দীর্ঘ আয়ু পেলেন না দীর্ঘতম মানব জিন্নাত আলী : সামাজিক দূরত্বে দাফন সম্পন্ন

খালেদ শহীদ, রামুঃ
দেশের দীর্ঘমানব, বিশ্বের দ্বিতীয় দীর্ঘতম মানব জিন্নাত আলী দীর্ঘ আয়ু পেলেন না। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) ভোররাত ৩টা ২০ মিনিটে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহী……রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল মাত্র ২৪ বছর। দীর্ঘমানব জিন্নাত আলী কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলার গর্জনিয়া ইউনিয়নের বড়বিল গ্রামে ১৯৯৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ওই গ্রামের বর্গাচাষী আমীর হামজা, তার মায়ের নাম ছফুরা বেগম। তাদের এক মেয়ে, তিন ছেলের মধ্যে জিন্নাত আলী তৃতীয়।

মঙ্গলবার বিকাল ৩ টায় রামু উপজেলার গর্জনিয়া ইউনিয়নের বড়বিল চেরাং এলাকায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে তার নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। নামাজে জানাযায় কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ¦ সাইমুম সরওয়ার কমল, উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভ‚মি) মো. সরওয়ার উদ্দিন, রামু থানা অফিসার ইনচার্জ মো. আবুল খায়ের, গর্জনিয়া ইউপি চেয়ারম্যান ছৈয়দ নজরুল ইসলাম, কচ্ছপিয়া ইউপি চেয়ারম্যান আবু ইসমাঈল মোহাম্মদ নোমান ও পরিবারের সদস্যরা সহ প্রায় ৩০জন অংশ নেন। নামাজে জানাযা শেষে তাকে স্থানীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়।

তথ্য সূত্রে জানা গেছে, হরমোনের জটিলতার কারণে ১১ বছর বয়সে জিন্নাত আলীর দেহের উচ্চতা অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় সহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার সময় বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা জানান, তার মস্তিষ্কে একটি টিউমার পিটুইটারি গ্রন্থিকে প্রভাবিত করার ফলে তার উচ্চতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। তার উচ্চতা ছিল ৮ ফুট ২.৮২ ইঞ্চি। গিনেস বুক রেকর্ড এবং উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী পৃথিবীর সবচেয়ে জীবিত দীর্ঘতম মানব হলেন তুরস্কের সুলতান কোসেন। তার উচ্চতা ৮ ফুট ৩ ইঞ্চি। সুলতান কোসেন এর পরবর্তী দীর্ঘতম বিশ্ব মানব হলেন, কক্সবাজারের রামু উপজেলার গর্জনিয়ার জিন্নাত আলী। উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে গিনেসবুকের ইতিহাসে জিন্নাত আলী হলেন, পৃথিবীর ৮ম দীর্ঘতম মানব।

জিন্নাত আলী বড় ভাই মোহাম্মদ ইলিয়াছ জানান, জিন্নাত আলী দীর্ঘদিন ধরে মস্তিষ্কে টিউমার জনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। তার ডায়বেটিসও ছিল। কয়েকদিন আগে মাথায় টিউমার জনিত সমস্যা বেড়ে গেলে তাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য গত রোববার (২৬ এপ্রিল) চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চমেক হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. নোমান খালেদ চৌধুরী’র অধীনে চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়।

অধ্যাপক ডা. নোমান খালেদ চৌধুরী জানান, রোববার সকালে জিন্নাত আলীকে যখন নিউরোসার্জারিতে আনা হয়, তখন তিনি অজ্ঞান ছিলেন। ওনার পরিস্থিতি এতই জটিল যে, তার আর জ্ঞান ফেরার সম্ভাবনা নেই। তাকে হাসপাতালের আইসিইউতে ভেন্টিলেশন সাপোর্ট দেয়া হয়েছিলো। ওনার মস্তিষ্কে টিউমার ছিলো এবং সেটা খুব বড়। টিউমার অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ ডিফিকাল্ট ছিলো।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, দেড় বছর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেছিলেন জিন্নাত আলী। প্রধানমন্ত্রী জিন্নাত আলীর চিকিৎসায় সহায়তা দিয়েছিলেন এবং প্রধানন্ত্রীর তহবিল থেকে আর্থিক সহযোগিতায় জিন্নাতকে তার এলাকায় একটি দোকানও করে দেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে দীর্ঘ মানব জিন্নাত আলীর বাসস্থান ও জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থাও করে দেন, কক্সবাজার জেলা প্রশাসন। চিকিৎসার পাশাপাশি তাঁকে দেয়া হয় একটি পাকা ঘর সহ একখন্ড জমি। রামুর গর্জনিয়া বাজারে তার নামে ০.০০৩৮ একর জমি বন্দোবস্ত দিয়ে সেই জমিতে নির্মাণ করে দেয়া হয় নিত্যপণ্যসহ একটি দোকান ঘর। ২০১৯ সালের ১০ এপ্রিল দোকানে ৫০ হাজার টাকার মালামাল দিয়ে দোকানঘরটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন। এ সময় দোকান ঘর ও জমির কাগজপত্র জিন্নাত আলীকে হস্তান্তর করেন কক্সবাজার জেলাপ্রশাসক।

দেশের দীর্ঘমানব জিন্নাত আলীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন, কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব সাইমুম সরওয়ার কমল, কক্সবাজার জেলা প্রশাসক প্রশাসক মো. কামাল হোসেন, রামু উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রণয় চাকমা প্রমুখ। শোকবার্তায় সাইমুম সরওয়ার কমল এম পি দেশের দীর্ঘমানব মরহুম জিন্নাত আলীর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন এবং শোকাহত পরিবার পরিজনের প্রতি সমবেদনা জানান।