আমাগো সাকিব

ক্রীড়া ডেস্কঃ
অন্ধকার তখনও গাঢ় আকার ধারণ করেনি। গলির মোড়ের চা দোকানটায় দুই-চারজনের আনাগোনা। হঠাৎ চিৎকারের শব্দ কানে আসল। ডান দিকে মাথা ঘোরাতেই দেখলাম ৬০-ঊর্ধ্ব বয়সের একজন ছুটে আসছেন, মুখে তার চওড়া হাসি। এবার শরীরের দিকে চোখ পড়া মাত্র একটু অবাক! লাল-সবুজের জার্সি, আর পেছনের নামটা সাকিব আল হাসানের। কৌতূহল আরও বাড়ল, ডাক দিয়ে কিছু জানার আগেই তিনি দোকানিকে বললেন- ‘দেখলা আমাগো সাকিব আজ কী করছে।’

দৃশ্যটা গত বছরের ১১ ডিসেম্বরের, ঢাকায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ দ্বিতীয় ওয়ানডে ম্যাচের দিন। যে ম্যাচে ৬২ বলে ৬৫ করেছিলেন সাকিব। বোলিংয়ে এসে শিকারের দেখা না পেলেও থমকে দেন ক্যারিবিয়ান রানের চাকা। ১০ ওভারের স্পেলে সেদিন খরচ করেন মোটে ২৮ রান। এই না হলে ক্রিকেট, এই না হলে সাকিবপ্রীতি। এখন যখন বিশ্বকাপের মতো মহারণ সামনে হাজির, তখন নিশ্চয়ই বাংলার অলিগলিতে এমন অনেক সাকিবভক্তের দেখা মিলবে। যাদের চোখেমুখে হাজারো স্বপ্ন, অসংখ্য প্রত্যাশা, এবারের বাংলাদেশ যাবে বহুদূর। যে পথে প্রিয় তারকা সাকিব হবেন অন্যতম সারথি। অবশ্য শুধু সাকিব নয়, এক লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটারে এমন অনেকে আছেন যারা ক্রিকেটকে মনে-প্রাণে লালন করেন। লালন করেন বাংলাদেশের নাম্বার ‘৭৫’। তার ওপর এ অঞ্চলের আমজনতার মধ্যে ২২ গজের প্রতি দরদটাও যেন বিনি-সুতোর বাঁধনের মতো। আর সেটা যদি হয় কোনো গ্রেটেস্ট শো-বিশ্বকাপ, তাহলে তো কথাই নেই।

দীর্ঘ একটা পরিক্রমা। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বিশ্বমঞ্চে পা রাখা। অর্জনের পাল্লাও তেমন একটা ভারী না। তবু আত্মবিশ্বাস, একবুক আশা আর স্বপ্নের তরী বেয়ে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে নোঙর করার যে আপ্রাণ চেষ্টা, সেটা অবশ্য এ দেশের ক্রিকেটারদের এগিয়ে যাওয়ার একটা খোরাক। প্রতিবার কোনো কোনো দলকে হারিয়ে চমকে দেওয়ার মতো অতীত সেই সাক্ষ্যই দিচ্ছে। এই গত বিশ্বকাপের কথাই মনে করি, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দারুণ এক বাংলাদেশের উচ্ছ্বাস দেখল বিশ্ব। সেই উচ্ছ্বাসের উপলক্ষ এনে দিতে টাইগারদের কয়েকজন বোধ হয় পণ করে নেমেছিলেন ২২ গজে। তাদের একজন এই সাকিব। কেবল একবার নয়, ২০০৭ থেকে ২০১৫- এই সময়ের মধ্যে তিনবার বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে ব্যাটে-বলে উপহার দিয়েছেন অনেক কিছু। পরিসংখ্যানও সেই কথা বলবে। ২১ ম্যাচ থেকে করেছেন ৫৪০ রান। পাশাপাশি উইকেট নেন ২৩টি। এমন ঝকঝকে পারফরম্যান্স কার্ডের মালিক যিনি তাকে নিয়ে আশায় বুক বাঁধা যায়। ক্রিকেটবোদ্ধারাও তেমন আভাস দিয়ে রেখেছেন। কেউ কেউ সাকিবকে রেখেছেন ডেঞ্জারম্যানের কাতারে। কারও চোখে তিনিই হবেন টাইগারদের তুরুপের তাস। আবার কেউ বসিয়েছেন মিস্টার অলরাউন্ডারের আসনে।

যদিও রিহার্সেলটা ভালো হয়নি সাকিবের। বেরসিক বৃষ্টি পাকিস্তানের বিপক্ষে নামতে দেয়নি বাংলাদেশকে। আরেক ম্যাচে ভারতীয় বোলারদের ভেলকিবাজির রহস্য ভেদ করতে পারেননি সাকিব। তাতে রানের খাতা খোলার আগে ফিরতে হয় সাজঘরে। তার আগে বল হাতে আবার ভালোই নাড়িয়েছেন প্রতিপক্ষের ব্যাটিং ভিত। তারপরও কোথায় জানি একটা শূন্যতা। যাই হোক, প্রস্তুতিতে না জ্বললেও মূল মঞ্চে আলো হয়ে থাকবেন সাকিব- এমন অপেক্ষায় থাকতেই পারেন টাইগার সমর্থকরা। কেননা তিনি কখনও বাংলাদেশের ট্রাম্পকার্ড, কখনও প্রতিপক্ষের ফ্যাক্টর, কখনও রানের মেশিন, আবার কখনও উইকেট টেকার।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাকিবের অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই হালকা নয়। টি২০’র ফেরিওয়ালা তিনি। বিশ্বের নামি-দামি প্রায় সব ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক টুর্নামেন্টে তার কদর বেশ। তাতে বাঘা বাঘা ক্রিকেটারদের শক্তি-দুর্বলতা ভালো করেই জানা থাকার কথা তার। সেই সঙ্গে ৫০ ওভারের ক্রিকেটে তিনি যে বিশ্বসেরা। তিনিই তো নাম্বার ওয়ান। মাঝে কিছুদিন অবস্থান হারিয়ে একটু পেছনের চেয়ারে ছিলেন। কিন্তু বিশ্বকাপের মতো মেগা টুর্নামেন্টের আগে বিশ্বসেরা তকমাটা লুফে নিতে পারায় আত্মবিশ্বাসও কয়েক গুণ বাড়ার কথা সাকিবের। সেই সঙ্গে প্রতিপক্ষেরও তার জন্য আলাদাভাবে ভাবা লাগতে পারে।

বিশ্বক্রিকেটে বাংলাদেশ এখন সমীহ পাওয়ার যোগ্য। এই সমীহ শব্দটা টাইগারদের নামের পেছনে যারা ট্যাগের মতো বসিয়ে দিয়েছেন তাদের একজন সাকিব। ২০০৬ সালে একদিনের ক্রিকেটে অভিষেক হওয়া এই অলরাউন্ডার এবারের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপেও হতে পারেন লাল-সবুজের পতাকাবাহীদের চোখের মণি।

সূত্রঃ সমকাল