দুর্নীতি কমাতে গণশুনানী সফল হবে

মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এডভোকেট :
গণশুনানী কি? ড. নাসিরউদ্দীন আহমেদ, কমিশনার, দুর্নীতি দমন কমিশন, বিগত ৮ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এক মতবিনিময় সভায় উদ্বোধনী বক্তৃতায় বলেছেন তিনি চকরিয়া উপজেলায় গণশুনানী সংক্রান্তে এসেছেন। তিনি গণশুনানী সম্পর্কে কোন পরামর্শ থাকলে দিতে অনুরোধ করেন। সে দিন সভায় উপস্থিত বক্তাদের বক্তব্য শুনে মনে হয়েছে গণশুনানী কি তা কেউ বুঝতে পারেন নাই। না পারারই কথা। কারণ গণশুনানী ধারণাটি সম্পূর্ণ নতুন। তিনি আবার ১৩ অক্টোবর একই স্থানে একই বিষয় নিয়ে মতবিনিময় সভায় মিলিত হন। এবার সভা শুরুর আগেই ’দুর্নীতিমুক্ত সরকারী সেবা প্রদানে গণশুনানীর ভূমিকা’ নামের একটি ছোট পুস্তিকা উপস্থিত সকলের মধ্যে বিতরণ করা হয়। দীর্ঘ আলোচনার পর সাভারে অনুষ্ঠিত গণশুনানীর ভিডিও এর কিছু অংশ দেখানো হয়। পরের দিন ১৪ অক্টোবর চকরিয়া উপজেলায় দুদক কমিশনার ড.নাসিরউদ্দীন আহমেদের উপস্থিতিতে ভুক্তভোগীদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অভিযোগ দায়ের করার সুযোগ পাওয়ায় উন্মুক্ত গণশুনানী জনগণের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়েছে। ধারণার ওপর নয়,বরং দুর্নীতি সংক্রান্ত অভিজ্ঞতার আলোকে নাগরিকগণ গণশুনানীতে অংশগ্রহন করেন। চকরিয়া উপজেলার সাধারণ মানুষ এখন বুঝতে সক্ষম হচ্ছেন গণশুনানী কি। অনেকে আফসোস করছেন গণশুনানীতে উপস্থিত থাকতে না পারায় এবং তার নিজের অভিযোগের কথা প্রকাশ্যে শুনাতে না পারায়।
উপজেলা পর্যায়ে সেবা প্রদানকারী কর্মকর্তাদের নিকট স্থানীয় জনগণ কর্তৃক সেবা সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট সমস্যা উপস্থাপন এবং তা সমাধানকল্পে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহনের একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা পদ্ধতি হলো গণশুনানী। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হলো নাগরিকের অন্ন,বস্ত্র,আশ্রয়,শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা। জাতিসংঘের দুর্নীতি বিরোধী সনদের ১৩ অনুচ্ছেদে দুর্নীতি প্রতিরোধে সমাজের সুশীল সমাজ,এনজিও,গণমাধ্যম ইত্যাদির অংশগ্রহন এবং তথ্য প্রাপ্তি ও রিপোটিং এর ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। আমাদের সরকার কর্তৃক অনুমোদিত জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল,২০১২ এ নাগরিকের দুর্নীতিমুক্ত সেবা প্রদানের অঙ্গীকার করা হয়েছে। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৫ তারিখে জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহে দুর্নীতি ও ঘুষ ব্যাপকহারে হ্রাস করা এবং সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা ও নাগরিকের অংশগ্রহনমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গণশুনানীর উদ্দেশ্য হল, সেবা প্রত্যাশী নাগরিকের অভিযোগ সরাসরি শ্রবণের মাধ্যমে সেগুলো সেবা প্রদানকারী দপ্তর কর্তৃক নিস্পত্তির ব্যবস্থা করা। সেবা প্রদানকারীকে সরাসরি নাগরিকের নিকট দায়বদ্ধ করার পথ সহজ ও সুগম করা।
রাষ্ট্রের সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের গণশুনানীতে বিব্রত দুর্নীতিবাজদের অনেকের পক্ষে প্রশ্ন করা হতে পারে এই গণশুনানীর আইনগত ভিত্তি কি? সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, ’১) সংবিধান  ও আইন মান্য করা,শৃঙ্খলা রক্ষা করা,নাগরিকের দায়িত্ব পালন করা এবং জাতীয় সম্পত্তি রক্ষা করা প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য। ২) সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য।’ দুর্নীতি দমন কমিশন আইন,২০০৪ এর ১৭ ধারায় দুর্নীতি প্রতিরোধের লক্ষ্যে সততা ও নিষ্ঠাবোধ সৃষ্টি করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে গণসচেতনতা গড়ে তোলার ব্যবস্থা করা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় বিবেচিত অন্য যে কোন কার্য সম্পাদন করার ক্ষমতা দুদককে দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ কর্তৃক জারীকৃত ১লা জুন ও ৫জুন ২০১৫ তারিখের অফিস স্মারকদ্বয়ে গণশুনানী অনুষ্ঠানের ব্যবস্থার নির্দেশনা আছে। মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ কর্তৃক জারীকৃত অফিস স্মারক অনুযায়ী, সপ্তাহে একটি নির্দিষ্ট দিনে অফিস চলাকালে গণশুনানী গ্রহন করা। লিখিত বা মৌখিক উভয় প্রকার অভিযোগ শুনানীর জন্য গ্রহন করা যাবে। অভিযোগ নিস্পত্তির বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত প্রদান,সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ এবং ফলাফল সেবা প্রত্যাশী জনগণকে অবহিত করতে হবে। সেবা প্রত্যাশীদের অভিযোগ সংক্রান্ত রেজিস্টার সংরক্ষণ করতে হবে। গণশুনানী সংক্রান্ত কার্যক্রম নির্ধারিত ছকে নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে উপজেলা কার্যালয় থেকে জেলা কার্যালয় এবং জেলা কার্যালয় কর্তৃক প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বিভাগীয় কার্যালয়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগে প্রেরণ করতে হবে।
গত ১৩ অক্টোবর ২০১৫ কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে বিস্তারিত আলোচনার পর দুর্নীতি দমন কমিশনের মহা-পরিচালক (প্রতিরোধ ও গবেষনা) ড. শামসুল আরফিন ঘোষণা করেন,কক্সবাজার জেলায় প্রতি মাসে, আগে ঘোষণা দিয়ে, একবার অফিস প্রধানকে গণশুনানী করতে হবে। কোন অফিস প্রধান প্রতিদিন আমরা জনগণের অভিযোগ শুনানী করি অজুহাতে প্রতি মাসে একটি নির্ধারিত দিনে গণশুনানী অনুষ্ঠান উপেক্ষা করতে পারবেন না। জেলায় কর্মরত সকল পুলিশ সদস্য,কমিউনিটি পুলিশ ইত্যাদির বিরুদ্ধে অভিযোগ গ্রহন ও গণশুনানী করবেন পুলিশ সুপার সাহেব। রেজিষ্ট্রী অফিস,সিভিল সার্জন অফিস,বিদ্যুৎ অফিস,পল্লীবিদ্যুৎ,বনবিভাগ,গণপুর্ত,সড়ক ও জনপথ বিভাগ,পানি উন্নয়ন বিভাগ ইত্যাদি যেখানে দুর্নীতির অভিযোগ আছে সেখানে অফিস প্রধানকে মাসে একবার অবশ্যই গণশুনানীর ব্যবস্থা করতে হবে। ভুমি অফিসের দুর্নীতির অভিযোগ জেলা প্রশাসকের কাছে গণশুনানী হবে। এল,আর ম্যানুয়েলের বিধান অনুযায়ী জেলার জিপি/পিপির নিয়ন্ত্রণকারী হলেন জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট। সুতরাং নির্ধারিত মাসে একদিন তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগও জেলা প্রশাসক সাহেব গ্রহন ও প্রকাশ্যে গণশুনানী করবেন। জেলা প্রশাসক সব কিছু সমন্বয় করবেন।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করার ব্যবস্থা আগেও ছিল। সংশ্লিষ্ট অফিসের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করা যেত এবং দুদকের কাছেও অভিযোগ দায়ের করা যেত। কিন্তু তা যাচাই বাচাই অনুসন্ধান করে ব্যবস্থা নিতে বা বিচারের ব্যবস্থা করতে অনেক দেরী হয়ে যেত। দ্রুত প্রতিকার পেত না। দীর্ঘসুত্রিতার কারণে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ করার উৎসাহও কমে যায়। তাতে করে দুর্নীতিবাজরা আরো বেপরোয়া হয়ে যায়। ঘুষ খাওয়া,দুর্নীতি করা যেন তাদের অধিকার। গণশুনানীর ফলে মাসে একবার অফিস প্রধানের নিকট সরাসরি অভিযোগ করার সুযোগ থাকায় অভিযুক্ত হয়ে বসের সামনে বিব্রত হওয়ার ভয়ে বেপরোয়া দুর্নীতি অর্ধেক কমে যাবে বলে অভিজ্ঞ মহল আশা প্রকাশ করছেন। প্রতিবেশী দেশ ভারত ও নেপালে সরকারী সেবা প্রদানে গণশুনানী একটি কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। দুদকের মহা-পরিচালক সাহেব জানালেন,ভারতে গণশুনানীর ভয়ে এক সাব-রোজিষ্টার পালিয়ে গিয়েছিলেন। গণশুনানীর এই অভুতপূর্ব নতুন ধারণাটি দেশব্যাপী কার্যকরী করা গেলে আমাদের দেশে দুর্নীতি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমে যাবে, দুর্নীতি বিরুদ্ধে অল্প সময়ের মধ্যে একটি শান্তিপূর্ণ নিরব বিপ্লব সাধিত হবে।
ভবিষ্যতে দুর্নীতিকে নিরুৎসাহিত করার লক্ষ্যে অতীতের দুর্নীতির বিচার নিশ্চিত করতে হলে পর্যাপ্ত আইনী ক্ষমতা দিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনকে প্রকৃতপক্ষে শক্তিশালী ও স্বাধীন করতে হবে।
জাতিকে ভবিষ্যকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হলে সকল স্কুল,কলেজ,মাদ্রাসা,বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সততা সংঘের কার্যাবলী বৃদ্ধি করে আরো আকর্ষণীয় করতে হবে।
বর্তমানের দুর্নীতি কমাতে হলে বা প্রতিরোধ করতে হলে বেশী বেশী ফাঁদ মামলার ব্যবস্থা করে দুর্নীতিবাজদের হাতেনাতে ধৃত করতে হবে এবং ইতিমধ্যেই কার্যকর প্রমাণিত গণশুনানী অনুষ্ঠানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে।
লেখকঃ কলামিষ্ট, সভাপতি, কক্সবাজার জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি, সাবেক সভাপতি কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি, সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটার, বহু বইয়ের প্রণেতা এবং কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের একজন সিনিয়ার আইনজীবী।