দীর্ঘায়ু পেতে ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ

লাইফস্টাইল ডেস্কঃ
রাগের বাহ্যিক প্রকাশটা যেমনই হোক না কেনো- শরীর, মন ও সম্পর্কের ওপর এর প্রভাব সবসময়ই ধ্বংসাত্বক।

রাগ উঠতেই পারে। তবে এই অনুভূতি কখনই সুখকর নয়। রাগের বহিঃপ্রকাশও মানুষভেদে ভিন্ন। কেউ চেপে রেখে স্বাভাবিক থাকতে পারেন তো কেউ আবার তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠেন।

ক্যালগেরি, অ্যালবার্টার মনবিজ্ঞানী প্যাট্রিক কিলান বলছেন ভিন্ন কথা।

সম্পর্কবিষয়ক একটি ওয়েবসাইটে এই বিষয়ের ওপর প্রকাশিত প্রতিবেদনে তিনি বলেন, “অধিকাংশ মানুষ মনে করেন তাদের রাগ দমিয়ে রাখতে হবে। তবে রাগও কিন্তু স্বাস্থ্যকর হতে পারে। রাগ একটি আবেগ যা ইঙ্গিত করে যে আপনার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে এবং অপছন্দনীয় সেই ব্যাপারটা নিয়ে বোঝাপড়া হওয়া জরুরি। যখন একজন মানুষ সেই ইঙ্গিতে সাড়া দিয়ে প্রকৃত অর্থে বোঝাপড়া করবে তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা ওই ব্যক্তির জন্য মঙ্গলই বয়ে আনে।”

সমস্যা হল, সমাজব্যবস্থা মানুষকে শিখিয়েছে নিজেদের আবেগকে দমিয়ে রাখতে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই আবেগের দমন স্বাস্থ্যের জন্য কখনই ভালো নয়।

নিউ ইয়র্কের ‘ইউনিভার্সিটি অফ রোচেস্টার’য়ের গবেষকরা ‘জার্নাল অফ সাইকোসোমাটিক রিসার্চ’ নামক জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় জানিয়েছেন, “যারা নিজেদের আবেগ চেপে রাখে তাদের দ্রুত মৃত্যুবরণ করার আশঙ্কা যারা মন খুলে নিজের আবেগ প্রকাশ করেন তাদের তুলনায় কয়েকগুন বেশি। যখন মানুষ রেগে যায় তখন মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী হরমোন ‘অ্যাড্রেনালিন’ ও ‘কর্টিসল’ নিঃসৃত হয়। এই হরমোনগুলো ‘টাইপ টু ডায়াবেটিস’, হতাশাগ্রস্ততা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থেকে সৃষ্ট রোগ ইত্যাদি ডেকে আনে।”

তবে রাগকে কি প্রশ্রয় দেওয়া উচিত? উত্তর হচ্ছে, না।

কিলান বলেন, “রাগ দমানোর সাধারণ উপায় হল উগ্র আচরণ। তবে গবেষণা বলে এই উগ্র আচরণ রাগ কমায় না বরং আরও বাড়ায়। শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতে সামান্য রাগে উগ্র আচরণের আশঙ্কাও বাড়ায়। এই উগ্র আচরণের কারণে পরিবার, বন্ধু, সহপাঠী, সহকর্মীদের সঙ্গে আপনার সম্পর্কের যে ক্ষতি হবে তা সবাই অনুধাবন করতে পারছেন।”

স্বাস্থ্যের ওপরেও ধ্বংসযজ্ঞ চালাবে রাগ। বিশেষজ্ঞদের মতে, যাদের একবার ‘হার্ট অ্যাটাক’ হয়েছে তাদের অধিকাংশই আক্রান্ত হওয়ার আগে রাগান্বিত ছিলেন। রাগের কারণে বেড়ে যাওয়া রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন হৃদযন্ত্রের ওপর প্রচণ্ড চাপ ফেলে। ফলে যার হৃদযন্ত্রের রক্তনালীতে এরই মধ্যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে, রাগান্বিত অবস্থায় তাদের হৃদযন্ত্রের রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বেশি।

অপরদিকে রাগ চেপে রাখা হয়ত উচিত নয়। তবে উগ্র আচরণ কখনই ভালো নয়। তাই উগ্র আচরণকে দমানোর কৌশল রপ্ত করতে হবে। জানতে হবে কোন বিষয়গুলো আপনার উগ্রতাকে উসকে দেয়।

এজন্য রাগের আরও গভীরে যেতে হবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাগের পেছনে থাকে ভয়, মানসিক অস্বস্তি, হতাশা, অপরাধবোধ। স্বামী বা স্ত্রী দেরিতে বাড়ি ফেরার কারণে আপনার যে রাগ হচ্ছে তার পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে তার দুর্ঘটনার কবলে পড়ার শঙ্কা।

পাশাপাশি প্রতিদিন যে বিরক্তিগুলো আপনার মেজাজ খিটখিটে করে তোলে সেগুলোও আমলে নিতে হবে, সামলাতে হবে।

রাগ সামলানোর একটি মোক্ষম উপায় হতে পারে রাগের কারণটা নিয়ে আলোচনা করা।

ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার গবেষকরা ‘ব্রেইন ইমেজিং’য়ের মাধ্যমে দেখিয়েছেন, রাগের মাথায় রাগের কারণটা প্রকাশ করার মাধ্যমে মস্তিষ্কের ‘অ্যামিগডালা’ অংশকে শিথিল করা সম্ভব।

মস্তিষ্কের এই অংশই রাগের সময় ‘অ্যাড্রেনালিন’ ও ‘কর্টিসল’ নিঃসরণ করে।

‘ব্রিটিশ কলোম্বিয়ার ভ্যানকুভারের মনবিজ্ঞানী ডায়ানা ম্যাকিনটস বলেন, “কোনো কিছু পছন্দ না হলে তা মুখ ফুটে বলা অত্যন্ত মুল্যবান। কারণ প্রতিবাদই ওই ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধ করার সুযোগ তৈরি করে।”

রাগের কারণ বর্ণণা করার আগে মাথা ঠাণ্ডা করে নেওয়াও জরুরি। এতে হরমোনের প্রভাব সিথিল হবে এবং গুছিয়ে নিজের রাগের কারণ ব্যাখ্যা করতে পারবেন।

লম্বা দম নেওয়া কিংবা হালকা শারীরিক কসরত করার মাধ্যমে রাগ কমিয়ে আনা সম্ভব, বিশেষজ্ঞরা এরসঙ্গে একমত।

যখন রাগের কারণ ব্যাখ্যা করবেন মনযোগ দিতে হবে রাগ সৃষ্টিকারী ঘটনা এবং তা আপনাকে কেনো রাগান্বিত করছে সেই বিষয়গুলোর ওপর। যার ওপর রাগ হয়েছে তার ব্যক্তিগত দিকগুলো থেকে দূরে থাকতে হবে।

দুর্ব্যবহার, গালাগালি থেকে বিরত থাকতে হবে। এক ঘটনা দিয়ে পুরো মানুষটাকে বিচার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

সূত্রঃ বিডিনিউজ