ভাষা আন্দোলন ও প্রত্যাশা

মো. মহিউদ্দিন :
আসছে মহান একুশে ফেব্রুয়ারি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। গোটা বিশ্ব অত্যন্ত ভাবগাম্ভির্যের মধ্যে দিয়ে পালন করবে দিবসটি। বাঙ্গালি জাতির কাছে এই দিবসটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
আজ থেকে ৬৯ বছর আগে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট দীর্ঘ  ইংরেজ শাসনের অবসান হয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। সৃষ্টির শুরু থেকে শুরু করছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠিরা পূর্ব পাকিস্তানি তথা বাঙ্গালিদের উপর বিমাতাসুলভ আচরণ। বঞ্চিত রেখেছিল সর্বপ্রকার ন্যায্য পাওনা ও অধিকার থেকে। দিতে চায়নি বিন্দুমাত্র মর্যাদা। তারই ধারাবাহিকতায় মাত্র ৬ মাসের মাথায় শুরু করল ভাষা নিয়ে ষড়যন্ত্র।
১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পাকিস্তান গণ-পরিষদে প্রস্তাব উত্থাপিত হলো পরিষদে বক্তৃতা করতে হবে ইংরেজি এবং উর্দুতে। গণ-পরিষদের কিছু সদস্য এর প্রতিবাদ করল। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিল বাংলা ভাষায় বক্তৃতা করতে দিতে হবে। কেননা পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৬৩ ভাগের মাতৃভাষা বাংলা। কিন্তু তাদের এই আবেদনে কোন সাড়া না দিয়ে বরং পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল কায়দে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের কার্জন হলের এক জনসভায় সাফ জানিয়ে দিলেন উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা। ছাত্ররা তাৎক্ষণিক প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। ফলে ছাত্রদের নির্ধারিত ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চের ছাত্র আন্দোলন গণজাগরণে পরিণত হয়।
আন্দোলন ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি সারাদেশব্যাপী ধর্মঘটের ডাক দেয়। এতে সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে এবং প্রতিবাদী ছাত্রদের গুলি করে। বর্বর গুলি কেড়ে নেয় সালাম, বরকত, রফিক, জাব্বারসহ আরো আনেকের জীবন। এই সংবাদ মুহূর্তে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লে পূর্ব বাংলায় বিপ্লবের আগ্নেয়গিরিতে পরিণত হয়। যার গলিত লাভা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এভাবে ভাষা আন্দোলন দুর্বার আন্দোলনে পরিণত হয় যে, এর চাপে পড়ে পাকিস্তান সরকারের সব অহমিকা ও শক্তি ধুলায় লুটিয়ে পড়ে এবং বাধ্য হন ১৯৫৬ সালের রচিত পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি ও মর্যাদা দিতে। পরে ১৯৯৮ সালের ৮ জানুয়ারি কানাডার প্রবাসী বাঙ্গালিদের সংগঠন ‘মাদার ল্যাংগুয়েজ আফ দ্যা ওয়ার্ল্ড’ বাংলা ভাষা দিবসকে আন্তর্জাতিকভাবে নিয়ে যাওয়ার জন্য চিন্তা করে। সংগঠনটি একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার জন্য জাতিসংঘের তখনকার মহাসচিব কফি আনানের কাছে আবেদন করেন। কফি আনান তাদেরকে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেস্কোর সাথে যোগাযোগ করতে পরামর্শ দেন। কফি আনানের পরামর্শে তারা ৭টি বিভিন্ন ভাষাভাষী ১০ জনের সাক্ষরসহ ইউনেস্কোর কাছে আরেকটি আবেদন করেন।
ইউনেস্কোর শিক্ষা বিষয়ক প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট মিসেস আনান মারিয়া সংগঠনটিকে জানায় ইউনেস্কো কোন বেসরকারি সংগঠনের প্রস্তাব বিবেচনা করেনা। মারিয়া আরো জানায় দেশের সরকারকে এই বিষয়ে  উদ্যোগী হতে হবে। তাই তারা বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এই উদ্যোগ নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান। পরে ১৯৯৯ সালের ৯ সেপ্টম্বর আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে পাঠানো হয়। ১৯৯৯ সালের ২৮ অক্টোবর শিক্ষামন্ত্রী প্যারিসে ইউনেস্কোর সাধারণ অধিবেশনে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। প্রস্তাবে তখন ২৭টি দেশ সমর্থন দেয়। ১৭ নভেম্বর ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কোর ৩১তম সম্মেলনে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে স্বীকৃতি পান। ২০০০ সালের ২১ ফেব্রয়ারি আন্তর্জাতিকভাবে ১৮৮ দেশে এই দিবস পালিত হয়। আজ সারাবিশ্বে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে পালন করছে।
সারাবিশ্ব আজ বাংলা ভাষাকে সম্মান করছে, বাংলা ভাষাকে চিনছে। আফ্রিকার রাষ্ট্র  সিয়েরা লিওনের দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলা আজ স্বীকৃত। কিন্তু নিজ দেশে অবহেলার শিকার এই বাংলা ভাষা। অত্যন্ত অসহায় ও নৈরাজ্যকর আবস্থায় আছে বাংলা ভাষার বানান। আমাদের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইচ্ছেমত মনগড়া ব্যবহার করছি বাংলা বানানকে। বানানের নিজস্ব নিয়ম থাকলেও অজ্ঞতা কিংবা জেনেশুনে ব্যবহার করছি ভুল বানান। একই বানান একেক জায়গায় একেক রকমের করে ব্যবহার করছি। কোমলমতি শিক্ষার্থীরা স্কুলের পাঠ্যবইয়ে যে বানানটা শিখছে সেই বানান পত্র-পত্রিকায়, বিভিন্ন ব্যানারে, পোস্টার, বিলবোর্ডে তা দেখছে অন্যরকম। ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা এ নিয়ে পড়ে যায় বিভ্রান্তিতে। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় বানান শিক্ষার যে কারখানা বিদ্যালয়, সেই বিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভর্তি ব্যানারেও দেখা যায় ভুল বানানের ছড়াছড়ি।
তাই আসুন, আমরা ৬৪ তম ভাষা দিবসে দিবস পালনের পাশাপাশি বাংলা বানান ব্যবহারের ক্ষেত্রে যতœবান হওয়ার শপথ গ্রহণ করি।
লেখকঃ শিক্ষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
ই-মেইল:  [email protected]