খাদ্য ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী নিয়ে হতদরিদ্রদের দ্বারে দ্বারে রামুর ইউএনও প্রণয় চাকমা

খালেদ শহীদ, রামুঃ
রামুতে খাদ্য ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী নিয়ে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা হতদিরদ্র মানুষের দরজায় দরজায় যাচ্ছেন ইউএনও প্রণয় চাকমা। সোমবার থেকে বুধবার পর্যন্ত রামু’র ছয় ইউনিয়নের ১৪ শত নিম্ন আয়ের মানুষের ঘরে ঘরে ত্রাণ দেয়া হয়েছে। করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রামুতে চলছে অঘোষিত লকডাউন। আইনশৃংখলা বাহিনীর কঠোর নজরদারিতে ও করোনা ভাইরাস আতঙ্কে কর্মহীন হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ। অঘোষিত লকডাউনের কারণে গণপরিবহন সহ সড়কের সকল প্রকার গাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। দিনমজুরি বঞ্চিত শ্রমিকরা অনাহারে দিনযাপন করছে। রামুর এগার ইউনিয়নে এ সব দিনমজুর নিম্নআয়ের মানুষের দরজায় ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছেন, ইউএনও প্রণয় চাকমা। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষনা অনুযায়ী রামুতে নিম্ন আয়ের কোন মানুষ অনাহারে থাকবে না বলেও তিনি জানান।

জানা গেছে, করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে জনসাধারণকে সামাজিক দূরত্ব ও হোম কোয়ারেন্টাইন সচেতনামূলক প্রচারণায় স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় কাজ করছে রামু সেনানিবাসের ১০ পদাতিক ডিভিশন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে বিজিবি, পুলিশ, র‌্যাব ও আনসার সদস্যের যৌথ টহলদলের কঠোর নজরদারিতে রামু উপজেলার এগার ইউনিয়নের বাজার ও ষ্টেশনে নিত্যপণ্যের দোকান, ফার্মেসী ছাড়া অন্যান্য দোকানপাট ও জনসমাগমস্থল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। জরুরী প্রয়োজন ছাড়া ঘর বের থেকে জনগণকে বের হতে দিচ্ছে না প্রশাসন। এ পদক্ষেপের ফলে রামুর নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। তাদের হাতে চলার মতো পর্যাপ্ত অর্থও নেই।

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সামাজিক দূরত্ব ও হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে জনসাধারণকে সচেতন করার পাশাপাশি নিম্ন আয়ের কোন মানুষ যেন অনাহারে না থাকে, কর্মহীন মানুষের ঘরে ঘরে ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছে রামু উপজেলা প্রশাসন। যারা প্রকৃত অসহায় দিনে এনে দিনে খায়, তাদের হাতে খাদ্য ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী তুলে দিচ্ছেন রামু উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রণয় চাকমা।

গত তিন দিনে উপজেলার ছয় ইউনিয়নের ১৪শত পরিবারকে ত্রাণ সামগ্রী দেয়া হয়েছে। আজ বুধবার (১ এপ্রিল) একদিনে রামু উপজেলার জোয়ারিয়ানালা, রশিদনগর ও রাজারকুল ইউনিয়নের ৫০০ অসহায় পরিবারের মধ্যে খাদ্য ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণ করেছেন ইউএনও প্রণয় চাকমা। এ সময় জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান কামাল শামশুদ্দিন আহমেদ প্রিন্স, রশিদনগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এম ডি শাহ আলম, রাজারকুল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মুফিজুর রহমান, উপজেলা উপ-সহকারি প্রৌকশলী মো. আলাউদ্দিন, রামু থানার এস আই অশোক চন্দ্র হালদার, এনএসআই আবু হানিফ ও রামু রিপোর্টাস সোসাইটির সাবেক সভাপতি সোয়েব সাঈদ প্রমুখ।

ইউএনও প্রণয় চাকমা বলেন, সোমবার থেকেই শুরু হয়েছে অসহায়-অনাহারী মানুষের দরজায় গিয়ে খাদ্য ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণ কার্যক্রম। আজ (বুধবার) পর্যন্ত উপজেলার ৬ ইউনিয়নের ১১০০ পরিবারকে ১০ কেজি করে চাল এবং ৩০০ পরিবারকে ১ লিটার তেল, ২ কেজি আলু, ১ কেজি ডাল, ১ কেজি লবন ও ১টি করে সাবান দেয়া হয়েছে। সামনে আরও বড় পরিসরে অপর ৫ ইউনিয়ন সহ সব ইউনিয়নের নিম্ন আয়ের মানুষের দরজায় দরজায় গিয়ে খাদ্রদব্য বিতরণ করা হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী রামুতে নিম্ন আয়ের কোন মানুষ অভূক্ত থাকবে না।

ইউএনও’র ত্রাণ পেয়ে কেঁদেই দিলেন রামু উপজেলার রশিদনগর ইউনিয়নরে খাদেমের পাড়া এলাকার হতদরিদ্র আছিয়া খাতুন ও মালেকা বেগম। তাদের স্বামীরা দিনমজুরি কাজ করেন। কিন্তু প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের কারণে দেশে চলছে অঘোষিত লকডাউন। এতে বেকার হয়ে হাত গুটিয়ে বসে আছেন তারা। মালেকা বেগম বলেন, এক সপ্তাহেরও বেশি হলো কাজ বন্ধ। খুব চিন্তায় ছিলাম। খাবার ছিল না ঘরে। ত্রাণ পেয়ে ভাল লাগল। ক’দিন তো খেতে পারব।

রশিদনগর আশ্রয়ণ প্রকল্প গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা রিক্সাচালক বশির আহম্মদ ও আলী মিয়া তারা ব্যাটারিচালিত রিক্সা চালিয়ে আয় করেন। তারা বলেন, রাস্তায় এমন ফাঁকা হরতালেও দেখিনি। সেনাবাহিনী রাস্তায় রিক্সা চালাতে দেয়না। গত এক সপ্তাহে কোন টাকা আয় করতে পারিনি। ১০ কেজি করে চাল পেয়েছি, অনেক উপকার হবে।

ইউএনও প্রণয় চাকমা সরকার এবং স্থানীয় প্রশাসনের ব্যক্তি উদ্যোগে সংগৃহীত এসব উপকরণ নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে পৌঁছে দেন। করোনাভাইরাসের কারণে সরকারি নির্দেশে অনেকটা ঘরবন্দি হয়ে আছেন অসংখ্য মানুষ। তাদের মধ্যে খেটে খাওয়া মানুষ দৈনিক আয় থেকে বঞ্চিত। পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দৈনিক আয় বঞ্চিত খেটে খাওয়া এসব মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে রামু উপজেলা প্রশাসন।

করোনাসংক্রমণ প্রতিরোধে স্বাস্থ্য সুরক্ষার সব নিয়মকানুন সঠিকভাবে পালনের বিষয়ে সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়ে ইউএনও প্রণয় চাকমা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সামাজিক দূরত্ব ও হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখতে কঠোর নজরদারিতে কাজ করছে রামু উপজেলা প্রশাসন। জনসাধারণকে সচেতন করার পাশাপাশি দিনমজুর ও নিম্নআয়ের মানুষদের জন্য মানবিক সহায়তা কর্মসূচী বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

রামু রিপোর্টাস সোসাইটির সাবেক সভাপতি সোয়েব সাঈদ বলেন, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে দেশের সব মানুষকে ঘরে অবস্থান করতে বলা হয়েছে। দিনমজুর, রিক্সা চালক, পরিবহণ শ্রমিক সহ দৈনিক মজুরীতে কাজ করা নিম্ন আয়ের হতদরিদ্র মানুষগুলো এখন আরও অসহায় হয়ে পড়েছেন। সরকার ও বিত্তবানদের উচিৎ তাদের মুখে দু’মুঠো খাবার তুলে দেয়া। রামু উপজেলা প্রশাসন সহ রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের অনেক নেতারা হতদরিদ্র অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সমাজের বিত্তবানদেরও আরো বেশি করে রামুর অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অনুরোধ জানান সাংবাদিক সোয়েব সাঈদ।

জানা গেছে, প্রশাসনিক ও জনকল্যাণমুলক কর্মকান্ডে কক্সবাজার জেলায় সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, রামুর ইউএনও প্রণয় চাকমা। চলমান করোনা পরিস্থিতিতে সচেতনতা সৃষ্টি, বিদেশ ফেরত ব্যক্তিদের হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করা, দ্রব্যমূল্যের কৃত্রিম সংকট ও উর্দ্ধগতি নিয়ন্ত্রণ, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫০ শয্যার করোনা আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টাইন সেবা চালু করা এবং সড়ক ও দোকানপাটে জনসমাগম বন্ধে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে দিনরাত নিরলসভাবে কাজ করছেন তিনি। করোনা সংক্রমণ রোধ ও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রতিদিনই তিনি নিজে গাড়ি চালিয়ে চষে বেড়াচ্ছেন রামুর সমতল-পাহাড় অধ্যুষিত জনপদ। একদিনে তিনি উপজেলার ১১টি ইউনিয়নেই অভিযান পরিচালনা করেছেন। নিজ হাতে হ্যান্ড মাইক নিয়ে উপজেলার সকল হাট-বাজার, বাস স্টেশন ও জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানে মাইকিং করে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সচেতনতামূলক বার্তা প্রচার করেছেন।

রামু উপজেলা স্বাস্থ্য ও প. প. কর্মকর্তা ডা. নোবেল কুমার বড়ুয়া জানান, ইউএনও প্রণয় চাকমা’র পরিশ্রমী উদ্যোগে রামুতে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সার্বক্ষণিক জনসচেতনামূলক কর্মকান্ড পরিচালিত হচ্ছে। উপজেলার সব মানুষের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে তিনি সার্বক্ষণিক খোঁজ খবর রাখেন ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করে যাচ্ছেন।

এছাড়াও ১৯ মার্চ থেকে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং হোম কোয়ারেন্টাইন আইন অমান্যকারী বিদেশ ফেরত ব্যক্তিদের জরিমানা এবং সতর্কতামূলক প্রদক্ষেপ গ্রহন করেছেন। ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালানার মাধ্যমে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কোচিং সেন্টার ও বিদেশ ফেরত ব্যক্তিদের কাছ থেকে ২ লাখ ৩৮ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেন ইউএনও প্রণয় চাকমা।

যাদের বিরুদ্ধে জরিমানা অভিযান পরিচালিত হয়ঃ
১৯ মার্চ রামুর বিটি কোচিং সেন্টারকে ১০ হাজার টাকা, একইদিন দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ঈদগড় বাজারে ৩টি দোকান মালিককে ৮ হাজার টাকা, ২০ মার্চ চৌমুহনী স্টেশন ও ফকিরা বাজারের ৭টি দোকান মালিককে ৮৪ হাজার টাকা, ২২ মার্চ কাউয়ারখোপ বাজার ও বাইপাস এলাকায় ২টি দোকানে ১৬ হাজার টাকা, ২৩ মার্চ গর্জনিয়া বাজার, রামু বাইপাস, কলঘর বাজারের ৬টি দোকান মালিককে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। হোম কোয়ারেন্টাইন আইন না মানার অভিযোগে ৯জন প্রবাসীকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করেন তিনি এবং ১৫ জন বিদেশ ফেরত ব্যক্তিকে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশনা দেন।

রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারের সহকারী পরিচালক ও কক্সবাজার জেলা বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেন, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সরকার শুরু থেকেই সতর্ক অবস্থানে ছিল। ইউএনও প্রনয় চাকমা রামু উপজেলার জনগণকে সুরক্ষিত রাখতে এবং করোনাভাইরাস বিস্তাররোধে নানামুখী কর্মকান্ড শুরু থেকে প্রতিনিয়ত অব্যাহত রেখেছেন। তিনি দিবারাত্রি নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। আমি রামুবাসীর পক্ষ থেকে তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই এবং জনস্বার্থে গৃহিত উনার সকল ভাল উদ্যোগকে আমি সাধুবাদ জানাই। একইসাথে উনাকে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা দেয়ায় জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা’র (এনএসআই) আবু হানিফ’কেও আন্তরিক ধন্যবাদ জানান তিনি।

রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রণয় চাকমা জানান, করোনা ভাইরাস নিয়ে সাধারণ মানুষ আতংকিত। রামু উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে রিক্সা চালক, শ্রমিক, খেটে খাওয়া মানুষ, অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ি আর্থিক সংকটে পড়তে পারে। সংকটময় এ মুহুর্তে তাদের সাহায্যে সরকারের পাশাপাশি সবাইকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসা দরকার। তিনি করোনা সংক্রমন রোধে সবাইকে বাড়িতে অবস্থান করারও অনুরোধ জানিয়েছেন।

ইউএনও আরো বলেন, চলমান করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় এনএসআই প্রতিনিধি আবু হানিফসহ অনেক জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারি, পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তা, সাংবাদিক সহ অনেকে সার্বিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন। এজন্য তিনি সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।