পথচারীদের ঘরে ফেরাতে ১০ পদাতিক ডিভিশনের প্রশংসনীয় উদ্যোগ : কক্সবাজারে করোনা ভাইরাস সংক্রমণরোধে চলছে অঘোষিত লকডাউন

খালেদ শহীদঃ
করোনা ভাইরাস সংক্রমণরোধে কক্সবাজারসহ সারাদেশে চলছে অঘোষিত লকডাউন। আতঙ্কে গণপরিবহণ ও দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। সড়কে নেই জনসমাগম। এ পরিস্থিতিতে কক্সবাজারের জনগণকে সচেতন রাখার সার্বিক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর রামু সেনানিবাসের ১০ পদাতিক ডিভিশন। পর্যটন নগরী কক্সবাজার জেলাসহ বৃহত্তর চট্টগ্রাম জেলার আটটি উপজেলায় সামাজিক দূরত্ব ও হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসনকে সহযোগিতায় কাজ করছে, ১০ পদাতিক ডিভিশন। সড়কে ও বিভিন্ন জনপদে মাইকিং করে, পথচারীদের ফুল দিয়ে ঘরে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছেন সেনা সদস্যরা।

‘সকলে ঘরে থাকুন, নিরাপদে থাকুন। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হবেন না। আতঙ্ক না ছড়িয়ে অন্যকে সহায়তা করুন’। কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে হ্যান্ড মাইক দিয়ে জনসাধারণকে সামাজিক দূরত্ব ও হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে সচেতনামূলক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে রামু সেনানিবাসের ১০ পদাতিক ডিভিশন। পথচারীদের ঘরে ফেরাতে সেনা সদস্যদের এ প্রশংসনীয় উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে স্থানীয় জনতা।

সরেজমিন দেখা যায়, প্রচারণায় সেনাবাহিনী কোন ধরনের গুজবে কান না দিয়ে স্থানীয় জনসাধারণকে ঘরে থাকার আহবান জানানো হচ্ছে। আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন সেনাসদস্যরা। হোম কোয়ারেন্টাইনের নিয়ম মেনে চলতে অনুরোধ করে মাইকিং করা হচ্ছে। কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন সড়ক, ষ্টেশন ও বাজারে সেনাবাহিনীর সদস্যরা পথচারীদের হাতে ফুল দিয়ে অপ্রয়োজনীয় ঘোরাফেরা না করে, বাড়ি ফিরে যেতে অনুরোধ করছেন। সোমবার কক্সবাজার সদর উপজেলা ও রামু উপজেলার বিভিন্ন সড়ক, বাজার ও বাস স্টেশনে এধরনের দৃশ্য দেখা গেছে। সেনাবাহিনীর এমন উদ্যোগকে সম্মান জানিয়ে ঘরে ফিরেছেন পথচারীরাও।

করোনা ভাইরাস সংক্রমণরোধের প্রচারণায় নিয়োজিত এক সেনা কর্মকর্তা জানান, করোনা সচেতনতায় ও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে কাজ করছে সেনাবাহিনী। অযথা বাইরে ঘোরাফেরা করতে দেখা মানুষদের বুঝিয়ে শুনিয়ে ঘরে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। এছাড়াও হোম কোয়ারেন্টাইনের নিয়ম মানাতে কাজ করছে সেনাবাহিনীর সদস্যরা। প্রচারণার পাশাপাশি সেনা সদস্যরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে জীবাণুনাশক ছিটাচ্ছে। পরিস্থিতি অনুকূলে না আসা পর্যন্ত এ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে বলে জানান ওই সেনা কর্মকর্তা।

ঈদগাঁও বাস ষ্টেশনের রিক্সা চালক মনিরুজ্জামান জানান, পেটের দায়ে রিক্সা নিয়ে বাস ষ্টেশনে এসেছি। এমন সময় সেনাবাহিনীর এক সদস্য আমার দিকে এগিয়ে আসে, সেনা সদস্যকে দেখে ভয়ে আমার হাত পা কাঁপছিল। কিন্তু সেনা সদস্য আমার হাতে ফুল দিয়ে সাহস দিয়ে বলেন চাচা ভয় নেই। যদি সম্ভব হয় বাড়ি থেকে একটু কম বের হবেন। রিক্সা চালক মনিরুজ্জামান বলেন, গরিবের প্রতি সেনাবাহিনীর এমন ভালোবাসা দেখে আমার চোখে পানি চলে আসে। আমি সেনা সদস্যদের সম্মান জানাতে সঙ্গে সঙ্গে রিক্সা নিয়ে বাড়ি ফিরে আসি। অনেকেই তার মত বাড়ি ফিরে গেছে বলে জানান তিনি।

আলাউদ্দীন নামে আরেক পথচারী বলেন, বাস স্টেশনে সেনাবাহিনীর গাড়ি দেখে আমি দৌড়ে পালাচ্ছিলাম। এমন সময় এহসান নামের এক সেনাসদস্য গাড়ি থেকে নেমে, পথচারীদের ফুল দিতে দেখে আমিও এগিয়ে যাই। আমার হাতেও ফুল ধরিয়ে দেন ওই সেনা সদস্য। আলাউদ্দিন বলেন, পথচারীদের সবার হাতে ফুল দিয়ে সেনাবাহিনীর সদস্যরা করোনা ভাইরাস সম্পর্কে অবগত করছেন। এবং বাজারে অযথা ঘোরাঘুরি না করে বাড়িতে অবস্থান করার অনুরোধ জানাচ্ছেন।

রামু সেনানিবাস সূত্রে জানা যায়, কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায় সোমবার (৩০ মার্চ) বিভিন্ন স্থানে প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ ১০ পদাতিক ডিভিশনের সেনা সদস্যরা স্থানীয় জনসাধারণ এবং সেখানে বসবাসরত জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মায়ানমার নাগরিকদের মাঝে করোনা ভাইরাস সচেতনতা প্রচারণা চালান। তাদের হাতে ফুল দিয়ে বাড়ি ফেরার জন্য অনুরোধ করেন। সেনাসদস্যরা ক্যাম্প পর্যায়ে রোহিঙ্গা মাঝি ও স্বেচ্ছাসেবকদের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করেন। সহযোগী সংস্থাসমূহের মাধ্যমে বার্মিজ ও ইংরেজী ভাষায় লিফলেট বিতরন করেন। পাশাপাশি সকল রোহিঙ্গা ক্যাম্পসমূহে দিনব্যাপি বার্মিজ ও রোহিঙ্গা ভাষায় সচেতনতামূলক মাইকিং করার কার্যক্রম চলমান রেখা হয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পসমূহে সেনাবাহিনীর নতুন নতুন চেকপোস্ট স্থাপনের মাধ্যমে জনসাধারণ ও সকল ধরনের যান চলাচল সীমিত করা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের বিনা প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ করার কাজে স্থানীয় প্রশাসনকে সহযোগিতা করছেন। সরকারের নির্দেশিত লক্ষ্যসমূহ বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথ টহলদল তথা বিজিবি, পুলিশ, র‍্যাব ও আনসার সদস্যরা একসাথে নিরলসভাবে কাজ করছেন। স্থানীয় প্রশাসনও নিত্যপণ্যের দোকান, ফার্মেসী ছাড়া অন্যান্য দোকানপাট ও জনসমাগমস্থল বন্ধ করে দিয়েছে।