আজ নিরাপদ মাতৃত্ব দিবসঃ ৫৪ শতাংশ গর্ভজনিত মৃত্যু হচ্ছে বাড়িতে

অনলাইন ডেস্কঃ
গর্ভধারণ ও প্রসবজনিত জটিলতায় গড়ে ১৫ জন মায়ের মৃত্যু হয় দেশে প্রতিদিন। প্রসব পরবর্তী রক্তক্ষরণ, খিঁচুনি, গর্ভকালীন জটিলতা, ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থা ও পরিবারের অবহেলা মাতৃমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। বেশির ভাগ গর্ভজনিত মৃত্যু হয়ে থাকে বাসাবাড়িতে। এই হার প্রায় ৫৪ শতাংশ। গর্ভপাতের কারণেও মাতৃমৃত্যুর হার আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাতৃমৃত্যুর কারণসমূহ পুরোপুরিভাবে প্রতিরোধযোগ্য। প্রাক গর্ভধারণ ও গর্ভকালীন যত্নের বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। এড়িয়ে চলতে হবে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান। মাতৃমৃত্যুর ৫৫ ভাগই প্রসবের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঘটে থাকে। এ কারণে প্রসব-পরবর্তী সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সংশ্নিষ্টরা জানান, মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস করতে দেশে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে সেগুলো। এর কিছুটা সুফল পেলেও সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছেনি এখনও। মায়েদের সার্বিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য দেশে এখনও স্থায়ী ব্যবস্থাপনা নেই। মায়ের গর্ভকালীন, প্রসবকালীন ও প্রসব-পরবর্তী যত্নের অভাব রয়ে গেছে প্রকটই। আর মায়েদের সার্বিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা না থাকায় তাদের বড় একটি অংশ ঝুঁকির মধ্যে থাকেন সব সময়। মাতৃমৃত্যুর হিসাব করলে সব মায়ের হিসাব করা দরকার। একইভাবে মাতৃস্বাস্থ্য সেবা বললে সব মায়ের স্বাস্থ্যসেবাকে বিবেচনায় নিতে হবে। দেশে এখনও প্রতি বছর ৫ হাজার ৪৭৫ জন মা গর্ভজনিত মৃত্যুবরণ করছেন। ডেলিভারির ক্ষেত্রে ৫৪ শতাংশ মা মারা যান বাড়িতে। আর রক্তক্ষরণের কারণে মারা যান ৩১ শতাংশ।

স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সায়বা আক্তার বলেন, ‘আমাদের সচেতন হতে হবে। তাহলে মাতৃমৃত্যুর হার কমে আসবে। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা রয়েছে।’

এ পরিস্থিতিতে আজ মঙ্গলবার পালিত হচ্ছে ‘নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস’। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য- ‘মর্যাদা ও অধিকার, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসূতি সেবার অঙ্গীকার।’ সচেতনতামূলক নানান কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। ১৯৯৭ সাল থেকে দেশে প্রতিবছর ২৮ মে ‘নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস’ পালন করে আসছে অবস্ট্রেটিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি)। সংগঠনটির মহাসচিব অধ্যাপক ডা. সালেহা বেগম চৌধুরী বলেন, ‘স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যা বিশেষজ্ঞদের এই সমিতির সদস্য দুই হাজার। শাখা রয়েছে ১৩টি। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ জেলা শহরে অবস্থিত। ফলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ওজিএসবির সদস্যরা দেশের মায়েদের সেবা প্রদানে তাদের দক্ষতার প্রমাণ রাখতে সক্ষম হয়েছে। সদস্যদের পরিচালনায় ঢাকার মিরপুর-১ এবং মিরপুর-১৩ নম্বরে দুটি হাসপাতাল অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে সেবা প্রদান করছে। সেখানে মায়েদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা, ওষুধ এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে অপারেশন করা হয়।’

স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান এবং আর্থসামাজিক অবস্থার প্রতিফলন ঘটে ওই দেশে মাতৃমৃত্যু এবং শিশুমৃত্যুর হারের ওপর। বর্তমান সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে গর্ভপাতের কারণে মাতৃমৃত্যুর হার পূর্বের তুলনায় অনেক বেড়েছে। দেশে মাতৃমৃত্যুর অন্যতম দুটি প্রধান কারণের মধ্যে রক্তক্ষরণে ৩১ শতাংশ এবং একলামশিয়ায় (খিঁচুনি) ২৪ শতাংশ। আর পরোক্ষ কারণে মাতৃমৃত্যুর হার ২০ শতাংশ। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, নারীর প্রতি সহিংসতার কারণেও পূর্বের তুলনায় মাতৃমৃত্যুর হার বেড়েছে। মাতৃমৃত্যুর এসব কারণই সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধযোগ্য।

স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সামিনা চৌধুরী বলেন, ‘৩৭ ভাগ মা বর্তমানে কমপক্ষে চারটি প্রসবপূর্ব সেবা গ্রহণ করেন। দেশে এখন প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারি করানোর হার ৪৭ শতাংশ। প্রসবের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রসব পরবর্তী সেবা গ্রহণে হার ৩২ শতাংশ।’ তিনি বলেন, প্রসব-পরবর্তী সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রসব-পরবর্তী সময়ে ৭৩ শতাংশ মাতৃমৃত্যু ঘটে। আর তাদের ৫৬ শতাংশই মারা যায় প্রসবের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ মায়ের ক্ষেত্রে গর্ভধারণ পরীক্ষা করতে হবে। প্রতিটি গর্ভবতী মায়ের প্রসব পরিকল্পনা সম্পন্ন করতে হবে। আয়রন, ফলিক এসিড এবং ক্যালসিয়াম গর্ভকালীন সময় নিশ্চিত করা দরকার। মাতৃমৃত্যুর স্থান চিহ্নিত করে তিনি বলেন, ৫৪ শতাংশ মায়ের মৃত্যু হচ্ছে বাড়িতে। মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও প্রাইভেট ক্লিনিকে ১৪ শতাংশ মায়ের মৃত্যু হচ্ছে।

জাতিসংঘের ধারণা অনুযায়ী, ২০১৫ সালে এমএমআর প্রতি লাখে জীবিত জন্মে ১৭৬ জন। স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটা সম্ভব হয়েছে মূলত নিম্নমুখী প্রজনন সক্ষমতা, উন্নততর যত্ন গ্রহণের চর্চা এবং উচ্চতর সেবা গ্রহণের উন্নত সুবিধার ফলে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গর্ভধারণ এবং প্রসবজনিত জটিলতায় প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার নারীর মৃত্যু হয় এবং ২৬ লাখ মৃতজন্মসহ ৩০ লাখ নবজাতক অকাল মৃত্যুবরণ করে। বিশ্বে প্রতিদিন মৃত্যুবরণ করেন ৮৩০ জন মা।

সূত্রঃ সমকাল