নুসরাত হত্যাঃ কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয় জাবেদ-জোবায়ের

অনলাইন ডেস্কঃ
পরীক্ষা শুরু হওয়ার মাত্র ১০ মিনিট আগে নুসরাতকে একজন জানায়, ছাদে তার বান্ধবী নিশাতকে মারধর করা হচ্ছে। এমন কথা শুনেই ছাদে ছুটে যান তিনি। সেখানে আগে থেকে অবস্থান নেওয়া পাঁচজন মিলে তাকে চিত করে শুইয়ে ফেলে। নুসরাতের পরনের ওড়নাটিই দুই ভাগ করে তা দিয়ে তার হাত-পা বেঁধে ফেলে। এরপর তার গলা থেকে পা পর্যন্ত কেরোসিন ঢালা হয়। ম্যাচের কাঠি ঠুকে পায়ের দিকে বোরকায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। তার পুরো শরীরে আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর ওই পাঁচজন সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসে। এরপর তাদের একজন মোবাইল ফোনে প্রথম ঘটনাটি জানায় সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনকে। ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির শরীরে আগুন দেওয়ার ঘটনার এমন বর্ণনা দিয়েছে আসামি নুর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম। গত রোববার রাতে এ দুই আসামি ফেনীর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। হত্যার দায় স্বীকার করে তারা বলেছে, নুসরাতকে হত্যা করার নির্দেশ আসে কারাবন্দি সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার কাছ থেকে। এরপর কারা, কোথায় হত্যার পরিকল্পনা করে, কীভাবে নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়া হয় এবং পুরো ঘটনায় কারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করে, সেসবের বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে তাদের জবানবন্দিতে।

তদন্তসংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, নুর উদ্দিন ও শাহাদাতের জবানবন্দিতে সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনের নাম উঠে এসেছে। যৌন হয়রানি মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজ গ্রেফতার হওয়ার পর তারই নির্দেশে নুর উদ্দিন ও শাহাদাত অধ্যক্ষের মুক্তির দাবিতে আন্দোলনে নামে। নুসরাতের শরীরে আগুন দেওয়ার পর মোবাইল ফোনে রুহুল আমিনকে প্রথম জানিয়েছিল শাহাদাত। দু’জনের মধ্যে মাত্র ছয় সেকেন্ড কথা হয়েছিল। নুসরাত হত্যা মামলার তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ফেনীর কর্মকর্তা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান সমকালকে বলেন, নুর উদ্দিন ও শাহাদাত আগুন দেওয়ার দায় স্বীকার করেছে। হত্যাকাণ্ডে কারা কীভাবে পরিকল্পনা করেছে, সরাসরি হত্যায় অংশ নিয়েছে কতজন এবং কোথা থেকে নির্দেশ এসেছে, তাও বর্ণনা করেছে। এর আলোকে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, প্রথমে নুসরাত হত্যায় সরাসরি চারজনের অংশ নেওয়ার তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। তবে স্বীকারোক্তিতে তারা বলেছে, ছাদে আগে থেকেই এক তরুণীসহ চারজন অবস্থান নিয়েছিল এবং পরে যোগ দেয় উম্মে সুলতানা পপি। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী পপিই নুসরাতকে বলেছিল, তোমার বান্ধবী নিশাতকে ছাদে মারধর করা হচ্ছে। এ খবরে নুসরাত ছাদে যান এবং পপিও তার পিছে পিছে যায়। সেও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আগুন দেওয়ার সময় কৌশলের অংশ হিসেবে অন্যরা শম্পা বলে ডাকে পপিকে।

গত ৬ এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় আলিম প্রথমপত্রের পরীক্ষা দিতে যান নুসরাত। তিনি এই মাদ্রাসার এবারের আলিম পরীক্ষার্থী ছিলেন। এর আগে ২৭ মার্চ মাদ্রাসাটির অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার হাতে যৌন হয়রানির শিকার হন নুসরাত। এ ঘটনায় তার মা বাদী হয়ে সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। মামলা তুলে নিতে আসামিপক্ষ নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করে। নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন নুসরাত। এর জের ধরেই তাকে ডেকে নিয়ে শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ৮০ শতাংশ পোড়া শরীর নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে পাঁচ দিন লড়ার পর মারা যান নুসরাত।

নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার মামলাটি তদন্ত করছে পিবিআই। এ পর্যন্ত অধ্যক্ষ সিরাজ, মাদ্রাসাছাত্র নুর উদ্দিন, শাহাদাত, জোবায়ের আহম্মেদ, জাবেদ হোসেন, মাদ্রাসাছাত্রী উম্মে সুলতানা পপি এবং সোনাগাজী পৌরসভার কাউন্সিলর ও পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলমসহ ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে নুর উদ্দিন ও শাহাদাত রোববার রাতে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। রাত ১টা পর্যন্ত তাদের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। পরে আদালত তাদের জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এর আগে দুপুর ১২টার দিকে পুলিশের কাছে রিমান্ডে থাকা নুর উদ্দিন ও শাহাদাতকে ফেনীর আদালতে হাজির করা হয়। পিবিআইর পরিদর্শক মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহ আলম প্রয়োজনীয় কাজপত্র সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাকির হোসেনের আদালতে দাখিল করেন।

আদালত সূত্র জানায়, জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আইনের বিধান অনুসারে আসামিদের জানিয়ে দেন, স্বীকারোক্তি দেওয়া হলে তাদের সর্বোচ্চ সাজা হবে। তিনি আসামিদের একাকী ভাবার জন্য ৩ ঘণ্টা সময় দেন। প্রথমে নুর উদ্দিন ও পরে শাহাদাত জবানবন্দি দেয়। তারা নুসরাত হত্যায় নিজেদের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে।

আসামিদের জবানবন্দি গ্রহণ শেষে রোববার রাত সোয়া ১টার দিকে পিবিআইর স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড অপারেশনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তাহেরুল হক চৌহান আদালত চত্বরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, নুর উদ্দিন ও শাহাদাত ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। নুসরাত হত্যায় কার কী ভূমিকা ছিল তার পুরোটাই বর্ণনা করেছে তারা। জড়িতদের নাম-পরিচয়ও বলেছে। তাহেরুল হক চৌহান জানান, এখন পর্যন্ত পিবিআই ১৩ জনকে গ্রেফতার করেছে। আরও কিছু নাম পুলিশ পেয়েছে। তদন্তের স্বার্থে তা প্রকাশ করছি না। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে বাকিদেরও গ্রেফতার করা হবে।

নুর উদ্দিন ও শাহাদাত আদালতকে জানায়, ২৭ মার্চ নুসরাত অধ্যক্ষ সিরাজের হাতে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। এর দায়ে সিরাজ গ্রেফতার হওয়ার পর তার মুক্তির জন্য আন্দোলন করতে অর্থের জোগান দেওয়া ব্যক্তি ও নেপথ্যে থাকা সিরাজের সমর্থকদের নামও জানিয়েছে তারা। সিরাজের কাছ থেকে নির্দেশনা পেয়ে তারা ৫ এপ্রিল নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা করে মাদ্রাসার একটি হোস্টেলে। হত্যা মিশনের স্থান হিসেবে তারা বেছে নেয় মাদ্রাসা চত্বরে সাইক্লোন শেল্টার ভবনের তিন তলার ছাদকে। কারণ নিরিবিলি স্থান সেটি। ছাদে চিৎকার করলেও বাইরে থেকে শোনার উপায় নেই। ওই ছাদে রয়েছে মেয়েদের টয়লেট ও পানির ব্যবস্থা। তবে পরীক্ষা শুরুর কয়েক মিনিট আগে ওই ভবনের ছাদে কেউ থাকবে না বলে তারা একমত হয়। কিলিং মিশন শেষে পালানোর রাস্তাও ঠিক করে রাখে তারা।

তদন্ত-সংশ্নিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অধ্যক্ষ সিরাজের পক্ষে আন্দোলন করতে ও নুসরাতের শরীরে ছদ্মবেশে আগুন দিতে বোরকা কেনার জন্য সোনাগাজী পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মাকসুদ আলম নুর উদ্দিন ও শাহাদাতকে ১০ হাজার টাকা দেন। মাদ্রাসার এক শিক্ষক দেন পাঁচ হাজার টাকা। এর মধ্যে ৫ হাজার টাকা নেয় নুর উদ্দিন। তিনটি বোরকা কেনার জন্য শাহাদাতের চাচাতো বোনের পালিত মেয়ে কামরুন নাহার মণিকে দেওয়া হয় দুই হাজার টাকা। ৬ এপ্রিল সকাল ৮টার দিকে শাহাদাত সোনাগাজী বাজারে যায়। তখন ওই মেয়ে তাকে দুটি নতুন ও একটি পুরনো বোরকা দিয়ে যায়। শাহাদাত পলিথিনে করে এক লিটার কেরোসিন কেনে।

নুর উদ্দিন ও শাহাদাত আদালতে স্বীকার করেছে, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ৬ এপ্রিল সকাল সোয়া ৯টার দিকে শাহাদাত, জোবায়ের, জাবেদ হোসেন ও কামরুন নাহার মণি বোরকা পরে ছাদে অবস্থান নেয়। উম্মে সুলতানা পপি অবস্থান নেয় মাদ্রাসা চত্বরে। পরীক্ষা শুরুর ১০ মিনিট আগে নুসরাতকে পপি জানায়, ছাদে নিশাতকে মারধর করা হচ্ছে। নুসরাতের ওপর যৌন নির্যাতনের সাক্ষী ছিল নিশাত। এ খবর শুনে নুসরাত ছুটে যান ছাদে। পপিও তার পেছনে ছাদে উঠে আসে। ছাদে নিশাতকে খোঁজাখুঁজি করেন নুসরাত। না পেয়ে ছাদে দাঁড়ান। এ সময় উম্মে সুলতানা পপি এবং ছাদে আগে থেকে অবস্থান নেওয়া অন্যরা নুসরাতকে ঘিরে ধরে। তাকে মামলা তুলে নিতে বলে পপি। এরপর শাহাদাতের চাচাতো বোনের পালিত মেয়ে মণিও একই কথা বলে নুসরাতকে। নুসরাত জবাবে বলেছিলেন, তিনি মামলা তুলবেন না। তার গায়ে অধ্যক্ষ কেন হাত দিয়েছিল। ওস্তাদ তো ওস্তাদ। তিনি এর শেষ দেখেই ছাড়বেন বলে তাদের জানিয়েছিলেন। তদন্ত-সংশ্নিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদে শাহাদাত জানিয়েছে, মামলা তুলতে রাজি না হওয়ায় সে পেছন থেকে এক হাত দিয়ে নুসরাতের মুখ চেপে ধরে এবং অপর হাত দিয়ে একটি হাত ধরে। শাহাদাতের চাচাতো বোনের পালিত মেয়ে শরীর চেপে ধরে। পপি ধরে নুসরাতের পা। এরপরই তারা নুসরাতকে ছাদে চিত করে শুইয়ে ফেলে। এ সময় কৌশলে উম্মে সুলতানা পপিকে তারা শম্পা বলে ডাক দেয়। নিজেকে ছাড়ানোর জন্য চেষ্টা করেন নুসরাত। চিৎকারও করেন তিনি। নুসরাতের ওড়না দুই টুকরো করে তার হাত ও পা বেঁধে ফেলে জোবায়ের। এরপরই জাবেদ তার গলা থেকে পা পর্যন্ত এক লিটার কেরোসিন ঢেলে দেয়। পলিথিনে করে এই কেরোসিন আনা হয়েছিল। এরপর দেশলাই বের করে কাঠি জ্বালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় নুসরাতের পায়ের দিকে। তার শরীরে আগুন জ্বলার সঙ্গে সঙ্গে ওই পাঁচজন সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে যায়। নামার সময় শাহাদাত, জোবায়ের ও জাবেদ বোরকা খুলে ফেলে। পপিসহ দুই তরুণী মাদ্রাসায়ই তাদের পরীক্ষার কক্ষে চলে যায়। তারা নামার সময়ও নুসরাতের আর্তনাদ শুনতে পায় তারা। তার পা ও হাতের বাঁধন আগুনে পুড়ে খুলে যায়। নুসরাতের মুখ শাহাদাত চেপে ধরে থাকায় সেখানে কেরোসিন ঢালা হয়নি। তাই পুরো শরীর পুড়লেও মুখে আগুন লাগেনি। আগুন দেওয়ার আগে তারা প্রত্যেকে হাতে-পায়ে মোজা লাগিয়ে নিয়েছিল।

শাহাদাত উত্তর দিকের প্রাচীর টপকে পালায়। বাইরে গিয়ে সে রুহুল আমিনকে ফোন করে আগুন দেওয়ার বিষয়টি জানায়। সিরাজের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি মামলার ঘটনায় রুহুল আমিন থানা ম্যানেজ করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন।

জবানবন্দিতে নুর উদ্দিন ও শাহাদাত পৃথকভাবে নুসরাতকে প্রেমের প্রস্তাব দেওয়ার কথা স্বীকার করেছে। নুসরাতকে ২০১৭ সালে প্রেমের প্রস্তাব দেয় নুর উদ্দিন। প্রত্যাখ্যান করায় সে সময় মাদ্রাসা থেকে বাসায় ফেরার পথে নুসরাতের চোখেমুখে চুন ছুড়ে মারে সে। শাহাদাতও প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে আসছিল নুসরাতকে। তার প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করে নুসরাত। এ কারণে তারা দু’জনই নুসরাতের ওপর ক্ষুব্ধ ছিল।

পিবিআইর পরিদর্শক মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহ আলম জানান, নূর উদ্দিন ও শাহাদাতের বক্তব্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। সিরাজের পক্ষে অবস্থান নেওয়া ও নুসরাতের শরীরে আগুন দেওয়ার পর যারা ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে প্রচার করে ও ঘটনা ধামাচাপা দিতে অর্থের জোগান দেয়, তাদের নাম-ঠিকানা পিবিআইর হাতে রয়েছে। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

কাউন্সিলর মাকসুদ পাঁচ দিনের রিমান্ডে :নুসরাত হত্যা মামলার অন্যতম আসামি পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলমের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল সোমবার সকালে মাকসুদের ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন পিবিআইর তদন্ত কর্মকর্তা। আদালত পাঁচ দিন মঞ্জুর করেন।

সূত্রঃ সমকাল