দুঃসহ রোহিঙ্গা–জীবনঃ আট ভাইয়ের ঠাঁই চার দেশে

অনলাইন ডেস্কঃ
২০১২ সালের আগস্ট মাসের পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন। এমন দিন জীবনে আর আসবে কি না জানে না রোহিঙ্গা কিশোর রবি আলম। ওই দিনই শেষবারের মতো সাত ভাইকে একসঙ্গে কাছে পেয়েছিল সে। এরপর এই আট ভাইয়ের আর এক ছাদের নিচে বসা হয়নি। এক পরিবারের সদস্য তারা। কিন্তু তাদের ঠাঁই এখন চার দেশে!

বাংলাদেশের কুতুপালংয়ের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে সেই থেকে বেড়ে ওঠা রবির (১৬)। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পানে চেয়ে অতীতের সুখস্মৃতি আওড়ে কিশোর রবি বলছিল, এক দেশে, এক পরিবারের সদস্য হয়ে, এক ছাদের তলায় ছিল তারা। একদিন মিয়ানমারের রাখাইনে এক বৌদ্ধ নারীকে ধর্ষণ ও হত্যার জন্য কয়েকজন রোহিঙ্গা মুসলিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে শুরু হয় উগ্রপন্থী রাখাইন বৌদ্ধ ও সেনাবাহিনীর অভিযান। জ্বালিয়ে দেওয়া হয় রোহিঙ্গাদের গ্রামের পর গ্রাম। রোহিঙ্গা ও জাতিগত রাখাইন বৌদ্ধদের পুরোনো দ্বন্দ্ব পুঁজি করে সৃষ্ট এ অশান্তিতে পড়ে তাদের পরিবারে শুরু কালো অধ্যায়ের।

রবি জানায়, রাখাইন রাজ্যের মংডু জেলার ইয়ে টুইন কিউন গ্রামে তাদের বাড়ি। গ্রাম থেকে উচ্ছেদ হওয়ার পর প্রায় ছয় বছর পেরিয়ে গেছে। এই কয়েক বছর ধরে তারা আট ভাই বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন করছে বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও মিয়ানমারে।

রবির এক ভাই এখন মিয়ানমারের জেলে। আরেক ভাই মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টাকালে নিখোঁজ হয়। বর্তমানে তার অবস্থান কোথায়, তা জানা নেই। ২০১২ সালে রবির ভাইয়েরা যখন শেষবার একত্রে ঈদ উদ্‌যাপন করেছিল, তখন রাখাইনে রোহিঙ্গা অধিবাসীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১২ লাখ। নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান আর নিপীড়নে সেই সংখ্যা এখন এক-তৃতীয়াংশের নিচে নেমে এসেছে।

বড় চার ভাই থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রবি ও তার অপর তিন ভাই জাবের (১৮), হাশিম (১৭) ও ফয়েজ (১২) এখন কুতুপালংয়ের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে। ২০১৬ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশে ঢোকে তারা। মা ও অন্য ১৫ স্বজনের সঙ্গে এখানকার ছোট ঘরেই মিলেমিশে থাকতে হয় তাদের।

রবি বলে, ‘আমরা এখানে কাজ করতে পারি না। এই জায়গা সম্পর্কে কিছুই জানি না আমরা। কিন্তু কীভাবেই বা আবার মিয়ানমারে ফিরব?’

রবির সবচেয়ে বড় ভাই মোহাম্মদ রশিদ। ২০১৩ সালের শুরুতে নাফ নদী পেরিয়ে বাংলাদেশ হয়ে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে রাখাইন ছাড়েন তিনি। ২৫ বছর বয়সী ভাইটির একটি ছবি মুঠোফোনে দেখিয়ে রবি ছলছল চোখে বলে ওঠে, ‘তখন থেকে তাঁর কথা আর শুনিনি।’

আরেক বড় ভাই আবদুর রশিদ (২৩) ২০১৪ সালের সালের শুরুতে রাখাইন ছাড়েন। বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ড হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে জাতিসংঘের শরণার্থীশিবিরে আশ্রয় নেন। এখন কেক তৈরির কারখানায় কাজ করছেন। মা খাদিজা বেগম বলেন, ‘আমি তাকে (আবদুর রশিদ) বিদেশযাত্রা থামাতে অনেক চেষ্টা করেছি; অনুনয়-বিনয় করেছি। কিন্তু সে দমেনি।’

আরেক ভাই আবুল কাশেম (১৯) রাখাইন ছাড়েন ২০১৩ বা ২০১৪ সালের দিকে। এখন ভারতের হরিয়ানায় রাজমিস্ত্রির কাজ করেন।

আট ভাইয়ের সবার বড় হামিদ হোসেন (২৮)। ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর আরেক দফা জ্বলে ওঠে রাখাইন। তখন কারফিউ জারি করে সরকার। কারফিউ ভঙ্গের অভিযোগে প্রথমে গ্রেপ্তার ও পরে কারাদণ্ড হয় তাঁর। এখন সেখানে কারাগারেই আছেন।

আট ভাইয়ের বিচ্ছিন্নতার কষ্টের এখানেই শেষ নয়। তাঁরা তবু বেঁচে গেছেন। কিন্তু তাঁদের বাবা নাগু মিয়া (৬০) মিয়ানমারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে পারেননি। পরিবারের অভিযোগ, পুলিশ তাঁকে পিটিয়ে মেরেছে।

সূত্রঃ প্রথম আলো অনলাইন