সংস্কারের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত রামুর প্রাচীন পাঁচ পুরাকীর্তি

সুনীল বড়ুয়া ,রামুঃ
২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের রামু উপজেলার বৌদ্ধ বিহার ও বসতিতে সামপ্রদায়িক হামলার পর রামুতে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে পুনঃনির্মাণ করা হয় ১২টি বৌদ্ধ বিহার। তবুও আলোর নীচে যেন অন্ধকার রয়েই গেল। সেদিনের হামলা থেকে রক্ষা পাওয়া কাঠের তৈরী পাঁচটি প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার, রক্ষণা বেক্ষণ এবং উপযুক্ত পরিচর্যার অভাবে এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে। শুধু তাই নয়,এসব বিহার থেকে চুরি হয়ে যাচ্ছে মূল্যবান প্রাচীন বুদ্ধমূর্তি, পিতলের ঘন্টাসহ প্রয়োজনীয় মালামাল। রামু উপজেলা সদরের চৌমুহনী থেকে পুরনো আরাকান সড়ক ধরে দুই কিলোমিটার দক্ষিণে গেলেই ফতেখারকুল অফিসেরচর গ্রাম। সেখান থেকে ছায়া সুনিবিড় পথ ধরে একটু এগুলে লামার পাড়া বৌদ্ধ বিহারের আগেই হাতছানি দেয় সারি সারি সুপারী গাছ। প্রকৃতির এই অসাধারণ সবুজের হাতছানি দেখতে দেখতেই চোখে পড়ে প্রায় ২১৯ বছরের প্রাচীন এই পুরাকীর্তি। লামার পাড়া গ্রামে অবস্থিত বলে এটি বেশি পরিচিতি পেয়েছে লামার পাড়া ক্যায়াং হিসাবে। তবে ক্যায়াংটির প্রতিষ্ঠাতার নামানুসারে এটিকে থোয়াইংগ্যা চৌধুরীর ক্যায়াং বলে অনেকে। রেঙ্‌গুনী কারুকাজে,দৃষ্টিনন্দন শিল্প মহিমায় কাঠ দিয়ে তৈরী এ বিহারটি চমৎকার নির্মান শৈলী যে কারো নজর কাড়ে। বিহারটির আঙ্গিনায় শান্ত নিথর কিছুটা পথ মাড়িয়ে সামনে গেলেই এখনো চোখে পড়ে, আশ্চর্য হবার মতো বড় বড় দুটি পিতলের ঘন্টা।

স্থানীয় বৌদ্ধ সমপ্রদায়ের মতে, পিতলের তৈরী এঘন্টা দেশের সবচেয়ে বড় । এখানে সংরক্ষিত আছে অষ্টধাতু নির্মিত দেশের সবচেয়ে বড় বুদ্ধমূর্তি এবং প্রাচীন শিলালিপিসহ ঐতিহাসিক স্মৃতি চিহ্ন। এসব প্রাচীন স্মৃতিচিহ্ন দেখে মন ভরে গেলেও,কিন্তু যখনই চোখে পড়ে উপযুক্ত সংস্কার,পরিচর্যা এবং রক্ষণা বেক্ষণের অভাবে বিহারটির ভগ্নদশা: তখন মনের অজান্তেই চলে আসে দীর্ঘশ্বাস।

চট্টগ্রাম থেকে সপরিবারে বেড়াতে আসা চিত্রশিল্পী আবু সাদাত ইবনে হোসেন সায়েম বলেন, প্রাচীন এই বৌদ্ধ বিহার দেখে সত্যিই আমি মুগ্ধ। বাংলাদেশে বিভিন্নস্থানে ইট পাথরের অনেক দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা বা স্থাপত্য শৈলী দেখেছি,কিন্তু কাঠের তৈরী এই বিহারটির আবেদন অন্যরকম। বিহারটির ভেতরে-বাইরে প্রতিটি কাজের শিল্পমহিমা অসাধারণ। কিন্তু দেখে খারাপ লাগছে,সংস্কারের অভাবে চোখের সামনেই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এরকম অমূল্য একি পুরাকীর্তি। ‘দীর্ঘদিন ধরে আমি কানাডায় থাকি। দেশে এসেই রামুর বৌদ্ধ বিহার দেখতে আসলাম। সত্যিই বিহারটির শিল্পকর্ম দেখে আমি অভিভূত। অপূর্ব কারুকাজে কাঠ দিয়ে নির্মিত বিহারটির বাইরে যেমন সুন্দর তেমনটি ভেতরেও। মূল বিহারটির ভেতরে ছাউনীর নীচের সিলিং-এ যে অসাধারণ শিল্পসমৃদ্ধ কারুকাজ করা হয়েছে,সত্যি বিষ্ময়কর’। বললেন একই দলের আরেক চিত্রশিল্পী তাবাচ্ছুম ফেরদৌসী তিতলী।

চট্টগ্রাম ডা.খাস্তগির সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ফাহমী নাহিদা নাজনিন ইমন বলেন, এসব বৌদ্ধ বিহারগুলো শুধু রামু-কক্সবাজারের নয়, বাংলাদেশের গৌরবময় কীর্তি। এসব পুরাকীর্তি বাংলাদেশের সম্পদ। সরকারের উচিত এসব পুরনো বিহারগুলো সংরক্ষণে এগিয়ে আসা।

লামার পাড়া ক্যাংয়ের (বৌদ্ধ বিহার) বিহারাধ্যক্ষ ইয়ালাতারা ভিক্ষু জানান, ১৮০০ সালে তৎকালীন রাখাইন জমিদার উথোয়েন অংক্য রাখাইন এ বিহারটি প্রতিষ্ঠা করেন। এক সময় এ বিহারের চারপাশে রাখাইন সমপ্রদায়ের বসতি ছিল। কিন্তু কালের পরিক্রমায় রাখাইনেরা এখান থেকে অন্যত্র চলে গেছে। যে কারণে বিহারটি হুমকির মুখে পড়ে। তিনি বলেন, এক সময় এ বিহারে ছোট-বড় অন্তত বিশটি ঘন্টা ছিল। বুদ্ধমূর্তিও ছিল অনেকগুলো। সীমানা প্রাচীর (দেয়াল) না থাকায় দীর্ঘদিন বিহারটি অরক্ষিত থাকায় অনেক বুদ্ধমূর্তি, পিতলের ঘন্টাসহ প্রয়োজনীয় মালামাল চুরি হয়ে গেছে। ২০০২ সালে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ এবং ভেতরে হাঁটার পথটি সংস্কার করা হয়। কিন্তু বর্তমানে চুরি বন্ধ হলেও সংস্কারের অভাবে দিন দিন বিহারটি জরাজীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। সংস্কারের জন্য সাহায্য চেয়ে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে একাধিক আবেদন করা হলেও কোন সাড়া মিলছেনা।

সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা যায়, উপজেলার রাজারকুল, অফিসের চর, হাজারীকুল, পূর্ব রাজারকুল, মেরংলোয়া, শ্রীকুল, জাদীপাড়া, উখিয়ারঘোনা, উত্তর মিঠাছড়ি, উত্তর ফতেখাঁরকুলসহ বিভিন্ন এলাকায় মোট ২৭টি বৌদ্ধ বিহার ও একটি জাদি রয়েছে। এর মধ্যে রাজারকুলে ৩০৮ খৃষ্টপূর্বে সম্রাট অশোক নির্মিত ঐতিহাসিক রাংকূট বনাশ্রম বৌদ্ধ বিহার, রামু সীমা বিহার, চেরাংঘাটা বড় ক্যায়াং, রামু মৈত্রী বিহার, সাদাচিং, নিয়মিত রক্ষণা বেক্ষণের মধ্যে থাকলেও বাকী বিহারগুলো অযত্ন অবহেলায় পড়ে আছে। এর মধ্যে প্রায় দেড়’শ বছরের পুরনো হাজারীকুল রাখাইন বৌদ্ধ বিহারটি বর্তমানে ধ্বংস হয়ে গেছে। এলাকাবাসীর উদ্যোগে এটিকে নতুন করে তৈরী করার চেষ্টা চলছে। শ্রীকুল সাংগ্রীমা ক্যায়াং বর্তমানে ধ্বংস স্তুপে পরিণত হয়েছে। জাদীপাড়ায় প্রায় তিনশ ফুট উচু পাহাড়ের উপর তৈরী করা জাদিটিও বর্তমানে পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে। পাহাড়টির চারপাশে গাইড ওয়াল না থাকায় পাহাড় ধসে যেকোনো সময় জাদিটি ভেঙ্গে পড়তে পারে। এতে ঘটতে পারে বড় ধরনের দূর্ঘটনাও।

রামু বৌদ্ধ ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও পুরাকীর্তি সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সীমা বিহারের সহকারী পরিচালক প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু জানান, এক সময়ের বৌদ্ধ সংস্কৃতি চর্চার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ছিলো অফিসের চরের লামার পাড়া ক্যায়াং। কিন্তু বর্তমানে নানা কারণে এ বিহারটির এখন জরার্জীণ অবস্থা। অথচ এ বিহারে এখনো সংরক্ষিত আছে বাংলাদেশের অষ্টধাতু নির্মিত সর্ববৃহৎ বুদ্ধমূর্তিসহ অনেক ঐতিহাসিক স্মৃতি চিহ্ন। তিনি জানান, এক সময় রাখাইন সমপ্রদায় ওই বিহারটির দেখভাল ও রক্ষণাবেক্ষন করে আসলেও বর্তমানে বিহারটির আশপাশে রাখাইন বসতি নেই। তাই সরকারীভাবে এটি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া না হলে অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে এ অমূল্য পুরাকীর্তি।

রাখাইন বুড্ডিস্ট ওয়েল ফেয়ার এসোসিয়েশন,রামু শাখার সভাপতি উথোয়েনছি রাখাইন জানান, বর্তমানে কয়েক কোটি টাকা খরচ করলেও এরকম একটি বিহার তৈরী করা সম্ভব হবেনা। কিন্তু কোটি কোটি টাকার এ সব সম্পদ চোখের সামনে ধ্বংস যাচ্ছে। আমরা বিহারটি সংরক্ষনে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি।

রামু উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রিয়াজ উল আলম বলেন, রামুতে সামপ্রদায়িক সহিংসতার পর প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক সহযোগিতায় প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২টি বৌদ্ধ বিহার পূণ:নির্মান করে দেওয়া হয়েছে। কাঠের তৈরী এসব পুরনো বিহারগুলোও পর্যায়ক্রমে সংস্কারের উদ্যেগ নেওয়া হবে।

সূত্রঃ আজাদী অনলাইন