এবার কোটা বাতিলের প্রতিবাদ রাজপথে

অনলাইন ডেস্কঃ
এক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে চাকরির কোটা বাতিলের পর এবার তা পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে আরেক পক্ষ।

সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের প্রস্তাব বুধবার মন্ত্রিসভা অনুমোদনের পর তার প্রতিবাদ জানিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেছে ‘মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কমান্ড’ ও ‘মুক্তিযোদ্ধার পরিবার’ নামে দুটি সংগঠন।

দুপুরে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত জেনে রাতে ঢাকার শাহবাগ মোড় অবরোধ করে বিক্ষোভ থেকে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল রাখার দাবি তুলেছে তারা। তাদের দাবিতে সমর্থন জানিয়েছেন ছাত্রলীগ নেতারাও। বিক্ষোভ হয়েছে রাজশাহীতেও।

অন্যদিকে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসা বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতারা সরকারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও বলেছেন, তারা কোটা বাতিল চাননি, সংস্কার চেয়েছিলেন।

সেই সঙ্গে আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের উপর হামলাকারীদের শাস্তির দাবিও পুনরায় তুলেছে তারা।

সরকারি চাকরিতেক নিয়োগে এতদিন ৫৬ শতাংশ পদ বিভিন্ন কোটার জন্য সংরক্ষিত ছিল। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ৩০ শতাংশ, নারী ১০ শতাংশ, জেলা ১০ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ৫ শতাংশ, প্রতিবন্ধী ১ শতাংশ।

এই কোটা সংস্কার করে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবিতে কয়েক মাস আগে আন্দোলন জোরালো করেছিল ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ।

শুরুতে তাদের দাবিতে সরকার নত না হওয়ার অবস্থানে থাকলেও এক পর্যায়ে কোটা সংস্কারের বিষয়টি পর্যালোচনা করতে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে দেয়।

ওই কমিটি প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে কোটা সম্পূর্ণ তুলে দেওয়ার সুপারিশ করে, যা বুধবার মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সিদ্ধান্ত জানিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, প্রথম ও দ্বিতীয়তে বাতিল হলেও তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চাকরিতে কোটা পদ্ধতি আগের মতোই রয়েছে।

মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের আগেই গত কয়েকদিন ধরে কোটা বহালের দাবিতে নানা কর্মসূচি পালন করে আসছিল মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কমান্ড।

মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্ত হয়ে যাওয়ার পর রাত সাড়ে ৮টার দিকে সংগঠনটির প্রায় একশ’ সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে বেরিয়ে শাহবাগে অবস্থান নেন।

তারা সড়কে গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে দেখা দিয়েছে যানজট।

মুক্তিযোদ্ধার সন্তান সংসদ কমান্ডের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি শেখ আতিকুর বাবু সেখানে সমাবেশে বলেন, “মন্ত্রিপরিষদের এই সিদ্ধান্ত আমরা মানি না। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য রাখা ৩০ শতাংশ কোটাই বহাল রাখতে হবে।”

মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহালের দাবিতে শনিবার বিকালে সমাবেশ করার ঘোষণাও দেন তিনি।

সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক আল মামুন বলেন, “যতক্ষণ পর্যন্ত মন্ত্রিপরিষদের সিদ্ধান্ত বাতিল না হয়, ততক্ষণ আমাদের কর্মসূচি চলবে।”

তাদের সমাবেশ থেকে ৬টি দাবি উত্থাপন করা হয়েছে, সেগুলো হচ্ছে- কোটা পর্যালোচনা কমিটির প্রতিবেদন বাতিল, বিসিএসসহ সব চাকরির পরীক্ষায় প্রিলিমিনারি থেকে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাস্তবায়ন, মুক্তিযোদ্ধা পরিবার সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, স্বাধীনতাবিরোধীদের বংশধরদেরও সরকারি চাকরি থেকে বহিষ্কার, বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কটূক্তিকারীদের বিচার, ঢাবি উপাচার্যের বাসভবনে হামলাকারীদের শাস্তি।

তাদের দাবির প্রতি সমর্থন জানাতে শাহবাগে উপস্থিত হন ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। তবে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে কোনো কর্মসূচি পালন না করার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, “স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তি ঐক্যবদ্ধ থাকলে দাবি আদায় করা সম্ভব ৷কোটাব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কার দরকার ৷কতটুকু কোটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, এটা বোঝাতে পারলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আপনাদের দাবি মেনে নেবেন ৷ আপনারা আমাদের আদর্শিক সহযোদ্ধা৷আমরা আপনাদের পাশে আছি ৷

“আপনারা আন্দোলন করুন, তবে রাস্তা অবরোধ করে জনগণকে দুর্ভোগে ফেলবেন না। আপনারা যৌক্তিক অনুপাত তুলে ধরুন জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করবেন না।”

কিন্তু তার আহ্বানের পর আতিকুর বাবু বলেন, “যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের দাবি আদায় না হবে, ততক্ষণ আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব।”

শাহবাগে তাদের অবস্থানের মধ্যে কোটা বহাল রাখার দাবিতে জাতীয় জাদুঘরের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন শুরু করে ‘মুক্তিযোদ্ধার পরিবার’ ব্যানারে আরেকটি সংগঠন।

এই সংগঠনের মুখপাত্র মেহেদী হাসান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা চাই বাহাত্তরের সংবিধানের আলোকে কোটা ব্যবস্থা বহাল হোক। আমরা কোনো জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করতে চাই না। তাই মোড় অবরোধ না করে আমরা এখানে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করছি।”

মধ্যরাতে দুটি সংগঠনের নেতা-কর্মীরা একসঙ্গে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ চালিয়ে যেতে থাকে।

কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে ইঙ্গিত দিয়েছেন, কোটার পক্ষে জোরাল আন্দোলন হলে নতুন সিদ্ধান্ত আসতেও পারে।

মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের পাশাপাশি বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীও তাদের কোটা সংরক্ষণের দাবি ইতোমধ্যে তুলেছে।

আদিবাসী সাধারণ ছাত্র কোটা সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক নিপুন ত্রিপুরা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আদিবাসীরা যেহেতু তুলনামূলক পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, সেক্ষেত্রে এটা (কোটা) আমাদের সাংবিধানিক অধিকার।

“সরকার বলেছে, তারা বৈষম্য কমানোর জন্য কোটা তুলে দিয়েছে। কিন্তু আদতে এতে বৈষম্য বেড়েছে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আদিবাসীদের সাংবিধানিক অধিকারকে ক্ষুন্ন করা হয়েছে।”

তিনি বলেন, “কোটার জন্য আমাদের কিন্তু প্রিলিমিনিারি ও লিখিত পরীক্ষা দুটোতেই সবার সাথে উত্তীর্ণ হতে হয়। এছাড়া কোটা থাকার কারণে অনেকেই নন গেজেটেড চাকরিগুলো পেত। এখন তো সেটাও থাকল না।”

মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল বলেছেন, কোটা পর্যালোচনায় গঠিত বর্তমান কমিটিও প্রয়োজনে তাদের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করতে পারবে এবং সরকার সে অনুযায়ী কোটা ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাসও করতে পারবে।

ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ

মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্বহালের দাবিতে বুধবার রাতে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের রাজশাহী প্রতিনিধি জানান, রাত ১১টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সংগঠনটির ২০ জনের মতো সদস্য মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে ছিলেন। এসময় যান চলাচল বন্ধ ছিল।

সংগঠনের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি তারিকুল হাসান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মুক্তিযোদ্ধারা তারা নিজের রক্তের বিনিময়ে এদেশ স্বাধীন করেছেন। আর তারই পুরস্কার হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৩০ শতাংশ কোটা দিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধা কোটা আমাদের অধিকার। এ কোটা বাতিল হলে মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানকে অপমান করা হবে।”

বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধের ঘোষণা দিয়ে রাতে রাজপথ ছাড়েন তারা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক লুৎফর রহমান বলেন, “আমি সেখানে গিয়েছিলাম। আমি তাদেরকে বলেছি, এভাবে রাস্তা অবরোধ করলে মানুষের দুর্ভোগ বাড়ে। পরে তারা চলে গেছে।”

পরিষদের প্রতিক্রিয়া

মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হক নুর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এটাকে আমরা ইতিবাচকভাবে দেখছি। তবে সরকারকে মনে রাখতে হবে আমরা কোটা বাতিলের জন্য আন্দোলন করিনি, আমরা চেয়েছি কোটার যৌক্তিক সংস্কার।”

নিজেদের অন্য দাবিগুলো পূরণ করতেও সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছেন তিনি।

নুর বলেন, “আমরা আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মামলার প্রত্যাহার, ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারাদেশে ছাত্রদের উপর প্রকাশ্যে সন্ত্রাসী হামলার বিচার ও কোটা সংস্কারের প্রজ্ঞাপন’ এই তিন দাবি জানিয়েছি।

“আমরা সংস্কার চেয়েছি, কিন্তু সরকার কোটা বাতিল করেছে। কিন্তু আমাদের বাকি দাবিগুলো নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কথা বলা হয়নি। তাই আমরা চাই, আমাদের তিনটি দাবিই বাস্তবায়ন করা হোক।”

সূত্রঃ বিডিনিউজ