব্রেইন ও শরীরকে কিছুটা স্বস্তি দিতে হবে যাতে ঘুমটা প্রাকৃতিকভাবে আসার সুযোগ পায়। প্রত্যেককেই নিজ থেকে খুঁজে নিতে হবে ঠিক কোন কাজটি ঘুমের আগে তাকে শান্ত রাখতে সাহায্য করবে। তিনি অবশ্য বেডরুম থেকে সেলফোন দূরে রাখতে ও ল্যাপটপ-কম্পিউটার সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতেও পরামর্শ দিয়েছেন। সর্বোপরি, প্রতিদিন, সামান্য হলেও ব্যায়াম নিয়মিত ঘুমের জন্য বিরাট উপকারী বলে মন্তব্য করেছেন জুলি ক্যারিয়ার।

সেরীন ফেরদৌস ‘নতুন দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক

সূত্রঃ বিডিনিউজ