২৪০ আসন নিজেদের রেখে ৬০টিতে ছাড় দিচ্ছে আওয়ামী লীগ

অনলাইন ডেস্কঃ
জোট-মহাজোটের ছয় শরিক দলের জন্য ১৬টি আসন বরাদ্দ রেখে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের চূড়ান্ত মনোনয়নের চিঠি দিচ্ছে আওয়ামী লীগ। দ্বৈত প্রার্থী ছিলেন এমন ১৭টি আসনেও আওয়ামী লীগ একক প্রার্থিতা চূড়ান্ত করে এই চিঠি দিচ্ছে। গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত ৩৩টি আসনের চূড়ান্ত প্রার্থীদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। আজ শনিবার ১৪ দলীয় জোট এবং মহাজোটের প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়ার কথা জানিয়েছে দলটি। গতকাল শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ২৪০ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী চূড়ান্ত করে মহাজোট শরিকদের মধ্যে বাকি আসন বণ্টন করা হয়েছে। এর মধ্যে মহাজোটের বড় শরিক জাতীয় পার্টির জন্য ৪২-৪৪টি আসন বরাদ্দ করা হয়েছে, যারা দলীয় প্রতীক লাঙল নিয়ে লড়বেন। ১৪ দল শরিকদের ১৩টি এবং বিকল্পধারাসহ যুক্তফ্রন্টের জন্য তিনটি আসনে ছাড় দেওয়া হয়েছে। তারা নৌকা প্রতীকে লড়বেন। তবে মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ পর্যায়ে শরিকদের মধ্যে দুই-একটি আসনে পরিবর্তন আসতে পারে।

গত শুক্রবার সকাল থেকে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ধানমণ্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে আওয়ামী লীগ ও জোট শরিকদের মধ্যে নৌকা প্রতীকের মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থীদের চূড়ান্ত মনোনয়নের চিঠি দেওয়া শুরু হয়। দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তাদের হাতে চিঠি তুলে দেন। এ সময় আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী থাকা ১৭টি এবং জোট শরিকদের ছেড়ে দেওয়া ১৬টি আসনের প্রার্থীদের চূড়ান্ত মনোনয়নের চিঠি দেওয়া হয়। অবশ্য রংপুর-৬ আসনে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর চূড়ান্ত মনোনয়নের চিঠি গত বৃহস্পতিবারই তার হাতে তুলে দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আওয়ামী লীগের ১৭টি আসনের চূড়ান্ত মনোনয়নপ্রাপ্ত একক প্রার্থী অথবা তাদের প্রতিনিধিরা চিঠি গ্রহণ করেন। অন্যদিকে জোট শরিকদের মধ্যে ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য কামরূল আহসান, জাসদের সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার, তরীকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী এবং বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নানকে চূড়ান্ত মনোনয়নের চিঠি দেন ওবায়দুল কাদের।

এর আগে ২৬৪টি আসনে আওয়ামী লীগের ২৮১ জন প্রার্থী দলীয় মনোনয়নের চিঠি নিয়ে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। ১৭টি আসনে দুইজন করে প্রার্থী দিয়েছিল ক্ষমতাসীন দলটি।

শরিকরা ছাড় পেল যেসব আসনে :চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়ার সময় ১৪ দলীয় জোট শরিকদের মধ্যে ওয়ার্কার্স পার্টিকে পাঁচটি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলকে (জাসদ-ইনু) তিনটি, জাতীয় পার্টিকে (জেপি-মঞ্জু) দুটি, তরীকত ফেডারেশনকে দুটি এবং বাংলাদেশ জাসদকে (আম্বিয়া) একটি আসন দিয়েছে আওয়ামী লীগ। এ ছাড়া মহাজোটের নতুন শরিক বিকল্পধারার তিনজন প্রার্থীও নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে লড়বেন।

জোট শরিকদের ছাড় পাওয়া আসনের প্রার্থীরা হচ্ছেন-বাংলা?দে?শের ওয়ার্কার্স পা?র্টি থেকে দলীয় সভাপতি রা?শেদ খান মেনন (ঢাকা-৮), সাধারণ সম্পাদক ফজ?লে হো?সেন বাদশা (রাজশাহী-২), অ্যাডভোকেট মোস্তফা লুৎফুল্লাহ (সাতক্ষীরা-১), ইয়া?সিন আলী (ঠাকুরগাঁও-৩) এবং শেখ টিপু সুলতান (বরিশাল-৩)। গত নির্বাচনে বিজয়ী ওয়ার্কার্স পার্টির ছয় আসনের মধ্যে নড়াইল-২ আসনে আওয়ামী লীগ এবার জাতীয় ক্রিকেট দলের ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজাকে প্রার্থী করায় বাদ পড়েছেন ওয়ার্কার্স পার্টির শেখ হাফিজুর রহমান।

জাসদ থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন দলীয় সভাপতি তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু (কুষ্টিয়া-২), সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার (ফেনী-১) এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য এ কে এম রেজাউল ক?রিম তান?সেন (বগুড়া-৪)। তরীকত ফেডা?রেশন থেকে নৌকা প্রতীক নিয়ে লড়বেন দলীয় চেয়ারম্যান ন?জিবুল বশর মাইজভা ারী (চট্টগ্রাম-২) এবং আওয়ামী লীগ ছেড়ে তরীকতে যোগ দেওয়া আ?নোয়ার হো?সেন খান (লক্ষ্মীপুর-১)। জাতীয় পা?র্টির (জে?পি) বর্তমান দুই এমপি দলীয় চেয়ারম্যান ও পানিসম্পদমন্ত্রী আ?নোয়ার হো?সেন মঞ্জু ?(পিরোজপুর-২) এবং প্রেসিডিয়াম সদস্য রুহুল আ?মিন (কু?ড়িগ্রাম-৪) আবারও মনোনয়ন পেয়েছেন। কুড়িগ্রাম-৪ আসনে আওয়ামী লীগের জাকির হোসেনও মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। তবে হলফনামার ফরম অসম্পূর্ণ থাকায় তার প্রার্থিতা বাতিল হয়ে গেছে।

গত নির্বাচনের পর জাসদ ভেঙে গঠিত বাংলাদেশ জাসদ একটি মাত্র আসনে ছাড় পেয়েছে। দলটির কার্যকরী সভাপতি মইন উদ্দীন খান বাদল (চট্টগ্রাম-৮) চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছেন। দশম সংসদের আরেক এমপি নাজমুল হক প্রধানের পঞ্চগড়-১ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে প্রার্থী করা হয়েছে সাবেক এমপি মোজহারুল হক প্রধানকে। যদিও নাজমুল হক প্রধান ওই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন। দলীয় সভাপতি শরীফ নূরুল আম্বিয়াকে নড়াইল-১ আসনে প্রাথমিক মনোনয়ন দেওয়া হলেও গতকাল নৌকার প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছেন আসনটির বর্তমান এমপি বি এম কবিরুল হক মুক্তিই।

এ ছাড়া এবারই প্রথম মহাজোটে যুক্ত হওয়া বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নান (লক্ষ্মীপুর-৪), প্রেসিডিয়াম সদস্য মাহী বি. চৌধুরী (মুন্সীগঞ্জ-১) এবং এম এম শাহীন (মৌলভীবাজার-২) নৌকা প্রতী?কে মনোনয়ন পেয়েছেন।

১৭ আসনে একক প্রার্থী যারা :আওয়ামী লীগের দ্বৈত মনোনয়নের ১৭টি আসনের মধ্যে রংপুর-৬ আসনটি আগেই স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর জন্য ছেড়ে দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাদের দু’জনের মনোনয়নপত্রই দাখিল করা হয়েছিল রংপুরের এই আসনে। তবে নিজের আসন গোপালগঞ্জ-৩ আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রার্থী চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে বড় চমক ঘটেছে চাঁদপুর-২ আসনের বর্তমান এমপি ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম বাদ পড়াতে। তার আসনে চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সহসভাপতি নুরুল আমিন রুহুল। তবে গুরুতর অসুস্থ হয়ে থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম তার কিশোরগঞ্জ-১ আসনের মনোনয়ন ধরে রেখেছেন। গতকাল অসুস্থ সৈয়দ আশরাফের পক্ষে চূড়ান্ত মনোনয়নের চিঠি নেন তার ছোট ভাই সৈয়দ আশফাকুল ইসলাম টিটু এবং ব্যক্তিগত কর্মকর্তা এ কে এম সাজ্জাদ আলম শাহীন।

এদিকে ঢাকা-১৭ আসন নিয়ে অনেক জল্পনাকল্পনার পর সেখানে আওয়ামী লীগের চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছেন চিত্রনায়ক আকবর হোসেন পাঠান ফারুক। বর্তমান এমপি বিএনএফের চেয়ারম্যান এ বি এম আবুল কালাম আজাদের আসনটিতে আওয়ামী লীগের দ্বৈত প্রার্থী ছিল।

বর্তমান এমপিদের মধ্যে চাঁদপুর-১ আসনে সাবেক মন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রী এ কে এম শাহজাহান কামাল, পটুয়াখালী-৩ আসনে সংসদের প্রধান হুইপ আ স ম ফিরোজ, বরগুনা-১ আসনে ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু, ঢাকা-৫ আসনে হাবিবুর রহমান মোল্লা, ঢাকা-৭ আসনে গত নির্বাচনে স্বতন্ত্রভাবে জয়ী হওয়া হাজী মোহাম্মদ সেলিম, জামালপুর-১ আসনে আবুল কালাম আজাদ এবং নড়াইল-১ আসনে বি এম কবিরুল হক মুক্তিই নৌকার প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছেন।

এ ছাড়া চাঁদপুর-৪ আসনে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি মুহম্মদ শফিকুর রহমান, টাঙ্গাইল-২ আসনে তানভীর হাসান ছোট মনির, নওগাঁ-৫ আসনে আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত আবদুল জলিলের ছেলে নিজাম উদ্দিন জলিল জন, নাটোর-১ আসনে শহিদুল ইসলাম বকুল এবং জামালপুর-৫ আসনে মোজাফফর হোসেন নৌকার চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছেন। এক্ষেত্রে বর্তমান এমপিদের মধ্যে চাঁদপুর-৪ আসনের ড. মোহাম্মদ শামছুল হক ভূঁইয়া, টাঙ্গাইল-২ আসনের খন্দকার আসাদুজ্জামান আরজু, নওগাঁ-৫ আসনের আবদুল মালেক, নাটোর-১ আসনের আবুল কালাম এবং জামালপুর-৫ আসনের রেজাউল করিম হীরা মনোনয়নবঞ্চিত হয়েছেন।

৫৫-৬০টি আসনে ছাড় পাচ্ছে শরিকরা :ওবায়দুল কাদের চূড়ান্ত মনোনয়নের চিঠি দেওয়ার পর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ৩০০ আসনের মধ্যে ৫৫ থেকে ৬০টি জোট ও মহাজোট শরিকদের ছেড়ে দিচ্ছে আওয়ামী লীগ। তবে শরিক দলগুলো ইচ্ছে করলে নিজেদের দলীয় প্রতীকে আরও বেশি আসনে নির্বাচন করতে পারবে। শরিক দলের নিজেদের শক্তিমত্তার পরিচয় জানান দিতে তাদেরও সুযোগ দিয়েছি।

তিনি বলেন, বিষয়টি উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। বিকল্পধারা চাইলে কুলা মার্কায় নির্বাচন করবে। জাসদ মশাল মার্কা কিংবা তরীকত ফুলের মালা মার্কায় প্রার্থী দিয়ে নির্বাচন করতে পারবে। তবে যাদের নৌকা প্রতীক দিয়েছি, তাদের চূড়ান্ত তালিকা এটাই। দফায় দফায় আলাপ-আলোচনা করে দল ও জোটের মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হয়েছে। শনিবার সভাপতির (শেখ হাসিনা) স্বাক্ষরসংবলিত তালিকা ইসিতে পাঠিয়ে দেব। সেটি থেকে আওয়ামী লীগের কে কোথায় ভোট করছেন, তার তালিকা পাওয়া যাবে।

এ সময় তার পাশে বসা বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নান নিচুস্বরে আরও আসনের বিষয়ে বলতে চাইলে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘মান্নান ভাই, আপনি চাইলে কুলা মার্কায় আরও প্রার্থী দিতে পারেন। আমরা তিনটার বেশি দিতে পারব না। শ্রদ্ধেয় বি. চৌধুরী সাহেবের সঙ্গে নেত্রী (শেখ হাসিনা) আলাপ করবেন। জানি, আপনাদের আরও প্রার্থীর প্রত্যাশা আছে। তবে আমরা নৌকা প্রতীকে এর বেশি দিতে পারব না। আমাদের অন্য শরিকরা সবাই একমত হয়েছেন। আশা করি আপনিও একমত হবেন।’

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘তার সঙ্গে কথা বলে জানাব, আসলে কী সমস্যা। আমাদের শরিকদের মধ্যে মান-অভিমান হবে। আবার একসঙ্গে নির্বাচনও করব।’

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নান, জাসদের সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার, তরীকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন, উপ-দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ূয়া প্রমুখ।