মুজিববর্ষের কর্মসূচি

অনলাইন ডেস্কঃ
আগামী বছর দেশে পালিত হবে ‘মুজিববর্ষ’। স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে সরকার আগামী বছরকে মুজিববর্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছে। বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ১৭ মার্চ শুরু হয়ে মুজিববর্ষের কর্মসূচি চলবে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত। ২০২১ সাল দেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি হওয়ায় মুজিববর্ষেও সঙ্গে সঙ্গেও সুবর্ণ জয়ন্তীর কর্মসূচিও পালিত হবে। ইতোমধ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে মুজিব বর্ষের ক্ষণগণনার সময়সূচিও। জাতির পিতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস ১০ জানুয়ারি থেকে শুরু হবে এই ক্ষণগণনা।

মুজিববর্ষ উপলক্ষে সরকারিভাবে পালিত হবে নানা কর্মসূচি। ইতোমধ্যে প্রায় সবগুলো কর্মসূচির খসড়া প্রণয়ন সম্পন্ন হয়েছে। চলছে মুজিববর্ষের থিম সং ও লোগো নির্বাচনের কার্যক্রম। জাতীয় কর্মসূচির পাশাপাশি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দফতর এজন্য পৃথক পৃথক কর্মসূচি পালন করবে। এসব মন্ত্রণালয় ও দফতর জনগণকেও দেবে বিশেষ ধরনের সেবা। সরকার ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনও নিজস্ব কর্মসূচির মাধ্যমে মুজিব বর্ষ পালন করবে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ একাধিক রাজনৈতিক দলও জাঁকজমকপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালনের কর্ম পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুজিব বর্ষের কর্মসূচির নানাদিক তুলে ধরেছেন।

মুজিববর্ষ পালনে জাতীয় পর্যায়ে গঠন করা হয়েছে দুটি কমিটি। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি গঠিত হয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় এবং জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি। উদযাপন কমিটির আহ্ববায়ক করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। আর বাস্তবায়ন কমিটির আহ্ববায়ক হয়েছে জাতীয় অধ্যাপক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামকে। দুটো কমিটিতেই সরকারের উধ্বর্তন কর্মকর্তা, বরেণ্য রাজনীতিক, সাহিত্যিক, সাংবাদিকসহ স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিবর্গকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

মুজিববর্ষ সফল করতে গত এপ্রিলে জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির সভা করা হয়। ওই সভায় গঠন করা হয় ৮টি উপকমিটি। এগুলো হলো সেমিনার, ওয়ার্কশপ, আলোচনা সভা আয়োজন উপকমিটি; আন্তর্জাতিক কর্মসূচি যোগাযোগ উপকমিটি’ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রদর্শনী আয়োজন উপকমিটি; প্রকাশনা ও সাহিত্য অনুষ্ঠান উপকমিটি; আন্তর্জাতিক প্রকাশনা অনুবাদ উপকমিটি; ক্রীড়া ও আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজন উপকমিটি; মিডিয়া প্রকাশ ও ডক্যুমেন্টেশন উপকমিটি এবং চলচ্চিত্র তথ্য চিত্র উপকমিটি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব উপকমিটি তাদের কর্মসূচি প্রণয়ন করে ইতোমধ্যে জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির কাছে হস্তান্তর করেছে। উপকমিটি ছাড়াও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দফতর থেকে কর্মসূচির প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এসব প্রস্তাব পর্যালোচনা করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের নিরীখে তাৎপর্যপূর্ণ ও গুরুত্ববহ বিষয়গুলো সমন্বয় করে একটি বিষয়ভিত্তিক কর্ম পরিকল্পনা প্রস্তুত করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দফতর, বিভাগ ইতোমধ্যে নিজ নিজ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। কেন্দ্রীয় তদারকির বাইরেও জেলা উপজেলা প্রশাসন, সরকারি বেসরকারি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্থা জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে নিজস্ব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে।

কর্মপরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে তথ্য ও যোগোযোগ বিভাগের মুজিব বর্ষের ওয়েবসাইট তৈরি, লোগো নির্বাচন ও উন্মোচন, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের থিম সং নির্বাচন, জাতীয় সংসদে বিশেষ অধিবেশন আয়োজন, মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয় কর্তৃক বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের জন্মদিন পালন, মন্ত্রিপরিষদের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর নামে একটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রবর্তন, বাংলা ও ইংরেজিতে জন্মশতবার্ষিকী স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ইউনেস্কোতে বঙ্গবন্ধুর নামে পুরস্কার প্রবর্তন, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন ও বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিশ্বের আরও ৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু চেয়ার স্থাপন, ইউনিভার্সিটি অব ক্যামব্রিজে বঙ্গবন্ধু সেন্টার স্থাপন, লন্ডনে মাদাম তুসো জাদুঘর ও জাতিসংঘ সদর দফতরে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপন, উইমেন, পিচ অ্যান্ড সিকিউরিটি শীর্ষক আন্তর্জাতিক সেমিনারের আয়োজন, জুলিও কুরি পদক প্রাপ্তি দিবস উদযাপন, কফি টেবিল বই প্রকাশ; বঙ্গবন্ধুর সাত মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ ইংরেজি ছাড়াও হিন্দি, উর্দু, ফরাসি, জার্মান, চাইনিজ, আরবি, ফারসি, স্প্যানিশ, রুশ, ইতালীয়, কোরীয় ও জাপানি-এই ১২টি ভাষায় অনুবাদ। জাতীয় বাস্তবায়ন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বঙ্গবন্ধুর বায়োগ্রাফি প্রকাশ। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম কর্তৃক বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকী উদযাপন ও বাংলাদেশকে কান্ট্রি অব ফোকাস হিসেবে উপস্থাপন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে অনুবাদগ্রন্থ প্রকাশ (১ম পর্ব)। পরে জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সিআরআই যৌথ উদ্যোগে অনুবাদ গ্রন্থ (২য় পর্ব) প্রকাশ করবে। বাংলা একাডেমি বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মভিত্তিক একশটি প্রকাশনা করবে, আগামী বছরের অমর একুশে বই মেলা ও ঢাকা লিট ফেস্ট উৎসর্গ হবে বঙ্গবন্ধুর নামে। তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জন্য ২ থেকে ৩ মিনিটের ২৪টি খণ্ড ভিডিও চিত্র নির্মাণ,৬-১০ মিনিটের ৭টি ওয়েব সিরিজ, ১২টি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচিত্র, ১০ মিনিট ব্যাপ্তির ৬টি অ্যানিমেটেড শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং বিদেশে মিডিয়া কনফারেন্সের আয়োজন করা হবে।

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক গোল্ডকাপ ফুটবলের আয়োজন করবে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ভাঙ্গায় শেখ মুজিবুর রহমান মানমন্দির স্থাপন করবে, শিল্প মন্ত্রণালয় শিল্প পুরস্কার প্রদান করবে। মন্ত্রিপরিষদ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সদ্য স্বাধীন দেশ পুনর্গঠন ও প্রশাসনিক সংস্কার বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর কর্মসূচি নিয়ে গবেষণা সেমিনার ও কর্মশালার আয়োজন করবে। মন্ত্রিপরিষদ জাতির পিতার সঙ্গে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করেছেন তাদের তালিকা সংগ্রহ করে যথাযথ সম্মাননা প্রদান করবে।

বঙ্গবন্ধু তার শাসনামলে যেসব আইন বিধি, নীতিমালা জারি করেছিলেন সেগুলো একীভূত করে প্রকাশ করবে আইন মন্ত্রণালয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্ট, বঙ্গবন্ধুর জীবনীর ওপর রচনা প্রতিযোগিতাসহ নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। মুজিব বর্ষের মধ্যে শতভাগ বিদ্যুৎ সরবরাহ করার পরিকল্পনা নিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় জন্মশতবার্ষিকীর শুরু থেকে আজীবন মুক্তিযোদ্ধাদের যাতায়াতে নদীবন্দর ও ফেরিতে টোল ফ্রি সুবিধা দেবে। এছাড়া সরকারি স্টিমারেও ফ্রি যাতায়াতের সুবিধাও পাবেন তারা। এ মন্ত্রণালয় দুটি সেমিনার, তুরাগ নদের তীরে লেজার শো প্রদর্শনসহ নদীকেন্দ্রিক বঙ্গবন্ধুর কার্যক্রম ও ভ্রমণ স্মৃতি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের সংকলন ও তথ্যচিত্র প্রকাশ করবে। বঙ্গবন্ধু বিদেশি অতিথিদের নিয়ে নৌ ভ্রমণ করেছেন সে বিষয়েও ছবির অ্যালবাম করা হবে। তথ্য মন্ত্রণালয় ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য সংহত করার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর যুগান্তকারী পদক্ষেপগুলো ব্যাপকভাবে প্রচার করবে।

সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল আন্তর্জাতিক সেমিনারের আয়োজন, সেনা, নৌ ও বিমান স্ব স্ব কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বিজিবি, আনসার, বিডিসি পুলিশ র‌্যাব নিজস্ব কর্মসূচি প্রস্তত করছে। বিমান বাহিনী অ্যারোবেটিস বিমান শো ও প্রদর্শনীর আয়োজন করবে। নৌবাহিনী যুদ্ধ জাহাজ প্রদর্শনী ও জনসাধারণ তা যাতে দেখতে পারে তার ব্যবস্থা করবে। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে থাকবে নানা কর্মসূচি। এছাড়া বঙ্গবন্ধু যেসব থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি পরিদর্শন করেছেন সেগুলো থেকে তার পরিদর্শনের নোট ও স্বাক্ষর সংগ্রহ করবে পুলিশ বাহিনী। বঙ্গবন্ধুর সহচর্য ছিলেন এমন পুলিশ সদস্যদের সাক্ষাৎকার নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক প্রামাণ্য চিত্রও করবে পুলিশ বাহিনী। বিজিবির সীমান্তে পরিত্যক্ত বাছাইকৃত বিওপিগুলোকে বঙ্গবন্ধু শিক্ষা নিকেতন হিসেবে তৈরি করে বয়স্কদের সান্ধ্য ও শিশুদের প্রভাতী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করবে।

মুজিববর্ষ উপলক্ষে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ৮৯টি ইভেন্টে টুর্নামেন্ট আয়োজন করবে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে ৫০টি হবে জাতীয় ও ৩৯টি হবে আন্তর্জাতিক ইভেন্ট। সকল খেলাধুলা বঙ্গবন্ধুর নামে হবে। এছাড়া গাজীপুর, জামালপুর, কুড়িগ্রাম ও বগুড়ায় নৌকাবাইচের আয়োজন করবে। দেশীয় ও লোকজ খেলা আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় চৌদ্দ হাজার অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাকে বাড়ি করে দেবে। মুজিব বর্ষে মুক্তিযোদ্ধাদের উপহার হিসেবে এ প্রকল্প কাজ উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ২০২০ সালের মার্চ থেকে টানা ১৩ মাস প্রতি মাসের ১৭ তারিখে ১৭টি রুটের টিকিটে অনলাইনে ক্রেতাদের প্রথম ১৭ জনকে টিকিট মূল্যের ১৭ শতাংশ ছাড় দেবে। এছাড়া বাংলাদেশ হতে ছেড়ে যাওয়া বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের যাত্রীদের মুজিববর্ষের লোগো সম্বলিত উপহার প্রদান করবে।

পর্যটন করপোরেশন বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে ১৭ মার্চ ১০০ পাউন্ডের কেক তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীকে উপহার দেবে। কক্সবাজারে তারা কার্নিভাল ও সার্ফিং উৎসবের আয়োজন করবে। তারা ঐতিহাসিক মুজিবনগর ও জাতির পিতার সমাধি টুঙ্গিপাড়ায় প্যাকেজ ট্যুর পরিচালনা করবে। ঢাকা-চাঁদপুরে একটি ইলিশ প্যাকেজের আয়োজন করা হবে।

মুজিববর্ষে দশটি বিশাল ক্যানভাসে ছবি আঁকবেন দেশের প্রখ্যাত দশজন শিল্পী। আট ফুট দৈর্ঘ্য ও ২৪ ফুট প্রস্থের ভিন্ন আঙ্গিকে নিখুঁতভাবে উদ্ভাসিত হবেন বঙ্গবন্ধু। প্রতিটি ছবিতেই ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে আঁকা হবে জাতির পিতাকে।

সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন