কমছে বইয়ের দাম

অনলাইন ডেস্কঃ
‘উপহার’ দেওয়া বন্ধ করে কমানো হচ্ছে বইয়ের দাম। আগামী পহেলা জানুয়ারি থেকে দাম কমানো হচ্ছে সব ধরনের বইয়ের। পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে পাঠ্যসহায়ক বই, রেফারেন্স বুক, প্র্যাকটিস বুক, অনুশীলন বই, র‌্যাপিড রিডার, মাদ্রাসার বই, কলেজের বই এবং পাঠ্যপুস্তকের বাইরে অন্যান্য সাধারণ বইয়েরও দাম কমানো হচ্ছে। সর্বনিম্ন ২০ শতাংশ থেকে দাম কমবে সর্বোচ্চ ৪২ শতাংশ পর্যন্ত। আর ১৩ দিন পর আগামী পহেলা জানুয়ারি থেকেই সারাদেশে কম দামে বই কিনতে পারবেন ক্রেতারা।

বাংলাবাজার ঘুরে পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতাদের কাছ থেকে এ তথ্য জানা গেছে। তারা জানান, বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির (বাপুস) সিদ্ধান্তে বইয়ের বাজারে মূল্যের এ বিরাট পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। বইয়ের দাম কমানোর এই সিদ্ধান্ত দেশের শিক্ষার্থী ও পাঠকদের মধ্যে বিরাট স্বস্তি বয়ে আনবে বলে মনে করছেন সংশ্নিষ্টরা। বাপুস সভাপতি আরিফ হোসেন ছোটন সমকালকে বলেন, ‘২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে সব ধরনের বইয়ের দাম কমবে। দেশের লাখ লাখ ছাত্রছাত্রী ও পাঠকদের কথা চিন্তা করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ছাপা হয়ে গেছে এসব বই। নতুন মূল্য তালিকা করে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের সব লাইব্রেরি একই মূল্যে বই বিক্রি করবে।’ তিনি জানান, মূল্য কমানো হলেও বইয়ের মানের প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না।

অবশ্য তিন ধরনের বইয়ের দাম এখনই কমছে না। সেগুলো হলো- গল্প, উপন্যাস ও সাহিত্য। পর্যায়ক্রমে সৃজনশীল এসব বইয়ের মূল্য কমানোর প্রচেষ্টাও অব্যাহত থাকবে বলে প্রকাশকরা জানিয়েছেন।

জানা গেছে, আগামী পহেলা জানুয়ারি থেকে গায়ের মূল্যে (বইয়ে মুদ্রিত মূল্যে) সারাদেশে বই বিক্রি হবে। মূল্য কমিয়ে প্রকৃত মূল্য এখন থেকে ছাপা হবে বইয়ে। সেই দামেই বই বিক্রি হবে। বই বিক্রিতে ক্রেতাকে কোনো কমিশন দেওয়া হবে না। বাপুসের সদস্য সারাদেশের ২৬ হাজার লাইব্রেরি এ নিয়ম মেনে চলবে।

এসব সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করে বাপুসের সহসভাপতি শ্যামল পাল সমকালকে বলেন, ‘পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি মনে করে, বই প্রকাশ একটি সেবামূলক ব্যবসা। তাই জাতীয় স্বার্থে বইয়ের দাম কমানো হচ্ছে। আসছে নতুন শিক্ষাবর্ষ থেকে ছাত্রছাত্রীরা এই কম মূল্যের সুফল পাবে।’ তিনি উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, ‘গতবার (এ বছর) ষষ্ঠ শ্রেণির একটি ইংরেজি গ্রামার বইয়ের মূল্য ছিল ৪৪৫ টাকা। আসছে জানুয়ারি থেকে তা হবে ২৬৫ টাকা। একই শ্রেণির বাংলা ব্যাকরণ বইয়ের মূল্য এখন ৩৯০ টাকা। এটির দাম হবে ২২৪ টাকা। গল্প, উপন্যাস ও সাহিত্য ছাড়া সব ধরনের বইয়ের দাম কমানো হচ্ছে। এ ছাড়া বিসিএস গাইড, সাধারণ জ্ঞানসহ সব ধরনের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার সঙ্গে সংশ্নিষ্ট বইয়ের দামও কমানোর প্রক্রিয়া চলছে।’

মূল্য কমানোর নেপথ্যে :’রাতারাতি কীভাবে এত দাম কমানো হচ্ছে? এতদিন কি তবে অতিরিক্ত দামে বই বিক্রি করা হতো?’ জানতে চাইলে একাধিক প্রকাশক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বই বিক্রির পরিমাণ বাড়ানোর জন্য বাজারে অশুভ প্রতিযোগিতা ছিল। প্রকাশকরা নানা কৌশলে বিক্রি বাড়াতে বইয়ের দাম বেশি ধরে অতিরিক্ত কমিশন দিতেন বিক্রেতাদের। আবার কোনো কোনো প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বড় বড় স্কুল-কলেজের সঙ্গে অলিখিত চুক্তিতে আবদ্ধ হতেন। সেই সব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ওই নির্দিষ্ট প্রকাশনীর বই কিনতে বাধ্য করা হতো। এর বাইরেও স্কুল পরিচালনা কমিটির লোকদের মোটা অঙ্কের ডোনেশন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফ্রিজ কিনে দেওয়া, কমিটির সভাপতি বা অধ্যক্ষের অফিসে শীতাতপ যন্ত্র বসিয়ে দেওয়া, বিভিন্ন শিক্ষক সমিতির নেতাদের ‘উপহার’ ও ‘উপঢৌকন’ দেওয়াসহ নানা কারণে বইয়ের দাম বেড়ে যেত। আবার জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বই বিক্রেতারা (লাইব্রেরির মালিকরা) স্থানীয় পর্যায়ে অনেক স্কুল ও মাদ্রাসার সঙ্গে বই বিক্রির অপ্রকাশ্য চুক্তিতে আসতেন। এসব কারণেও নানাভাবে বইয়ের দাম বেশি রাখা হতো।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নানা মহলে ‘উপহার’ ও ‘উপঢৌকন’ দিতে অতিষ্ঠ ব্যবসায়ীরা চলতি বছর চূড়ান্তভাবে বেঁকে বসেছেন। এ বছরের ২০ মার্চ রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির (বাপুস) বার্ষিক সাধারণ সভায় সারাদেশ থেকে আসা বই বিক্রেতা ও মুদ্রকরা বলেন, ঘাটে ঘাটে কমিশন আর উপহার দিতে না হলে বইয়ের দাম অনেক কম রাখা সম্ভব। দিনভর নানা আলোচনা শেষে ওই সভায়ই সিদ্ধান্ত হয়, ২০২০ সাল থেকে বই বিক্রিতে সব ধরনের উপহার প্রথা বন্ধ করে

দিয়ে দাম কমানো হবে। পাশাপাশি কমিশন কমিয়ে এবং ক্যাশব্যাক প্রথা বন্ধ করে বইয়ে লাভ কমাতেও সিদ্ধান্ত নেন তারা। এই প্রক্রিয়ায় বইয়ের দাম বর্তমান মূল্যের চেয়ে ৪২ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব হবে। এতে ৪০০ টাকার একটি বই মাত্র ১৬৮ টাকায় পাবেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতারা সমকালকে জানান, বর্তমানে বিক্রেতারা বইয়ের দামের ১৫ শতাংশ কমিশন পান। বছর শেষে ক্যাশব্যাক হিসেবে পান ১৫ শতাংশ। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটি এবং শিক্ষক ও শিক্ষক সমিতিগুলোকে উপহার-উপঢৌকন হিসেবে আরও ১০ শতাংশ অর্থ ব্যয় করেন বইপ্রতি। এসব বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তের কারণে আসছে নতুন বছরে সব মিলিয়ে বইয়ের দাম ৪২ শতাংশ পর্যন্ত কমবে। বাপুস সভাপতি আরিফ হোসেন ছোটনসহ একাধিক প্রকাশক নেতা বইয়ের দাম কমানোর এসব সিদ্ধান্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

পুঁথি নিলয়ের স্বত্বাধিকারী শ্যামল পাল বলেন, ‘বাপুসের সভায় আসছে জানুয়ারি থেকে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ মূল্য কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল, অথচ আমরা ৪২ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পেরেছি।’ তিনি বলেন, নতুন সিদ্ধান্তের ফলে পুস্তক প্রকাশ ও বিক্রির ক্ষেত্রে যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও কার্যকলাপ চলছিল, তা বন্ধ হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে বইয়ের মূল্য উচ্চ, এই অভিযোগ আর থাকবে না। নতুন সিদ্ধান্তে বেশিরভাগ বইয়ের মূল্য ২০০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে চলে আসবে। বই আসবে হাতের নাগালে।

বই ব্যবসায়ীরা জানান, আগে যে বইয়ের গায়ে মূল্য ৬০০ টাকা লেখা থাকত, তা ক্রেতারা দামাদামি করে সাড়ে তিনশ’ থেকে চারশ’ টাকায় কিনতেন। তার পরও ঠকতেন। এখন নির্ধারিত মূল্যে বই বিক্রি হওয়ায় সব ক্রেতা একই মূল্যে বই কিনবেন। ওষুধের দোকানের মতো লাইব্রেরিগুলোতেও আগামীতে আর কোনো দরকষাকষি থাকবে না।

বিক্রেতা সমিতির নেতা কায়সার-ই আলম প্রধান, শরীফ উল আলম, মির্জা আলী আশরাফ কাসেম সমকালকে বলেন, নির্ধারিত মূল্যেই কমিশন ছাড়া বই বিক্রি, নকল বই রোধে তাদের সমিতি কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। সমিতির সিদ্ধান্তগুলো সমিতি নীতিমালা আকারে প্রকাশ করছে এরই মধ্যে।

বইয়ের নতুন মূল্য যেভাবে নির্ধারণ হবে :আগামীতে প্রকাশিত হতে যাওয়া সব ধরনের বইয়ের একটি নির্ধারিত মূল্য তালিকা তৈরি করেছে বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি। এ তালিকা অনুসারে ডাবল ডিমাই সাইজের প্রতিটি বইয়ের প্রতি ফর্মার মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম ৫০ ফর্মা, প্রতি ফর্মার মূল্য ধরা হবে তিন টাকা দশ পয়সা। পরবর্তী প্রতি ফর্মা ৫১ থেকে ১০০ ফর্মা পর্যন্ত পর্যন্ত ২ টাকা ৮০ পয়সা, ১০১ থেকে ১৫০ ফর্মা ২ টাকা ৫০ পয়সা এবং ১৫১তম ফর্মা থেকে তদূর্ধ্ব পর্যন্ত প্রতি ফর্মার মূল্য ধরতে হবে ২ টাকা ২০ পয়সা। এর সঙ্গে চার রঙা কভার ১৫ টাকা ও ইনার ১২ টাকা যোগ করতে হবে। এভাবে প্রতিটি বইয়ের মূল্য নির্ধারিত হবে।

বইয়ের আকারও ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। ষষ্ঠ থেকে দশম (মাধ্যমিক) শ্রেণির বইয়ের মধ্যে ষষ্ঠ শ্রেণির ইংরেজি গ্রামার বই সর্বোচ্চ হবে ৮০ ফর্মা, বাংলা ব্যকরণ ৬৫ ফর্মা। এভাবে সপ্তম শ্রেণির ইংরেজি গ্রামার ৮৫ ও বাংলা ব্যকরণ ৭৫ ফর্মা, অষ্টম শ্রেণির ইংরেজি গ্রামার ১০৫ ও বাংলা ব্যকরণ ৯০ ফর্মা, নবম শ্রেণির ইংরেজি গ্রামার ১৩০ ও বাংলা ব্যকরণ ১২৫ ফর্মার বেশি হবে না। এভাবে বিভিন্ন ধরনের বইয়ের আকার, আকৃতিও নির্ধারণ করা হয়েছে।

সূত্রঃ সমকাল